মায়ের তৃতীয় নয়ন

কনকচাঁপা

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কেবল কিশোরী হয়ে উঠছি তখনকার গল্প।ঈদ এলে শৈশব এ জামার আনন্দ ই মুখ্য ছিল।কিন্তু সেই বয়সে জামার সঙ্গে বন্ধু,কার্ড,বেড়ানো এগুলোও অপরিহার্য হয়ে উঠলো। বাবার সেলাই করা জামা, তিনিই ডিজাইন করতেন।এবার আমিও ডিজাইন বলে দেয়া শুরু করলাম।কাপড় নির্বাচন, ডিজাইন এঁকে দেয়া এগুলোই আমার মুখ্য কাজ হয়ে উঠলো। আব্বাও সেইমত বানিয়ে দিতেন জামা।মার রান্নার কাজেও অংশগ্রহণ শুরু করলাম।নতুন এক অধ্যায় শুরু হল জীবনের।এক ঈদে কোন এক বান্ধবী বলল চল, আমরা ঈদের দিন বেড়াতে যাবো দূরে! আত্মিয়স্বজন না অন্য কোথাও! কোথায়? ভালই তো! অভিনব ভাবনা।খুব পছন্দ হল।কিন্তু মাকে বলি কি করে,আমি জানি তিনি একদমই রাজী হবেন না।খুব চিন্তায় পড়লাম।কি করে যেনো বের হওয়ার উপায় বের হল।জমানো কিছু টাকাও নিলাম সঙ্গে।তিনজন মিলে ঈদের দুপুরে বের হলাম।

ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে

ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে

মাদারটেক থেকে আসলাম বাসাবো। সেখান থেকে রমনাপার্ক! হাহাহা।ঈদের দিন রমনাপার্ক বেড়ানোর কোন অর্থই হয়না, কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা সিংগাপুর বেড়াচ্ছি।ঈদের দিনের ভরাপেট তবুও বাদাম মুড়িমাখা খেলাম।কড়া হিসেব রাখতে হচ্ছে কারন বাড়ি ফিরতে হবে তো!বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছে।আনন্দের বদলে আতংক কাজ করছে।রমনাপার্ক থেকে বেইলী রোডে আসলাম। পয়সা হবে কিনা তিন জনই ভাবছি আর হাঁটছি।হঠাৎ একটা ড্রেনে পা পড়লো। পাতা মচকে গেলো। কি যে ভয় পেলাম।একটা দোকানে ঢুকে পা ধুলাম।রিক্সাওয়ালাকে অর্থের স্বল্পতার কথা বলে কয়ে ভাড়া কমিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেলো। গিয়েই বুঝলাম অনেক অন্যায় করে ফেলেছি।আব্বা মুখ নীচু করে বসে আছে।আম্মা রক্তচক্ষু। কোথায় গিয়েছিলাম জিজ্ঞেস করলেন বটে কিন্তু উত্তর টা গ্রহণযোগ্য হল না।কিন্তু মারধোর ও করলেন না।সেটাই বরং বিশাল শাস্তি এবং অনাগত ভয়ংকর কিছু হয়ে দাঁড়াল আমার জন্য। রাতে পায়ের ব্যথায় পায়ের পাতা ফুলে জ্বর এলো। আম্মাই জলপট্টি দিচ্ছেন।মুখ থমথমে। মনে হচ্ছিল রাগ করে জলপট্টি না দিয়ে পায়ের পাতা মচকে দিলেও ভালো ছিল।আম্মা কে আমি বাঘের চেয়েও ভয় পাই।আল্লাহ গো! পরদিন ডঃ এর কাছে গেলাম।পাতাটা ব্যান্ডেজ করে ওষুধ দিয়ে দিলেন।বাসায় এলাম।আবার আম্মা আমার জুতা উলটে পালটে বললেন,কতদুর গিয়েছিলাম! এ কথা ও কথার পর দিলেন রাম ধমক।গড়গড় করে মার্বেল গড়ানোর মত করে সব গল্প বের হয়ে গেলো। আম্মা বিস্মিত। ঈদের দিন রমনাপার্ক! আব্বা বললেন কি করে টের পেলে ও এতো দূর গিয়েছিল! আম্মা এবার তিরস্কার করে বললেন তোমাদের বাপ বেটির গানের বুদ্ধি দিয়ে জগৎসংসার চলে? তোমার মেয়ে অন্য এলাকার কাদা জুতায় বয়ে নিয়ে এসেছে।এটা আবিষ্কার করতে বৈজ্ঞানিক হওয়া লাগে! হাহাহাহাহাহাহা। জেনে রাখা ভালো এখন আমি একজন মা,এবং আমার মায়ের মত সেই তৃতীয় নয়ন আমার কপালের ওপরে সাঁটা। বেঁচে থাকো মায়েরা তোমাদের তৃতীয় চক্ষু নিয়ে