বিজ্ঞান দিচ্ছে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের নতুন ব্যাখ্যা

প্রায় দেড়শ বছর আগে লুইস ক্যারল লিখেছিলেন ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’। অ্যালিস নামে সেই ছোট্ট মেয়েটির জীবনে আচমকা ঘটে যাওয়া অদ্ভূত সব ঘটনার গল্প। ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে’ একটি ছোট্ট মেয়ের আশ্চর্য ভ্রমণের গল্পের পাশাপাশি আড়াল থেকে লুইস ক্যারল তীব্র ব্যাঙ্গের ছুরিতে কাটাছেঁড়া করেছেন সমাজকেও। এই উল্টো রাজার দেশের গল্প আজও পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এতো বছর পরে এসে এবার বিজ্ঞানীদের মাইক্রোস্কোপের তলায় ধরা পড়েছে অ্যালিসের গল্প। আর তাতে জানা যাচ্ছে অ্যালিসের নানা কাজকারবারের সঙ্গে বিজ্ঞানের নানা তত্ত্বের রয়েছে ভীষণ মিল। Alice in Wonderland
গল্পের প্রথম ভাগে অ্যালিস এক ধরণের জাদুই তরল ভর্তি একটি বোতল খুঁজে পেয়েছিল তার সেই আশ্চর্য ভ্রমনের সময়ে। সেই বোতলের তরল পান করে অ্যালিস দশ ইঞ্চি লম্বা হয়ে গিয়েছিল। তার মাথা ছাদে লেগে যাচ্ছিল। ১৯৫৫ সালে এসে জন টড নামে এক মনোবিজ্ঞানী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অ্যালিসের মতো বাস্তব জীবনে তার অনেক রুগী এ ধরণের অভিযোগ নিয়ে চিকিৎসা করাতে আসছে। তাদের কাছে মনে হচ্ছে ভাঁজ করা কোন বস্তুর মতো কখনো তারা বড় হয়ে যাচ্ছে আবার কখনো্ ছোট। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাটা বেশী। তখন তিনি এই রোগের নাম দিলেন অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম, যা এখনো এই নামেই পরিচিত।
বিষয়টি নিয়ে এই সময়ে এসে গবেষণা করতে বসেন পেন্সিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজিস্ট গ্রান্ট লিউ। তিনি ক্যারলের ডায়েরি ঘাটতে গিয়ে বিজ্ঞানের সঙ্গে সমিলের জায়গাটা ধরে ফেলেন।আসলে লুইস ক্যারলের ছিল মাইগ্রেন। ডাক্তারদের মতে, মাইগ্রেনের ব্যথার আক্রমনের সময় যে কোন মানুষ নানা ধরণের কাল্পনিক দৃশ্যাবলী দেখতে পায়। লিউ‘র মতে ক্যারল সম্ভবত এই ধরণের কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে পেতেন অসুখের আক্রমণের সময়। আর সেই অভিজ্ঞতাই তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন লেখায়।
লিউ তার গবেষণায় আরও জানান, মানুষের মগজের পেরিটাল লোবে অস্বাভাবিক কর্মকান্ড ঘটার ফলেই মানুষের মধ্যে ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ লক্ষণটি দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণকেও এক ধরণের পাগলামি বলেই আখ্যা দিয়েছেন তিনি। তবে সিঙ্গে এও জানিয়েছেন, এই পাগলামি সাময়িক। এই রোগের আক্রমণে মানুষের মনে উচ্চতা আর দূরত্বের ধারণার গোলমাল দেখা দেয়। একে কখনোই পাগলামি বলা যাবে না।

Alice with the bottle labelled Drink Me, from the Lewis Carroll Story Alice in Wonderland, Illustration by Sir John Tenniel 1871

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে স্বপ্ন আর বাস্তবতার অদ্ভূত এক কাটাকুটি খেলার উল্লেখ আছে নানা জায়গায়। গল্পে রানী চরিত্রটি কোলে একটি ক্রন্দনরত শিশু থাকে। এলিস শিশুটিকে কোলে নিতেই সেই শিশুটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি শুকর ছানায়। আবার হঠাৎ করেই একটি বিড়াল তার খাবারের থালার সামনে থেকে বাতাসে মিলিয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছে, স্বপ্নে মানুষ বেশীরভাগ সময় বাস্তব সময়ের জমিয়ে রাখা ছবিগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখে। তখনই সেই স্বপ্নে দেখা দৃশ্যগুলো বাস্তবের সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরী করে ভিন্ন চরিত্র, ভিন্ন দৃশ্যপট। লুইস ক্যারল মনের এই বিশেষ অবস্থা এবং স্বপ্নকে মিলিয়ে মিশিয়ে অ্যালিসের চারপাশে তৈরী করেছিলেন এক অদ্ভূত কল্পনার জগত।
অ্যালিসের গল্পে স্মৃতি বিষয়টিরও বড় ভূমিকা আছে। অ্যালিস গল্পের চরিত্র শ্বেত রাণী অ্যালিসকে বলেছিল, সে স্মৃতি শুধু পেছনের গল্পটাই বলে সে স্মৃতি আমার কাছে বড্ড দূর্বল আর অকেজো। অ্যালিস তখন জানতে চেয়েছিল রাণী কী ধরণের বিষয় মনে রাখে বা মনে করতে পারে। রাণীর উত্তর অবাক করেছিল অ্যালিসকে। রাণী বলেছিল তিনি এক সপ্তাহ আগের কথা মনে করে বলতে পারেন। সেটাই তার কাছে স্মৃতি।
মজার ব্যাপার হচ্ছে দুই হাজার সাল থেকে মনোবিজ্ঞানীরা ভাবছেন, মানুষের স্মৃতি আসলে শুধু তার অতীতের অংশ নয়। স্মৃতি একজন মানুষকে ভবিষ্যতের পথ চলাতেও সাহায্য করে পেছনের ইতিহাস থেকে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালিনর ম্যাগুইরি মনে করেন মানুষ স্মৃতিকে ব্যবহার করেই সামনে এগুতে পারে। স্মৃতির এই নতুন বিশ্লেষণ ছাত্রদের বোঝাতে তিনি বারবার ব্যবহার করেন অ্যালিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ডের গল্পের উদাহরণ।
বিজ্ঞান আর মনের অচিন অলিগলির সঙ্গে রূপকথার গল্পের এই মিল দেখে গবেষকরা চমকে উঠেছেন। তারা এখন ক্যারলের কাহিনির ওপর আরও আলো ফেলে আবিষ্কার করতে চাইছেন গভীর মনস্তত্ত্ব।

ফাজলে খোদা
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট