১৯৭১

ওমি

ওমি রহমান পিয়াল

ওমি রহমান পিয়াল সাংবাদিক ও ব্লগার। যুদ্ধোপরাধীদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম নেতাদের একজন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জন্মযুদ্ধ-৭১ নামে একটি ওয়েব পেজ পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাবলী, অজানা ইতিহাস ও তথ্য সেখানে প্রকাশিত হয়।  ওমি রহমান পিয়ালের এই লেখাটিও মুক্তিযুদ্ধের তেমনি এক অজানা অধ্যায় নিয়ে রচিত।
অবরুদ্ধ তৎকালীন ঢাকা শহর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন জেনারেল, তাদের পরিবার এবং বিদেশী নাগরিকদের পালিয়ে যাওয়ার নাটকীয় উদ্যোগ এবং আমাদের পাশের দেশ বার্মায় তাদের আশ্রয় নেয়ার কাহিনি পিয়াল লিখেছেন তার লেখায়। লেখাটি প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হবে। পা.বা.স

ভূমিকা :
অনেক আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওপর একটা তথ্যচিত্র দেখেছিলাম- দ্য লাস্ট ফ্লাইট ফ্রম সায়গন। আমেরিকানরা পালাচ্ছে। সঙ্গী হওয়ার জন্য ব্যাকুল তাদের সহযোগীরা, দুতাবাসের প্রাঙ্গনে ঢুকতে রীতিমতো সংঘাত। প্রাঙ্গন জুড়ে পোড়ানো হচ্ছে আমেরিকান ডলার-কোটি কোটি! শেষ একটি হেলিকপ্টার। সেটায় ওঠার জন্য তুমুল ধাক্কাধাক্কি। ঘটনার চার বছর আগে ঢাকায় ব্যাপারটা ঠিক তেমন ছিলো না। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা রেসকোর্সে আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের, জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। তার আগের সময়টা কেমন ছিলো পাকিস্তানীদের? পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর তারা এই দেশের সেরা সম্পদগুলো ধ্বংস করতে মেতেছে। নেমেছে বুদ্ধিজীবি হত্যায়। পুড়িয়ে ছাই করেছে ব্যাঙ্ক নোট। সোনাদানা জড়ো করে পাচার করার চেষ্টা করেছে জাহাজ দিয়ে। পাশাপাশি চেষ্টা করেছে নিজেরা পালানোর। তাতে সফল হয়নি যদিও। তবে সেই উত্তেজনাময় সময়েও পাকিস্তানী ফোর এভিয়েশন স্কোয়াড্রনের পাইলটরা জীবন বাজি রেখে পালিয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর রাতে (ক্যালেন্ডারে ১৬) বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তার পরিবার নিয়ে কিছু হেলিকপ্টার নিরাপদে বার্মা পৌঁছায়। এদের মধ্যে ছিলেন কুখ্যাত খুনী মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রহিম খানও। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের ঘন্টা খানেক আগে ভারতীয় বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে ঢাকা ছাড়ে আরো দুটো হেলিকপ্টার। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফোরামে এই পলায়নকে বেশ বীরত্বের বলে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আর তা জাহির করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। এনিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতীয় দলিলপত্রে তেমন কোন উল্লেখ নেই। পাকিস্তানী উপাত্তগুলোই বিশ্লেষণ করে একটা আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করেছি ঘটনার। আল্লাহু আকবর বলে জেহাদী জোশে তারা কিভাবে এই অসম্ভব সম্ভব করেছিল-পাকি ফোরামের সেই বীরগাঁথা প্রচারের কোনো আগ্রহ আমার নেই। আমি চেষ্টা করেছি ঘটনার আড়ালে ঘটনা জানতে।12

প্রেক্ষাপট :
৩ ডিসেম্বর ভারত আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই পূবের রণাঙ্গনে ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় পাকিস্তানের। আকাশ ও জলসীমার দখল নেয় মিত্রবাহিনী। উপর্যুপরি আক্রমণে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়ে যায়। আর বোমার আঘাতে রানওয়ে হয়ে পড়ে উড্ডয়নের অনুপযোগী। এরই মধ্যে জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারবর্গকে ঢাকা থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে দিতে মহাসচিব উ থান্ট যুযুধান দুপক্ষকে আহবান জানান। এ উদ্দেশ্যে আসা ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের একটি সি-ওয়ানথার্টি বিমান ৭ ডিসেম্বর তেজগাঁ বিমানবন্দরের ওপর চক্কর দিলেও নামতে পারেনি। ভারত সায় দিয়ে আক্রমণ স্থগিত রাখলেও পাকিস্তান অস্বীকৃতি জানায় বিমানটির অবতরনে, ফলে ব্যাংককে ফিরে যায় সেটি।

১১ তারিখ এক ইনটেলিজেন্স রিপোর্টে মিত্রবাহিনী জানতে পারে সেদিন রাতে রাও ফরমান আলীসহ শীর্ষ বেশ কজন সেনা অফিসারকে তুলে নিতে ৬টি এয়ারক্রাফট ঢাকায় ল্যান্ড করবে। পরিকল্পনাটা বানচাল করে দিতে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বোমাবর্ষন তীব্রতর করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিট্র্যাক অকেজো হয়ে যায় তুমুল আক্রমনে। কুর্মিটোলা ও তেজগাঁয় রাত আড়াইটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত ৮টি ক্যানবেরা বোমারু ৪ হাজার পাউন্ড ওজনের উচ্চতর বিধ্বংসী বোমা (এসব বোমার নাম ছিলো: রোড টু ঢাকা) ফেলে। চারটা মিগ ও দুটো ক্যারিবাস পর্যায়ক্রমে চক্কর দিতে থাকে এ এলাকায়। পরদিন ১২ ডিসেম্বর একটি হারকিউলিস বিমানে সাড়ে চারশোজন বিদেশী নাগরিক ঢাকা ত্যাগ করে। (চলবে)