আমি, শংকর এবং একটি সাইকেল..

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

জসিম মল্লিক

জসিম মল্লিক

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন একদিন মাকে বললাম, মা আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেন। আমাদের যে পরিস্থিতি তাতে সেই সময়ে সাইকেল কিনতে চাওয়াটা দুঃসাহসের পর্যায়ে পড়ে। এমনিতে কারো কাছে কিছু চাওয়া কঠিন একটা কাজ আমার জন্য। আমি যদি কখনও কারো কাছে কিছু চেয়েও থাকি সেটা শুধুমাত্র ভালবাসার দাবী থেকে। প্রথমতঃ আমি কিছু চাইতে পারিনা, দ্বিতীয়তঃ চেয়ে যদি না পাই সেটা হবে খুবই কষ্টের, অপমানের। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার অর্ধেক জীবন গ্রন্থে লিখেছেন, ’প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন কারো কাছে কখনও চুম্বন প্রার্থনাও করিনি। তারপরও কি জীবনে প্রত্যাখ্যাত হইনি! অনেকই হয়েছি।’ আমার অবস্থাও তাই। চেয়ে না পাওয়ার ঘটনা আমার জীবনে অনেকই আছে। এমনকি আমার যা প্রাপ্য তাও আমি চেয়ে নিতে পরিনি। নিজের পাওনা জিনিস চাইতেও আমার অনেক দ্বিধা। অথচ না চাইলে সহজে কেউ কিছু দেয় না।
আমি তখন খুব ছোট একদিন মা বলল, তুমিতো কখনও কিছু চাওনা! না চাইলে কিভাবে বুঝব তোমার কি দরকার। আমি কিছু বলিনা, চুপ করে থাকি। মা তখন বলল, শোনো, না চাইলে মায়ও দুধ দেয় না বুঝলা। চাওয়ার ব্যাপারে আমি খুবই দ্বিধাগ্রস্থ। তা সত্ত্বেও আমার দাবী দাওয়ার জায়গা শুধু মাই ছিল। মা যদি না বলে আমার এতো খারাপ লাগবে না। মা বাবারা সহজে না বলতে পারে না। আমি যেমন কোনোদিন আমার ছেলে মেয়ে কিছু চাইলে না বলিনি। আমি যে ’না’ বলব না এটা ওরা জানে বলেই আমার কাছে সহজে কিছু চায় না। আমি অপেক্ষায় থাকি কখন বলবে বাবা আমাকে এটা দাও, আমি আনন্দের সাথে দিব। অন্য কেউও যদি আমার কাছে কিছু চায় আমি চেষ্টাকরি সেটা দিতে। কারো উপকার হবে এমন কিছুর জন্য আমি অন্যের পা ধরতেও দ্বিধা করি না। মানুষের উপকার করে আমি অনেক বন্ধু হারিয়েছি।old-bicycle12
ও রকম বয়সে খুব বেশী বালকের সাইকেল থাকে না। তাছাড়া মায়ের পক্ষে আমাকে একটা সাইকলে কিনে দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার ছিল। কিন্তু তারপরও মায়ের কাছে সাইকেল কেনো চাইলাম সেটা এখন বলি। শংকর নামে একটা ছেলে পড়ত আমার সাথে। ওরকম বয়সেই শংকর বেশ দাপুটে। ওর বাবা ছিল ব্যবসায়ী। চক বাজারে চালের আড়ত ছিল ওদের। পড়াশুনায়ও শংকর ভাল। সুন্দর সুন্দর জামা পরে স্কুলে আসে। প্রতিদিন মালেক ভাইর দোকানে মালাই আইসক্রীম খায়। আমাকেও মাঝে মাঝে দেয়। কিন্তু সবসময় শংকর আমাকে কেনো আইসক্রীম খাওয়াবে! আমিও শংকরকে আইসক্রীম খাওয়াতে চাই কিন্তু আমার কাছে যে পয়সা থাকে না! আমি দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে বন্ধুদের আইসক্রীম খাওয়া দেখতাম। শংকরকে এভোয়েড করার জন্য বলতাম, শংকর আমার টনসিলের সমস্যা আছে, আইসক্রীম খাওয়া মানা।
শংকর একদিন একটা নতুন সাইকেল নিয়ে আসল। ওদের বাড়ি ছিল সাগরদী বাজারের কাছে। আমাদের বাড়ি থেকে কাছেই। বিকেলে আমরা একসাথে ঘুরতাম। খেলতাম। শংকর আর আমি খুব বন্ধু। শংকর একদিন নিজে থেকেই আমাকে ওর সাইকেলটা চালাতে দিল। আমি প্রায় ওরসাথে সামনের রডে বসে ঘুরে বেড়াতাম। ও চালাত আমি বসে থাকতাম। আমারও ইচ্ছে করত ওর সাইকেলটা চালাই। কিন্তু লজ্জায় বলতাম না। যদি না বলে! একদিন শংকরের সাইকেল চালাতে গিয়ে আমাদের বাড়ির পাশে যে খাল আছে সেখানে ঝুপুস করে পরে গেলাম। আমার হাত পা ছিঁড়ে গেলো। সাইকেলটার যথেষ্ট ক্ষতি হলো। সেদিন শংকর খুব ভয় পেয়েছিল। ওর বাবা যদি কিছু বলে! আমারও এমন খারাপ লাগল। সেই থেকে শংকর আর কখনও সাইকেল নিয়ে আসেনি।
তখনই মাকে বললাম, মা আমাকে সাইকেল কিনে দেন। সেটা ছিল একজন অবোধ কিশোরের মনের জেদ। শংকরকে দেখাতে চাই যে আমারও সাইকেল আছে। আমিও একটা ঝা চক চকে নতুন সাইকেল নিয়ে শহর দাবড়ে বেড়াতে পারি। শংকর আমার সাইকেল চালানোর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবে। শংকরকে রডে বসিয়ে আমিও ঘোরার অফার দেবো। আমার সব দাবী দাওয়া ছিল আমার মায়ের কাছে। সেবার সাইকেল কেনা আর হলো না। মা বললেন এখনই সাইকেল কিনে দেওয়া সম্ভব না! আমি একটু ব্যথিত হলাম। অনেক পরে যখন কলেজে ভর্তি হয়েছি তখন মা একটা ফ্লাইংপিজিয়ন চাইনীজ সাইকেল কিনে দিয়েছিল। সেটা নিয়ে আমি শহর দাবড়ে বেড়াতাম কিন্তু তখন শংকর ছিল না…। (পুনঃমুদ্রণ)

ছবিঃ মুন ও সংগ্রহ