মনে পড়ে…

শামীম আজাদ

শামীম আজাদ

যুদ্ধজয়ের পর তাকে আমি হারিয়ে ফেলি। তখন লাখ লাখ মানুষ হারিয়েছেন আপন জন সহ আপন গৃহ, সম্মান, সুখ, সঞ্চয়, সম্বল। এতবড় যুদ্ধের জন্য এটা অত্যন্ত ছোট একটা সংবাদ। আমার মত অনেকের কাছেই। এমন কি হয়তো তার কাছেও তাই ই ছিল।
কিন্তু কথাটা অনেক বড় হয়ে গেছে ৪১বছর পর। এমন বড় হয়ে গেছে যে এখন এটাই আমার মুক্তিযুদ্ধের পর ব্যাক্তিগত প্রাপ্তির সব চাইতে বড় ঘটনা। ততদিনে সেই চৌদ্দ বছরের গালে টোল পড়া কোমল চোখের ‘যুদ্ধেরভাই’ এর বয়স হয়ে গেছে পঞ্চান্ন। সে তখন আটলান্টিকের ওপাড়ে আর আমি এপাড়ে। আমাদেরকে এক করে দিয়েছিলেন তার যারা তারা সেদিন তার সামনে ছিলেন কি না জানিনা। এদিকে আমার তখন ছিলো ২০১২ সালের গভীর রাত। অসুস্থ্য আজাদ পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে। আমার পরিণত বয়সের ছেলে মেয়ে ঈশিতা সজীব কেউ আর তখন সাথে থাকেনা।
বাগানের মৃদু আলোয় দেখা যাচ্ছে বাইরের বাতাসে উথাল পাথাল নড়ছে নাশপাতি বৃক্ষ শাখা। ওকের পাতারা পাগল হয়ে দুলছে। আর আমি বুঁজে আসা কন্ঠে ডাকছি বুলবুল বুলবুল। সে কথা বলছে না কাঁদছে। আমি কিছু বলছি না আবার বুলবুল নামটি উচ্চারণ করে হাঁপুস নয়নে কাঁদছি।
সেও টেলিফোন ধরে আছে। অনেক ক্ষন পর আবছা আপা ডাক শুনলাম। এসময় তার হাত থেকে এক যুবক ফোনের রিসিভার নিয়ে সুন্দর ও স্থির বাংলা উচ্চারণে বল্ল, ফুপি আমি আব্বার কাছ থেকে ফোন নিয়ে নিয়েছি। আপনারা এভাবে কাঁদবেন না দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমি আর আম্মা পাশেই দাঁড়ানো।

আমি শান্ত হলাম। বুঝলাম এ তারই সন্তান। কি করে সে আমেরিকা গেল। বা যুদ্ধের পর তার নিজ এলাকায় ফিরে গেলে কি হয়েছিলো জানিনা। আমাকে কি সে খূঁজেছিলো। আমিওতো তখন আজাদকে বিয়ে করে সোবান বাগের বাড়িতে আর নেই। আব্বা মারা গেছেন। আম্মাও সেখানে থাকেননি। বিচিত্রায় কাজ করার সময় শাহাদত ভাইর ঘরে কত মুক্তি যোদ্ধা বন্ধুরা এসে অস্থির গল্প করতো। পাশের একটি নির্মিয়মান দালানের ফকফকা রোদে একটি shadhinota19171মেয়ে তাদের লাল লেপ শুকাতে দিতো। আমি তাই দেখে দেখে ভাবতাম, কোথায় গেলিরে আমার যুদ্ধেরভাই!
ঐ সোনা রোদের মত ছিলো তোর রঙ। তোর কপালের গুচ্ছ চুলে ছিল তোর মা কিংবা আমার মায়ের দুধের দাগ। আর বুলবুল তোর জগত ভোলানো হাসিতে ছিলো কচি কিশলয়ের সরলতা।

তখন আমি থাকতাম ধান্মন্ডির ২২টি নারকেল গাছ হু হু করা আব্দুল হাই স্যারের ভাড়া বাড়িতে। রাতে স্যারের হাতে লাগানো বিলেতি সাদা গোলাপ হাজার হয়ে হাসতো। লনে ফেলে রাখা দূরন্ত সজীবের সাইকেলের দিকে তাকিয়ে, নবছরের কন্যা ঈশিতার সুকুমার মুখের দিকে নিশ্বাস ফেলে, মৃদু নাক ডাকা সুখি স্বামীর দিকে তাকিয়ে আমার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে যেতো। ভাবতাম আমার ভাইটি বেঁচে আছে কি? সে কি ফিরে গিয়ে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে। কলেজ পাশ দিয়েছে? সে কি ব্যবসা করে না চাকুরী? তার নিজের বোন ভাইরা তাকে কি আদৌ তাকে ফেরত পেয়েছে। তার মা কি বুলবুলের টোল খাওয়া গালটায় আদর করেছে?

একদিন আমিও চলে আসি পূর্বাচল ছাড়িয়ে। শিশু সন্তান দুটো বড় হয়। ঊনিশ বছরের বছরের ঢাকাই শাড়ি পরা পিঠ ছাপানো চুলের গোছা সরু হতে থাকে। গায়ে গায়ে ওজন বসে। ছেলেমেয়েরা যে যার মত ভাল থাকে আর আমি থাকি আজাদকে নিয়ে কি এক মহা পূর্ণতা নিয়ে সময় পাড় করতে থাকি। এখানে কত ক্রিস্মাস ঝলঝল করে, কত তুষার পড়ে। কত ডিসেম্বর আসে আবার যায় কেউ আমার অনুজপ্রতিম বুলবুলের কথা জানে না। কে জানবে তাও জানিনা।
যখন যোগাযোগ হবার সম্ভাবনা হল তখন আমাকে চেনার জন্য একাত্তরের বিজয়ের পর পর তোলা ছবিটা তার শালিকা যার স্বামী আমাকে ইন্টারনেট ছেনে খুঁজে বের করেছে তাকে একটা ছবি পাঠাই ।(চলবে)

ছবিঃ সংগ্রহ