আমাকে চিনেছো প্রিয় বাংলাদেশ…

এস এম আমিনুল রুবেল

এস এম আমিনুল রুবেল

প্রিয় বাংলাদেশ,
আমায় চিনেছ ?dec2-1
সেই ছোট্ট বেলায় মায়ের হাত ধরে স্মৃতি সৌধে যেতাম লুকোচুরি খেলতে;
বগুড়ায় সেই শৈশবে স্কুল বাসে করে স্কুলে যেতাম, ছুটাছুটির দিনগুলি।।;
কুমিল্লার ছোট্ট পাহাড়ি টিলায় স্কুল পালিয়ে খরগোশ ধরতে যেতাম;
রাঙ্গামাটির পাহাড়-লেকে ঝাঁপিয়ে বেড়ানো অপার্থিব সেই ছেলেবেলা।
চিটাগাঙের সেই ক্রিকেটময় কৈশোর, ১৬ পা দৌড়ে এসে ফাস্ট বোলিং;
ঢাকার মাটিতে মিশে থাকা আমার সোনালী দিনগুলি।।
১৬ বছর বয়সে বন্ধুদের নিয়ে বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা।।
প্রমত্ত পদ্মার বুকে জ্যোৎস্না রাতের লঞ্চ ভ্রমণ,
ঢাকা-কক্সবাজারের সেই দীর্ঘ রাতের বাস জার্নি।।
বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল রেস।
সেন্ট মারটিনের সৈকতে দাঁড়িয়ে যৌবনের প্রথম একাকীত্ব, কিংবা খাগড়াছড়ির পাহাড়ের চুড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘমালায় হারিয়ে যাওয়া, অথবা সুন্দরবনের গহীনে দাঁড়িয়ে একটি বাঘ দেখতে পাওয়ার আকুতি…
ঢাকার ব্যাস্ত জীবনে হারিয়ে যাওয়া, ক্যান্টনমেন্ট এর প্রশান্তি, ধানমণ্ডি লেকের অসময়ের চা- গিটারের আড্ডা, টি এস সির মোড়ের আদা চা,একুশের বই মেলা, বাণিজ্য মেলা, আর্মি স্টেডিয়ামের উত্তাল কনসার্টগুলি, স্টেডিয়ামে বসে ক্রিকেটে হাবিবুল বাশারদের হার দেখে কেঁদে ঘরে ফেরা, গভীর রাতে বাবাকে ফাঁকি দিয়ে জ্যোৎস্না দেখতে সংসদ ভবনে কাটানো রাত, অকারণে লাজুক মেয়েটির হাত ধরে মিরপুর রোডে বিকেলের শেষ আলোয় ভাড়ায় রিক্সায় ঘোরাঘুরি, টাকা বাঁচানোর জন্য হাফ ভাড়া দিয়ে ৪১ নম্বর বাসের দরজায় ঝুলে থাকা।
ধানমণ্ডি হকারস, বঙ্গবাজার তন্নতন্ন করে খুঁজে আনা আনকমন টি শার্ট, জুম্মার নামাজের শেসে বন্ধুদের সাথে কোকের পার্টি, ছোট্ট মাঠে কড়া রোদে সারাদিন বাজিতে ক্রিকেট খেলা, কিংবা বর্ষার কাঁদা মাটিতে পায়ে পায়ে লাথির সেই ফুটবল খেলা। টিফিনের টাকায় ” মোস্তফা” খেলে হাতে ফোস্কা করে ফেলা। বর্ষায় ড্রেনের পোনা মাছ ধরা, গুলতি দিয়ে পাখি মারার চেষ্টা, ছোট্ট যারে গোল্ড ফিস, প্রিয় ” টাইগার ” নামের সাহসী কুকুরটি, খাঁচায় আটকে রাখা টিয়া পাখি। শেষ পর্বে টিপু সুলতান মরে যাওয়ায় তিন দিন কেঁদে ঘুমানো। শুক্রবার রাতের আলিফ লায়লার সেই সুমধুর সূর; । দা গার্ল ফর্ম টুমরোর এলানার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া। সালমান শাহ, নোবেল কে জেলাস করা, মৌ কে ভালবেসে ফেলে নিজেই লজ্জা পাওয়া। জাহিদ হাসানের পাগলামি, আকরাম খানের ফিফটি, জাভেদ ওমর বেলিমের ক্রিজে পরে থাকা, পাইলটের ফাইটিং, আশরাফুলের পাগলা ব্যাটিং। লুকোচুরি, কানামাছি, গোল্লা ছুট, ছোঁয়াছুঁয়ি, মারবেল, লাটিম, ইয়ইয় খেলার দিনগুলি। শেষ বলে হাসিবুল হোসেন শান্তর এক রান করে ফেলার পর সারা বাংলাদেশের সাথে রং ছিটিয়ে গলা ভেঙ্গে ফেলা মিছিল। আবাহনি-মোহামেডান, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সেই চির দ্বৈরথ। বিশকাপ জ্বরে ভেসে যাওয়া, রাত জেগে অলিম্পিকের পয়েন্ট লিখা, পাটা পুতা দিয়ে ছাদে উঠে বন্ধুদের সেই জিম,বইয়ের ফাকে লুকিয়ে পড়া হুমায়ুন আর তিন গোয়েন্দা, ক্লাসের দুষ্টামি ভরা দিনগুলি, বন্ধুর পাশে সিট রাখা, কলম খেলা, ক্লাস বোর্ডে ছেলে+মেয়ের নাম লিখে রাখা, প্যান্টে লাগিয়ে দেয়া চুইংগাম, মেয়েটির বাড়ির কাজের খাতা লুকিয়ে রাখা, বন্ধুর দুষ্টামিকে নিজের বলে স্যারের হাতে মার খাওয়া, টিফিনের সেই ব্রেড নিয়ে মারামারি, বোমবাশটিং, ক্লাসের একমাত্র লজ্জা পাওয়া মেয়েটির ব্যাগে লুকিয়ে রাখা চিরকুট, পরীক্ষার হলে বন্ধুকে দেখানোর জন্য শেষ পর্যন্ত খাতা হাতে বসে থাকা, পরীক্ষার খাতায় বাবার বদলে বন্ধুর হাতের সাইন। নিচে গেঞ্জি পরে বোতাম খোলা শার্ট পরে কোচিং এ সুন্দরীর পাশে বসার প্রাণপণ চেষ্টা।
টিফিনের টাকা জমিয়ে ফটোগ্রাফির জন্য কেনা ৩৬ ছবির রিল, বন্ধুর জন্য মারামারি করে বাসায় ফিরে মাকে খেলে ব্যাথা পাওয়ার মিথ্যে অজুহাত, এক খালার বাসায় গিয়ে সব খালাত ভাই-বোনের ভর পর্যন্ত আড্ডা, শবে-বারাতের রাতের ১৫-২০ জনের দল বেঁধে হেঁটে বেড়ানো শুনশান এলাকা, ১২ কিলোমিটার হেঁটে বিশ্ব ইজতেমায় গিয়ে একটু চোখের জল ফেলার ব্যার্থ চেষ্টা, কোরবানির গরুর হাটে গিয়ে কৃষকের প্রিয় গরুকে একটু আদর করে ফেরা, ৩০ টি তারাবীর রাতের বন্ধুদের সঙ্গে সেই ২ ঘণ্টার চায়ের আড্ডা, ৫ টাকার চা তিন কাপে। চাঁদ রাতের শেষ শপিং, ঈদ কার্ডে লুকিয়ে প্রেয়শীর নাম লিখা; বাবার পাশে বসে সেহেরী আর মায়ের পাশে বসে তৃষ্ণার্ত ইফতার। সবচেয়ে আনকমন পাঞ্জাবী খুঁজে ফেরা রোজার ঈদ গুলি, বাবার পকেটের ভাংতি টাকা লুকিয়ে ফেলা, বৃত্তি পেয়ে ছেলের হয়ে বাবাকে স্টেdec2221জে উঠে প্রথম পুরষ্কার নিয়ে চোখ মুছে নামতে দেখা। বই কিনবো বলে টাকা নিয়ে বন্ধুকে ধার দেয়া, প্রথম মোবাইল সেট হাতে পাওয়ার শিহরন, সারা রাত জেগে অপরিচিতার সঙ্গে ২ টাকার ডিজুস প্রেম। একটি মেয়ের নাম্বারের জন্য বন্ধুদের মধ্যে কাড়াকাড়ি, গিফট ছাড়াই বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি, রাত জেগে কবিতা লিখে ম্যাগাজিনে দেয়া, এক্সজিবিশনের দেয়ালে ঝুলতে দেখা নিজের আঁকা শেষ ছবিখানা। রেস্লিং এ রকের মারামারি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলা” ইফ ইউ স্মেল ।।”, শুক্রবার রাতে এন্টিনা ঠিক করে সবাই মিলে ” ইত্যাদি ” দেখার প্রস্তুতি, হুমায়ুন আহমেদের নাটকের জন্য কারেন্ট না চলে যাওয়ার জন্য নফল নামাজ, বাঁকের ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ায় বাচ্চা বয়সের স্বপ্ন ভাঙ্গা, দেয়ালে একে রাখা নৌকা-ধানের শীষ। প্রথম কম্পিউটার পেয়ে বন্ধুদের সাথে রেসিং গেম খেলে ঘেমে যাওয়া, জীবনের প্রথম প্রাইভেট পরিয়ে ৫০০ টাকা পেয়ে মায়ের পায়ের নিচে রেখে রুমে এসে চোখ মোছা, দিল চাহতাহের আমির খান হওয়ার জন্য ঠোঁটের নিচের দাঁড়ি রাখার চেষ্টা, জোর করে পেছনের চুল বড় করা, কিংবা কম দামি জেলের স্পাইক, কোনা করে কাটা অস্পষ্ট চিপ। ক্লাস শেষে বাচ্চু-জেমস-হাসানের গান গেয়ে স্কুল মাথায় তোলা, ভালো লাগার মেয়েটির ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসে কোন কথা না বলে পার করে দেয়া একটি বছর। বিল্ডিং এর ছাদে দাঁড়িয়ে শীশ, আয়না কিংবা লেজারের আলোয় সামনের বারান্দার মেয়েটিকে ইশারা করা, বর্ষা রাতে কানে হেড ফোন দিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনা, হিমু হয়ে ঢাকার রাস্তায় খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো; শেষ বিকেলের লাস্ট ওভারে বিশাল ছক্কা মেরে ছাদে দাঁড়ানো কিশোরীর মন জয়ের শেষ চেষ্টা।

একদিন দেশ সেরা ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন দেখে হাত খরচের টাকা দিয়ে ব্যাট কিনে দেয়া বড় ভাইয়া।
নিজে ঈদে কিচ্ছু না নিয়ে সেই টাকায় আমার প্রিয় জুতাটি কিনে দেয়া সেই মেজ ভাইয়ার ভালবাসা,
বড় বোনের প্রাইভেটের টাকা দিয়ে ছবি আঁকার জন্য রং তুলি কিনে দিয়ে বলা, “একদিন পিকাসো হবি।”
ভোরে ঘুম ভেঙ্গে দেখা বুকে এসে শুয়ে থাকা আদরের ছোট বোনটি।
আমার প্রিয় ব্যাগটি কিনে হাতে নিয়ে অফিস থেকে ঘামে ভিজে বাসায় ফিরে বাবার বলা, ” আবার ফাস্ট হলে সাইকেল কিনে দিব ”
আমার মা, বাংলাদেশের আমার সোনালী দিনের ছোট্ট জীবন মাকে জ্বালিয়ে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্ত, মায়ের আচল, মায়ের হাতের খাবার, মায়ের বকুনি, মায়ের শাসন, মায়ের ভালবাসা…।
বাংলাদেশ!!!
আমায় ফিরিয়ে দিবে আমার মাটির গন্ধ ? আমাকে কি আর একবার সুযোগ দিবে মায়ের কোলে মুখ লুকাতে ?
জন্মেছিলাম সোনার বাংলায়, আমাকে কি দেশের মাটিতে মিশে যেতে দিবে ? আর একবার ??

ছবিঃ এস এম আমিনুল রুবেল ও টুটুল নেসার