মটরসাইকেল ডায়রী…৩

সুব্রত গোস্বামী

সুব্রত গোস্বামী

আবার চলার শুরু। গ্রুপ বাইকিং-এ কয়েকটা ছোটোখাটো নিয়ম মেনে চললে বাইকিংটা আরো উপভোগ্য হয়ে ওঠে। প্রতি পঞ্চাশ কিলোমিটার অন্তর অন্তর শেষের বাইক চালক সবার আগে চলে আসবে এবং নেতৃত্ত্ব দেবে। শেষ চালক ছাড়া প্রত্যেকের আয়নায় পেছনের বাইকটিকে সদা দৃশ্যমান রাখতে হবে। কোনো মূল্যেই একে অন্যকে অতিক্রম করা চলবে না। আর বিশেষ ভাবে হর্ণ বাজিয়ে কয়েকটা নির্দিষ্ট ইশারা শিখে নেওয়া। ব্যাস। আপনি বিন্দাস বাইকার।

আবার বিশ্রাম, কিছু পরেই আবার চলা। এভাবেই আজ পৌঁছে যাব আমাদের আজকের গন্তব্য ভবানীপাটনা। কালাহাণ্ডির জংলী পথ দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। জঙ্গলটার ভেতরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যেতে মন চাইল। দাঁড়িয়ে গেলাম। বলেছিলামনা, বাইক ট্রিপের এই এক সুবিধে। কোনোকিছুর তাড়া নেই, সবকিছু মর্জিমাফিক। আবার চলা, এই যে ওভারটেকিং দেখছেন, এটা ছবির স্বার্থে করা। ভুল বুঝবেননা।

ভবাণীপাটনার রাজবাড়ি

ভবাণীপাটনার রাজবাড়ি

সিং ধাবা। আজকের দ্বিপ্রাহরিক ভোজন এখানেই। মুল হোটেলের বাইরে কতগুলো কুঠুরি করা আছে। আমরা সেখানেই খেতে বসে পড়লাম। গরমগরম খাবার দিয়ে গেছে। নিশ্চই খাওয়া হবে। মোবাইল ফোনকে দোষ দিয়ে কী লাভ? ওটা ছিল বলে এই ছবিটাও দেখাতে পারলাম।

ডায়মণ্ড শেপে রাইডিং চলছে। রানাদা লিড করছে। আর কিছুদুরেই ভবানীপাটনা।

ভবানীপাটনা পৌঁছে বেশ সস্তায় একটা হোটেল জুটে গেল। আদবকায়দা বেশ কর্পোরেট। যদিও এখানে শুধুই রাত্রিযাপনের পরিকল্পনা তবু সন্ধেবেলাটা এক চক্কর লোকালয়ে ঢুঁ মারতে আপত্তি কোথায়। হাল্কা শীত, বেরিয়ে পড়লাম চারজন। ভারি মিষ্টি জায়গা। পাশেই জেলাশাসকের অফিস বাংলো, তাই জায়গাটা বেশ পরিস্কারও। একটু হেঁটেই পেয়ে গেলাম রাজবাড়ি। পাশেই একটা মন্দির। মন্দিরের ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে শুনে আর তুললামনা।

গতকাল রাজবাড়ির কাছেই রানাদার সঙ্গে স্থানীয় এক যুবকের আলাপ হয়। তার কাছে জানা গেল ফুরলিঝরণের কথা। ভবানীপাটনার সবথেকে বড় আকর্ষণ, আমাদের বাড়তি পাওনা। অতএব ফুরলিঝরণ।

কোরাপুটের পথে নাম না জানা নদী

কোরাপুটের পথে নাম না জানা নদী

আজ আমাদের ফুলবনি পৌঁছনোর কথা। চিত্রকূটের পর মূল আকর্ষণ হিসেবে সাতকোশিয়া রয়েছে। ভবানীপাটনা, ফুলবনি, প্ল্যান অনুযায়ী এগুলো পথিমধ্যে রাত্রিযাপনের গন্তব্য। কিন্তু ওই যে, এটা বাইক অভিযান। মূহুর্তে ছক বদলে ফেলা যায়। আর বদলে ফেলা যায় বলেই না এমন জিনিস চাক্ষুষ করা যায়।

এই ভদ্রলোক একার হাতে পুরোটা সামলাচ্ছেন। গ্যাসওভেন টু ক্যাশবাক্স, ওয়ান ম্যান আর্মি। এখানে প্রাতরাশ সেরে ভবানীপাটনাকে বিদায় জানালাম।

চলা থামা, থামা চলা নিয়ম মেনে এগিয়ে চলেছি আমরা। এই পথটা একটু বালি আর পাথর ভরা। তবু বেশ জোরেই চলছে বাইক চারখানা। ব্রেক করার প্রয়োজন হলেও খুব সাবধানে কষতে হচ্ছে। কে জানে এই পথেরই কোথাও আমার বাইকের চাকার প্রেমে অপেক্ষায় পড়েছিল ছোট্টো পেরেকখানা।

ছোটকেয়ির রিসর্টে অশোকদা

ছোটকেয়ির রিসর্টে অশোকদা

পাঙচার ব্যাপারটা আমার বেশ গা-সওয়া। বৃষ্টি-লোডশেডিঙের রাত-দোকান বন্ধ এধরনের কম্বিনেশনে পাঙচার ফেস করার ক্রেডেনশিয়াল আমার আছে। তাই সতেরোশ কিলোমিটারের ওপর সময় লেগে গেল দেখে একটু অবাকই হচ্ছিলাম। এদিনের পাঙচার হওয়া আর দোকান খুঁজে পাওয়া কেবলমাত্র চোখ ফেরাতে যেটুকু সময় লাগে সেটুকু। সঙ্গে অতিরিক্ত টিউব ছিল, সেটাই লাগিয়ে নিলাম। আর পুরোনোটা সারিয়ে ব্যাগে পুরে নিলাম। খুব যত্ন নিয়ে সারাই করলেন ছেলেটি।

ফুলবনির কাছাকাছি চলে এসেছি। পারদটা যেন টুপ করে নেমে গেল। উড়িষ্যার ফুলবনি, দারিংবাড়ি এই শহরগুলো একটু উঁচুতে। কাজেই এখানকার ঠাণ্ডা এরাজ্যের অন্য শহরগুলোর থেকে একটু বেশিই। এমনিতেই আজ একটু লেট রান করছিলাম আমরা, তারওপর পাঙচার। আলো কমে আসছে। আলো থাকলে প্ল্যান ছিল ফুলবনির আশপাশ ঘুরেই হোটেলে ঢোকা। কিন্তু হয়নি। আজকের রাতটা শুধু এখানে কাটিয়ে কাল টিকরপাড়া। সাতকোশিয়া টাইগার রিজার্ভ।

ভোর ছটা বাজতে দশ। ঠাণ্ডা বেশ ভালোই রয়েছে, তবে হাওয়া নেই। পতাকারা মিইয়ে পড়ে রয়েছে। এই পতাকা গুলো কিন্তু শুধুই বারফট্টাই নয়। বাইকের পেছনে থাকলে নিজেদের বেশ চার্জড মনে হয়। দেশের জার্সি পরে খেলতে নামার মত। তাছাড়া এই উজ্জ্বল রঙা পতাকা নিজের দলের বাইক দূর থেকেই চিনিয়ে দেয়। ছবি তোলার জন্য আমি বেশ কয়েকবার পিছিয়ে পড়েছিলাম। অনেকবারই স্থানীয় মানুষেরা নিজে থেকেই বাকি দলটার হদিশ ইশারায় বাতলে দিয়েছেন।

মহানদীর সেতুতে

মহানদীর সেতুতে

ফুলবনি ছেড়ে বেরোনোর আগে পাহাড়ি পথের বাঁকে একঝাঁক আলো যেন আমাদেরই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। ছবি তুলতে ভালোবাসা মানুষের পক্ষে লোভ সামলানো কঠিন। রানাদা ক্যামেরা তাক করে বসে আছে দেখে আমি এগিয়ে গেলাম। এই যে, এই ছবিটা। আমার চলমান আলোকস্নানের মূহুর্ত।

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে মসৃণতার আদর খেতে খেতে এগিয়ে চলেছি আমরা। পাতার ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা যেন পথটাকে বড্ড বেশি রোম্যাণ্টিক করে তুলেছে। কিছুটা পরই কোনোএক লোকালয়ে পৌঁছে এপথ শেষ হবে হয়ত। নিজেকে খুব আশকারা দিতে ইচ্ছে করছে। তাই তো কোমর বেঁধেছি, একহাতে অ্যাক্সিলারেটার আর একহাতে ক্যামেরা, যাহয় হোক। পুরো পথটা এভাবেই চলব। ছবির মত পথ আজ আরেকবার ছবি হোক তবে।

সাতকোশিয়ায় থাকতে হলে অনুমতির জন্য অনুগুল যেতেই হবে। বনদপ্তরের আধিকারীক সেখানেই বসেন। ফলে একই পথে বেশ কিছুটা যাওয়া আসা করতে হবে আজ। জিপিএস-এর বাইরেও কিছু পথ স্থানীয় মানুষদের জানা থাকে। স্বতপ্রণোদিত হয়ে বাতলেও দেন তাঁরা।

অনুগুল যেতে আজ মহানদী পেরোতে হবে। এই জার্নির দ্বিতীয় দিন কটক ঢোকার আগে একবার মহানদী পেরিয়েছিলাম আমরা। আজ দ্বিতীয়বার পেরোবো।

মহানদির তীরে নাম না জানা সেই জায়গাটা

মহানদির তীরে নাম না জানা সেই জায়গাটা

মহানদী বেশ চওড়া তাই তার পার হওয়ার সেতু বেশ লম্বা। দুবারই আমার মাঝপথে এসে মনে পড়েছে ওডোমিটার দেখে রাখলে দৈর্ঘ্যের হিসেবটা বের করা যেত। গুগল দেখে এখন বলেই দেওয়া যায়। কিন্তু তাতে আনন্দমেলা আর ভূগোলবইয়ে তফাৎটা কমে যাবে। তারথেকে যা চোখে দেখছি তা বলাই ভালো। পথের দৈর্ঘ্য ওডোমিটারেই পড়ে থাকুক। চলার পথের মনে না থাকা জনপদের নাম না হয় ওয়েস্ট-ব্যাগের নোটপ্যাডেই হারিয়ে যাক।

এখান থেকে বেশকিছুটা পথ পেরিয়ে তবে অনুগুল পৌঁছনো যাবে। মাইলফলকে যা লেখা আছে তা পড়লে অনুগুল নয় আঙুল বলতে হবে। কিন্তু স্থানীয় মানুষকে অনুগুল বলতেই শুনছি। উড়িয়া লেখাতেও দেখলাম নয়ের নিচে হ্রস্ব-উই রয়েছে।

অনুগুলের বনবিভাগের অফিস। আজ রোববার। দায়িত্ত্বপ্রাপ্ত আধিকারীকরা ছুটিতে। চিরর কাছে নম্বর ছিল ভাগ্যিস। কিন্তু ফোন যে ফোনের মতই বেজে যাচ্ছে। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় অবশেষে ওপ্রান্তে হ্যালো শোনা গেল। বাড়ি থেকে আসতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে তাঁর।

তিনি এলেন, অনুমতি পাওয়ার জন্য অনেক ফর্মটর্ম ফিল-আপ করে জানতে পারলাম টিকরপাড়ার টেণ্ট এখনো পিচ করা হয়নি। আমাদের থাকতে হবে ছোটকেয়িতে। বনদপ্তরের লাক্সারি রিসর্ট। ছোটকেয়িও সাতকোশিয়ার ব্যাঘ্রপ্রকল্পের আওতায়। জায়গাটা সম্বন্ধে আমরা কেউই জানিনা। আমাদের স্বস্তি দেওয়া জন্য কম্পিউটার থেকে ছবি দেখালেন ভদ্রলোক। অনুগুল ছাড়িয়ে অনেকটা এসে জঙ্গলের সীমানায় পৌঁছলাম। এখানে আর একপ্রস্থ সইসাবুদ সেরে আবার তিরিশ কিলোমিটার মতন বাইকিং।

ছবিঃ লেখক