শেষ খেয়ার অপেক্ষায় কবে থেকে ছিলেন

 

কাজী জহিরুল ইসলাম

কাজী জহিরুল ইসলাম

যারা ক্ষমতার আশে-পাশে থাকেন তাদের সম্পর্কে অনেক আজে-বাজে কথা শোনা যায়। কবি মাহবুবুল হক শাকিল সম্পর্কে তেমন কথা কখনোই শুনি নি। শুধু শুনেছি তিনি কবিদের ভালোবাসেন, লেখকদের ভালোবাসেন। রাষ্ট্রও যেন কবিদের ভালোবাসে নিরন্তর সেই প্রচেষ্টায়ই নিয়োজিত ছিলেন। এ বছর ২৮ আগস্ট নিউ ইয়র্কে বসবাসরত কবি শহীদ কাদরী মারা যান। মাত্র হাসপাতাল থেকে ফিরেছি। বাংলাদেশ থেকে মাহবুবুল হক শাকিলের টেলিফোন আসে। তাকে আমার নাম্বার দিয়েছেন কানাডায় বসবাসরত কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সব কিছু খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এবং সুচারুরূপে করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনারা কি ওখানেই দাফন করবেন, না ঢাকায় করবেন?” আমি বলি, অবশ্যই ঢাকায়। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন আসে। “জহির ভাই। আমি কনসাল জেনারেলের সাথে কথা বলেছি। সব ব্যবস্থা খুব দ্রুত করতে বলা হয়েছে। কোনো কিছুর দরকার হলে আমাকে জানাবেন।” কবির স্ত্রী নীরা কাদরী ক্রমাগত কেঁদে চলেছেন। তার পাশে আছেন রাজিয়া নাজমী। আমি রাজিয়া নাজমীকে ফোন করি। জানতে চাই, নীরা ভাবী কথা বলার মত অবস্থায় আছেন কিনা। তাকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের কথা বলি। নীরা ভাবী কথা বলবেন বলে আমাকে জানানো হয়। আমি শাকিলকে নীরা কাদরীর নাম্বার দিয়ে বলি, আপনি ভাবীর সাথে একটু কথা বলেন। বিকেলে তিনি আবার ফোন দেন। আমাদের অনেকক্ষণ কথা হয়। সব কথা শহীদ ভাইকে নিয়েই। শহীদ ভাইয়ের মৃত্যুটা আমাদের অনেকের মতো তিনিও নিতে পারছেন না। এক পর্যায়ে কথা শেষ করার জন্য আমরা দু’জনই দু’জনকে বলি, “ভাল থাকবেন”। আমাদের কথা তবুও শেষ হয় না। শাকিল হাসি এবং কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলেন, “দেখেন আমরা কত হিপোক্রেট। আমরা কেউই এখন ভাল থাকতে পারবো না, তারপরও বলছি ভাল থাকবেন”। এরপর কান্না। আমি একটি শিশুর হাসি দেখে আবেগে কেদে ফেলি, বই পড়ে কাঁদি, সিনেমা দেখে কাঁদি, কিন্তু মানুষের মৃত্যুতে কান্না নিয়ন্ত্রণ করি। খুব নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতেও আমি কাঁদি না। কিন্তু শাকিলের কান্না আমাকে সংক্রমিত করে। আমিও কাঁদতে শুরু করি। গতকাল আমার একমাত্র খালা মারা গেছেন, দু’সপ্তাহ আগে আমার স্ত্রীর খালা মারা গেছেন। আমি কাঁদি নি। কিন্তু আমি আজ কাঁদছি। আমি কাঁদছি শাকিলের জন্য। শাকিল কেন চলে যাবেন? ওরতো যাবার সময় হয় নি। কবিদের দুর্দিনে ওর মতো করে আর কে পাশে এসে দাঁড়াবে? এই যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রোটোকল ভেঙে কবির রোগশয্যাপাশে গিয়ে বসে পড়েন, এই যে অসুস্থ কবির চিকিৎসার সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিয়ে নেন, এর পেছনে যে অদৃশ্য মানব নিরন্তর কাজ করেছে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী কবি মাহবুবুল হক শাকিল। এ কথা দেশের সব মানুষ না জানলেও আমরা যারা তার কাছের মানুষ, তারাতো জানি। শাকিল আবির্ভূত হয়েছিলেন বাংলাদেশের কবিদের জন্য আশির্বাদ হয়ে। এই মধ্যদুপুরে তার চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
গত কয়েক মাস ধরেই লক্ষ করছিলাম মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পাশে পাশে শাকিলের নিবিড় অবস্থান, আর কেমন যেন উদাস তার দৃষ্টি। ও কি শুনতে পেয়েছিলেন অন্তহীন অন্ধকারের শব্দ। আমার এক সহকর্মী রাফায়েল ইউলিয়ামস মৃত্যুর ছয়মাস আগে থেকে নিয়মিত ফেইসবুকে শুধু সূর্যাস্তের ছবি পোস্ট করতেন। আর কিছু নয়। এই সময়ে সে একটিবারও নিজের কোনো ছবি বা কোনো কথা পোস্ট করেনি, পোস্ট করেছে কেবলই সূর্যাস্তের ছবি। যে রাতে রে (আমরা ওকে সংক্ষেপে রে ডাকতাম) মারা যায়, সেদিন ও সর্বশেষ যে ছবিটি পোস্ট করে সেটি ছিল সূর্য ডুবে যাওয়ার পরের আকাশের লাল আভা। রে এই পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছিল যে তার সূর্য ডুবে গেছে। তিনি এক অনন্ত অন্ধকারের অবগাহনযাত্রা করছেন।
আজ ৬ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার। আজ দুপুরে কবি মাহবুবুল হক শাকিল চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। কিন্তু কেন যেন আমার মনে হচ্ছে রাফায়েলের মতো শাকিলও কিছু টের পেয়েছিলেন। ২২ নভেম্বর রাত নয়টা ২৮ মিনিটে তিনি লিখেন—
“কোনোদিন সেই নদীর কাছে গিয়ে বলা হলোনা,shakil_cover_12_07
ক্ষমা করো বালিকা, চিরতরে ঢেকে দাও তোমার জলে|
ঘনিষ্ট বসবাস যে হৃদয়ের আমাদের কণ্ঠের কাছে,
অবসর হলোনা শোনার কি দুঃখ তার গভীর ভিতরে আছে?

তবুও এই আয়ুক্ষয়, বৃথা বাক্য, জীবন নিংড়ে নেয়া কাব্যদোহন
আমাদের ভ্রমণপিয়াসু উড়ন্ত মন নিয়ে কেবলি নিরুদ্দেশে চলে যায়|
প্রাচীন গুহা ভরে উঠে সারিবদ্ধ অচেনা মৃতদেহের স্তুপে,
সোনালী গমের মতো রৌদ্রময় দিনে যাত্রা থামে ধ্বংসের কাছে এসে।”
(ক্ষমা করো নদী, ক্ষমো মোরে বালিকা)

তিনি বলে দিলেন, “আমাদের ভ্রমণপিয়াসু উড়ন্ত মন” “কেবলি নিরুদ্দেশে চলে যায়” আর “প্রাচীন গুহা ভরে উঠে সারিবদ্ধ অচেনা মৃতদেহের স্তুপে।” এর মাত্র ছয় দিন পর ২৮ নভেম্বর ভোর ৪টায় লিখেন-
“মূলত আমি কেউ না, না রাজনীতিবিদ, না কবি, না গল্পকার, এমনকি নই তুমুল সংসারী| এক অভিশপ্ত চরিত্র যার কিছুই থাকতে নেই| সাধু কিংবা সন্ত নই, চোখ জ্বলজ্বল করে জীবনের লোভে| চন্দ্রাহত, বিষাদ এবং ভূতগ্রস্থ, বসে থাকি ব্রহ্মপুত্র ঘাটে, শেষ খেয়ার অপেক্ষায়……..”
ইঙ্গিতটি যেন ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, “বসে থাকি ব্রহ্মপুত্র ঘাটে, শেষ খেয়ার অপেক্ষায়….”।
বাক্যের শেষের এই যে একসারি ডট, এর প্রতিটি বিন্দু যেন এখন অর্থবহ, কি যেন বলতে চেয়েছিল, যা আমরা তখন বুঝিনি। ওইদিনই বিকেল ৫টা ৩৯ মিনিটে লিখেন-
“আমরা কি ঘুমিয়ে ছিলাম সেই রাতে? সেইসব রাতে?
নক্ষত্র খচিত রাত বার্তা পাঠায় ভালোবাসার, মলাট
খুলিনা, ভুলে যাই পিতামহের হিমাগার, আধখানা বই|
তোমার হেমন্ত দিনে আমার বসন্ত আসে ক্রমাগত স্বাদু
জিলিপির মতো, ভুলেও অনিকেত আমি ঠিকানা জানিনা|

এইসব মধুরাত শেষ হয় নিশ্চয় মরণের কালে, আমাদের
শরীর মরে যায়, মরে যায় নিকষ অক্ষর, নক্ষত্রশোভিত রাত।”

এইসব মধুরাত সত্যি সত্যি শেষ হয়ে গেল। খুব ইচ্ছে ছিল সামনের সামারে দেশে যাব, আড্ডা দেব শাকিলের সাথে, হলো না।