প্রতিমার তালপাতার বাঁশি আর বুকের জ্বালা

রুদ্রাক্ষ রহমান

শহরে কি শীত নেমে এলো? দূরের গ্রামেতো নেমেছে অনেকটা আগেই। খালপাড়ের সবুজ ক্ষেতে, সন্ধ্যানামার আগে সবুজ বাতাস দোল দিয়ে যায় ধনেপাতার বনে। গাঁয়ের ধনে পাতার ঘ্রাণ শহরে এসে একটু প্রাণ হারায় ঠিক, তবে এখনো গ্রাম লাগোয়া ঢাকা শহরের সবজি বাজারে ধনে পাতার গন্ধ নাকে এসে লাগে কুয়াশায় ডুবে থাকা সকালে।
এখন, এই শহরের শীত মানেই ভীষণ অভিমানী,  দেমাগী এক প্রেমিকা যার স্পর্শ পাওয়াই স্বর্গজয়কা-। হেমন্ত যায় যায় করছে যখন, ঠিক তখন দুদিন ভোরবেলা কুয়াশার ভেতর একটু শীতের আভাস পাওয়া গেলো। আর তেমনি এক শীত সকালে গেয়ে উঠলেন তিনি। আকুতিভরা এককণ্ঠ, খুব মায়াজড়ানো। ‘একটা গান লিখো আমার জন্য/না হয় আমি তোমার কাছে ছিলাম অতি নগন্য।’ গানে গানে তিনি নিজেকে বলছেন, ‘আমি ছিলাম তোমার প্রেমের স্বপ্ন নায়িকা সেই স্বপ্ন নায়িকা তার প্রেমিককে মিনতি করছেন, তাকে নিয়ে একটি গান লিখতে। একটি গান, কেবল একটি গান; কী সামান্য চাওয়া তার। ঘুম ঘুম সকালে, কোনো না কোনো ভাবে এই গানটা যদি এখনো ধরা দেয় কোনো অনুভুতিপ্রবণ বাঙালির কাছে, তাহলে বুকের তলে হু হু করে উঠবে, তার জন্য, মানে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য মায়া লাগতে শুরু করবে।sddefault
লং প্লে, থেকে কলের গান, ক্যাসেটের ফিতাযুগ পেরিয়ে সিডি আর এখন ইন্টারনেটের দৌলতে ইউটিউব, আরো কত মাধ্যমে প্রতিমা বাঙালির সঙ্গে মিশে আছেন একাকার হয়ে।  কাননবালা দেবী, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতাদত্ত, আরতী মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, হৈমন্তী শুক্লা, পরভাষী লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলের পাশাপাশি প্রতিমা তার সময়ে হেঁটেছেন একদম নিজের পথ ধরে। আমরা যারা গড় জীবন আয়ুর তিন ভাগের দুই ভাগ পেরিয়ে এসেছি আগেই, তারাও প্রতিমার গান শুনেই বোধ জাগিয়েছি। এখনো সাত সকালে, যদি বেজে উঠে-‘ বড়  সাধ জাগে একবার তোমায় দেখি’ তখন হারিয়ে যাওয়া কিছু সময়, কতগুলো মুখ দেখার জন্য বুকের গভীর তলে তীব্র-গভীর বেদনার জন্ম হতেই থাকে। তিনি যখন টানা টানা সুরেলা-সহজিয়া ঢঙে উচ্চারণ করেন,‘ স্মৃতির জানালা খুলে চেয়ে থাকি/ চোখ তুলে যতটুকু আলো আসে/ সেই আলোয় মন ভরে যায়’- তখন এই জগত, এই সংসার, এই সময়, কেমন স্তব্ধমুগ্ধতায়-শূন্যতায় একাকার হয়ে থমকে দঁড়ায় তা কেবল প্রতিমার শ্রোতারই অনুধাবন করতে পারবেন।
ধরা যাক, কোন এক শীতের বিকেল পা চালিয়ে হাঁটছে সন্ধ্যার দিকে। টুপ করে পুকুরের জলে হিজলগুটা ঝরে পড়ার শব্দের মতো দিনটা হারিয়ে গেলো। সেই সময়ে কাছে অথবা দূরে বেজে উঠলেন প্রতিমা-‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি।’ এক ঝটকায় এ গানটা যে কাউকে আলতো করে তুলে নিয়ে যাবে ছেলেবেলার কোনো এক বৈশাখী মেলায়। আর যাদের কৈশোর কেটেছে গ্রামে তারা এখনো ঘ্রাণ পাবেন সেই সময়টার, সেই ধুলোওড়া মেলার।
প্রতিমা সখীকে প্রশ্ন করছেন-‘ মনে আগুন জ্বালে চোখে কেনো জ্বালে না?’ সখী বলছেন, চোখে যে সাগর আছে আগুন যে সই জ্বালে না’- বাঙালির চিরচেনা এক গান।  প্রতিমা গাইছেন, ‘ ভালোবাসা আসবে বলে খুলে দিলাম দরজাটাকে মন থেকে সুখ যে আমার পালিয়ে গেলো সেই ফাঁকে।’ হারমোনিয়াম টানা প্রলাপে-আলাপে, কলাপে বড় একটা টিপ, পানখাওয়া মুখের প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখতে, তার গলা শুনলেই আমার বেদনার কথা মনে হয়, আকুতির কথা মনে হয়, দুঃখভরা একটা ফুলগাছের কথা মনে হয়। তিনি দারুণ মিষ্টি একটা গলা নিয় বাঙালির কাছে চিরদিনের বেদনার গায়িকা হয়ে রয়ে গেলেন। আর যদি তাই না হবে তিনি কেনো অমর করে গাইবেন,- ‘জলে ভাসা পদ্ম আমিগো শুধু পেলাম ছলনা/ ও আমার সহেলি আমার নেইকো কোথাও কোনো ঠাঁই/ বুকের জ্বালা কোথায় যে জুড়াই?’
প্রতিমা বোধ করি বুকের জ্বালা জুড়াতে পারেননি, প্রকৃত শিল্পীরা এ জ্বালা জুড়াতে পারেন না কখনোই। আর তার শ্রোতা হয়ে আমরাও বুকের জ্বালা  জুড়ানোর  কোনো ঠিকানা পাইনি আজও!
রুদ্রাক্ষ রহমান: গল্পকার