ভালবাসার শহর (২)

শারমিন শামস্

শারমিন শামস্

শহরে ভালবাসারা দিশাহারা। আমি আমার ভালবাসার কালে শহরের অলিগলি রাজপথ পায়েচলা রাস্তা- সবটাই মাড়িয়ে টারিয়ে ভালবাসার কানাগলিতে অন্ধ উপস্থিত হয়েছি কতবার! কত কত বার আমার বেদনার্ত বিরহী দুই পা শহরের কত ফুটপাথ খুঁড়ে খুঁড়ে নিষিদ্ধ বস্তুর মত এনে দাঁড় করিয়েছে আমাকে প্রেমিকের মুখোমুখি। তারপর আমি প্রেমিকের দুইবাহু আঁকড়ে ধরে সপাটে তাকে চুমু খেতে চেয়েছি মহানগরের ব্যস্ততম সড়কের উপর,আর ভেবে নিয়েছি আমার আর আমার প্রেমিকের শরীরের তলদেশ থেকে একদিন এভাবেই পিলপিল করে বেরিয়ে আসবে শেকড় আর মেট্রোপলিটনের প্রশস্ত রাজপথের পাশে দুটো বোকা গাছ হয়ে আমরা দাঁড়িয়ে থাকবো আজীবন।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র

কিন্তু আমরা মিশে থেকেছি কাজী নজরুল এভিনিউয়ের ধার ঘেঁষে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরোনো ইটের শ্যাওলায়, শাহবাগের ফুল ফুল উৎসবে আর পান্থপথের রিকশায় মন খারাপের বোচকা বহন করে টেনে নিয়ে গেছি লালমাটিয়ার সদর দরোজা পর্যন্ত। আমার জীবনের প্রেম কেমন পথে পথে ডুগডুগি বাজিয়ে খেলা দেখাতে চেয়েছে। আমিও প্রেমের হাত ধরে বুড়িগঙ্গার পাড়ে যেতে চেয়েছিলাম, ঠিক যেরকম দিনে কেউ কোন খোঁজ রাখেনি আমার, সেইসব নির্ভার দিনে। কিন্তু প্রেম কবে ইট কাঠের জগাখিচুরির ভিতর তালগোল পাকিয়ে হয়ে উঠেছে পিৎজ্জা হাট, বেলাইটালিয়া, ফায়ার ফ্রাইস, ক্রিম এন্ড ফাজ। আমিও সেই কিচকিচে রোদ্দুর ফেলে কাঁচের ঘেরার ভিতরে আলোর ফুল ধরতে গিয়েছি। বুড়িগঙ্গা বয়ে গেছে তার নিয়মের বাইরে কালচে দূষিত জলের হয়রানি বুকে নিয়ে।

buriganga-river

বুড়িগঙ্গা

আমরা নাতিশীতোষ্ণ বাতাসে একে অপরকে গ্লানিময় রেখে কফিতে চুমুক দিয়েছি সন্ধ্যাবধি। তারপর বাড়ি ফেরার পথে আমরাই খুঁজেছি মানে- হয়ত প্রেমের, হয়ত ভালবাসার, হয়ত করুণার। ভালবাসা এক টুকরা কাগজে লেখা সুনীলের কবিতা, এলভিস প্রিসলির গান। ইয়েটসের চার লাইন আঁকড়ে ধরে বুক পকেটের উষ্ণতায় কাঁপতে কাঁপতে কেউ কখনো পৌঁছে গিয়েছে শ্যামলী। তারপর দেখে মেয়েটাও ঘুমহীন নাকছাবি হারাবার শোকে। তারপর পৃথিবী শীতের রাস্তায়, ধুলো আর ধুলো, শন শন শব্দে শুধু হারাই হারাই করছে! শেষমেষ সব মিটে টিটে গেলে দুটিতেই নেমে আসে হাত ধরাধরি…. ভালবাসা পিটপিটে চোখে তাকায় হয়তবা… রিকশায় গা ঘেষে বসে থাকা প্রেমিকটি আমার। ওইদূরে নদীটিও… চেয়েছিলাম যাব, যাওয়া ইলো না তো। শহরটা ঢাকা!