আকাশজুড়ে চাঁদের আলো রূপার জলে আঁকা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা,পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

শহরে শহরে, অলিতে-গলিতে যারা লেখালেখি করে, গানের চর্চা করে, আড্ডা দেয়, একে অন্যের সাথে ভাবের আদানপ্রাদান করে তারা আসলে কেমন হয়? চারপাশের মানুষ থেকে আলাদা হয়ে এরা নিজেদের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠে। মাঝ থেকে হুট করে যদি কেউ হারিয়ে যায়, তখন অন্যদের কেমন লাগে? স্বাভাবিক নিয়মে প্রথম প্রথম মন খারাপ লাগে, কিন্তু ভুলতেও সময় লাগেনা।

লেখক ও কবিদের আড্ডা, কারো বাড়িতে, কারো অফিসে, কিংবা কফি লাউঞ্জে। একটা সময় ছিল পত্রিকায় বা সাহিত্য পাতায় একটা লেখা ছাপা হলে এসব আড্ডায় বিপ্লব হয়ে যেত। এখন সবখানে শুধুই নিরবতা। সরব শুধু ফেসবুক। এখানেই যত আলোচনা। ফেসবুক এখন আমাদের দেয়াল পত্রিকা। ছবি দেয়া যায়, মন্তব্য লেখা যায়, কবিতা দিয়ে দেয়া যায়। আর সাথে কত শত ‘লাইক’। বন্ধুত্বের নির্নায়ক হয়ে উঠে এই লাইক।

অনেক বিশুদ্ধবাদী হয়তো সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু সময়ের চাহিদায় ফেসবুক ওয়াল এখন এক বড় প্ল্যাটফর্ম। আর বিষয়টি সিরিয়াস হয়ে উঠছে দ্রুত প্রতিক্রিয়া বা ফিডব্যাকের কারণে।

ফেসবুক নিয়ে নয়। ভাবছি সাহিত্যের আড্ডা নিয়ে। আমি দেখেছি এসব আড্ডায় গান নিয়েই আমাদের কথা হয় বেশি। এই গানের মাঝেই যেন জীবনের সন্ধান। আর বেশি সময় লোক গান। ইউটিউবের কল্যাণে কোন কবির অনুরোধে মরমী গান শুনতে শুনতে দর্শনের কত কথা উচ্চারিত হয়। এখনো হয়। শুধু একজন নেই এখন। হারিয়ে গেছে দূরের আকাশে। গান আর কবিতা, কিংবা নিজের লেখা ছোট গল্পের মাতামাতি আর আমি কোনদিন দেখবোনা।insite_shakil

কবি মাহবুবুল হক শাকিল কবিতা লিখতো। কবিতার বইও ছিল। কিন্তু তার দু’একটি ছোট গল্প আমার কাছে মনে হয়েছে কবিতা থেকেও উৎকৃষ্ট। আর ফেসবুকে দেয়া তার অনেকগুলো কবিতা দেখে মনে হয়েছে সে জীবনটাকেই কাব্যময় করে রেখেছিল।

সারাজীবন নিষ্ঠা আর আস্থার সাথে হয়তো কবিতা লেখেনি। বিলম্বে শুরু করেও তার চেষ্টায় কোনো খাদ ছিলো ছিলো না। যেসব সংবেদনশীল পাঠক তার কবিতার গভীরে যেতে পেরেছে তারা তার রচনার প্রতি অলঙ্ঘনীয় আকর্ষণ অনুভব করেছে। মৃত্যুর কথা অনেকবার এসেছে। ব্যক্তিমনের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কবিতাতেই বেশি প্রতিফলিত হয়। তার নিজস্ব সামাজিক প্রেক্ষাপট কি ছিল সেটা কেবল তারই জানা।

সাহিত্যিক বিবেচনায় কবি শাকিলকে বিবেচনা করতে হবে সচেতনতা বোধ দিয়ে। আমাদের পারিপার্শ্বিক ঘটনার প্রাবল্য, বিশেষ করে রাজনৈতিক বাস্তবতা তার কবিতায় এবং সাম্প্রতিককালে তার গল্পে সে ধরতে চেষ্টা করেছে। তাই হলি আর্টিজনের জঙ্গি হামলাই হয়ে যায় তার গল্পের প্লট। সচেতনভাবে একটা সামগ্রিক ভাবের প্রকাশের দিকে নিবেদিত লেখক হারিয়ে গেল সবকিছুকে বিক্ষিপ্ত করে।

যার ভেতর প্রেম আছে, আবার সমাজের জন্য চেতনা আছে, সেইসব কবি যেমন রবীন্দ্রবলয়ে বিচরণ করেন, তেমনি জীবনানন্দেরও অনুসারী হয়ে উঠেন। কিন্তু গল্পের লেখকতো দেখছিলাম একদম অন্যরকম করে নিজেকে মাত্র প্রকাশ করতে শুরু করেছিল। কোন নির্দিষ্ট স্টাইলের অনুকরণ নয়, অনিবার্যভাবে নিজের মতো করে।

ভাষার দক্ষ ব্যবহার, তীব্রবোধগ্রস্ত চিত্রকল্প, ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রবল প্রকাশ, বিপুল অনিশ্চয়তা এবং তার চেয়েও বেশি বিপুল ভালবাসার অনুসন্ধান- এসব মিলিয়েই এক সৃষ্টিশীলতা থেমে গেলো মাঝপথে। ‘এই একটু আসছি’ বলে কোথায় যে গেল? যারা তাকে ভালবাসতো, কাছ থেকে দেখেছে তারা আবার বুক ভরে অক্সিজেন নিক, যেন তারা হারিয়ে যাওয়া মানুষটার মনের আলোয় পথ চলতে পারে।

শান্ত জলের কোমলতা আর গভীরতা নিয়ে কবি বিদায় নিয়েছে। জীবনকে সাহস আর সততার সাথে ভোগ করতে চেয়েছে। সবসময় মানুষের মাঝেই ছিল। কত বৈচিত্র্যময় সেসসব সম্পর্ক! কিন্তু আসলে কবি ছিল নিভৃতে নিজের মত একাকী। ভালবাসার সৈনিক নিজেকে প্রকাশ করেছেন সব প্রিয়জনের কাছে উচ্চকিত আড়ম্বর ছাড়াই। আমরা যারা কাছ থেকে দেখেছি বহুদিন তাদের মাঝে থাকবে শাকিল, যেন আকাশজুড়ে চাঁদের আলো রূপার জলে আঁকা