১৯৭১

‘একাত্তরের রণাঙ্গন অকাথত কিছু কথা’ বইটি লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক নজরুল ইসলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় জেষ্ঠ্য রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন।

নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রলালয়ের অধীন মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক বা প্রধান সেনাপতি কর্ণেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম.এ.জি ওসমানীর দফতরে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। এই সুবাদে তিনি ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখেন। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে পরে তিনি এই বইটি লিখতে শুরু করেন।  বইতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকাল, পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক বিন্যাস এবং ব্যক্তিগত বহু স্মৃতি সংযোজিত করেন।

অনুপম প্রকাশনী কর্তিৃক প্রকাশিত এই বইতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সেইসব কাহিনির কিছু অংশ প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে পুনঃমুদ্রন করা হলো। (প্রাবাস)  

nazrul_1971

১৯৭১ সালের মে মাস। হয়তো মাসের মাঝামাঝি সময় ছিল তখন।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় আমার কর্মস্থল দৈনিক ইত্তেফাক ভবনের উপর দখলদার বাহিনীর ট্যাংকের গোলাবর্ষণে ভবনের কিছু অংশ বিদ্ধস্ত হয়েছিল। সারাদেশ তখন তছনছ, উৎক্ষিপ্ত সকল মানুষ। এমনি একটি পরিস্থিতিতে বৃদ্ধা মা, আমার স্ত্রী এবং মাত্র উনচল্লিশ দিন বয়সের শিশুপুত্রসন্তানকে নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করছিলাম। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতের বিভীষিকাময় স্মৃতি নিরন্তর আমাকে পীড়িত করে তুলতো। এক গভীর বেদনা, উৎকন্ঠা আর আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম।

গ্রামের লোকজন আমাকে ঘিরে ধরতো। চাপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করতো খবর কী? জানতে চাইতো কোন প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে কি না।1971_n

১০ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মুজিবনগরে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সরকারকে বলা হতো স্বাধীন বাংলার সরকার-আমাদের সরকার। এলাকার পাকিস্তানপন্থী লোকেদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ছিল প্রচন্ড আস্থাহীনতা। এদের সম্পর্কে সবাই নিজ নিজ কৌশল অনুযায়ী সতর্ক থাকতো, এদেরকে যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতো, এদের সামনে তেমন কোন কথা বলতো না। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলতো, এরা পাক বাহিনীর দালাল, রাজাকার।

এমনি এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে একদিন সন্ধ্যায় গিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির হন শ্রীপুরের রহমত আলী। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আমদের একজন অতি বিশ্বস্ত রাজনৈতিক কর্মী। তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ছাত্রজীবন থেকেই ছায়ার মতো লেগে থাকতেন। সেই রহমত আলী মুজিবনগর বাকেলকাতা থেকে অধিকৃত বাংলাদেশে প্রবেশ করেঢাকায় খোঁজ নিয়ে পায়ে হেঁটে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির!তার কাছে আমার বাড়িরর ঠিকানাও ছিল না। বাড়িতে তিনি আমার সঙ্গে কুশল বিনিময় ছাড়া অন্য কোন কথা বলেননি। পরদিন চলে যাওয়ার সময় বাজারে যাওয়ার পথে এক বড় পুকুরের পাড়ে আমাকে নিয়ে বসে একান্তে বললেন এতোদূর থেকে এই ভয়াবহ বিপদের মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসার কারণ। বললেন, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব পাঠিয়েছেন তাকে ইত্তেফাকের সিরাজউদ্দীন হোসেন, সৈয়দ শাহজাহান ও আমাকে মুজিবনগরে নিয়ে যাবার জন্য। যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রচার কাজের জন্য আমাদের একান্ত প্রয়োজন।তিনি আমাকে ঢাকায় গিয়ে বাকী দুজনকে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব আগরতলায় যেতে বললেন। সেখান থেকে আমাদের মুজিবনগরে নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

এই কথা পৌঁছে দিয়ে রহমত আলী সাহেব মিলিয়ে গেলেন সন্ধ্যার অন্ধকারে।

স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে মনের দিক থেকে আনন্দ ও গর্ববোধ থাকলেও ভাবনার অন্ত ছিল না। ওই একই চিন্তার কালো মেঘ মনের আনন্দ-আকাশকে অজানা আশংকায় আচ্ছন্ন করে দেয়। স্ত্রী, একমাত্র পুত্র এবং বিধবা মায়ের কী হবে?(চলবে)