মনেপড়ে ( শেষ অংশ)

শামীম আজাদ

শামীম আজাদ

বিচিত্রায় কাজ করেছি ১৯৭৮ সাল থেকে। আমি থাকতাম ধানমন্ডির ২২টি নারকেল গাছ হুহু করা আব্দুল হাই স্যারের ভাড়া বাড়িতে। রাতে স্যারের হাতে লাগানো বিলেতি সাদা গোলাপ হাজার হয়ে হাসতো। লনে ফেলে রাখা দূরন্ত সজীবের সাইকেলের দিকে তাকিয়ে, নবছরের কন্যা ঈশিতার সুকুমার মুখের দিকে নিশ্বাস ফেলে, মৃদু নাক ডাকা সুখি স্বামীর দিকে তাকিয়ে আমার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে যেতো। ভাবতাম আমার ভাইটি বেঁচে আছে কি? সে কি ফিরে গিয়ে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে। কলেজ পাশ দিয়েছে? সে কি ব্যবসা করে না চাকুরী? তার নিজের বোন ভাইরা তাকে কি আদৌ তাকে ফেরত পেয়েছে। তার মা কি বুলবুলের টোল খাওয়া গালটায় আদর করেছে?
একে ঠিক খোঁজা বলে না। কারণ কাউকে খুঁজতে হলে তার গ্রামের নাম জানতে হয়। তার বাবা ভাই কারো নাম করতে হয়, তার বিদ্যায়তনের কথা জানতে হয়। আমি তার কিছুই জানতাম না। বুলবুল যে আমাদের বসায় রসদ রেখে ঢাকার গেরিলা অপারেশন চালিয়েছিল সেটাও আমি না হয়ে আরেকজন যে কেউ হতে পারতো। সে দুই নম্বর সেক্টরের গেরিলা। ঢাকায় তার কাজের কাছাকাছি কোন নির্ভরযোগ্য স্থান চাই। তখন আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি যে তার সহযোদ্ধা তিনিই আমার ঠিকানাটা দেন।

সিঁড়ি দিয়ে আমাদের সোবানবাগের দোতলার ফ্ল্যাটের সামনে উঠে দাঁড়ালে দুটো দরোজা। একটা সোজা ড্রইং রুমের। অন্যটা সারা বাড়ির। একটা দূসর সিমেন্টেড ফ্লোর আর সাদা দেয়ালের প্যাসেজ চলে এসেছে ডাইনিং স্পেস পর্যন্ত। ওটা কোন রুম না। একটা দেয়াল লাল ঝাঁজরী কাটা। ফুটো গুলোদিয়ে দেখা যায় পেছনের সব। বাঁয়ে হলদে চুনকাম করা রান্না ঘর। আব্বা এ জানালারই শিক বাঁকিয়ে রেখেছেন। আমাদের দুবোনকে বলেছেন বাড়িতে রাজাকার বা আর্মি ঢুকলেই যেন আমরা এদিক দিয়ে লাফিয়ে পড়ে বাঁচার চেষ্টা করি। আমরা এ দরোজাই ব্যবহার করি।
আমাদের দরোজায় কোন বেল নেই। দীর্ঘদিন কড়া নাড়তে নাড়তে কড়ার আংটার নিচে একটা ফুটো হয়ে আছে। তা দিয়ে মানুষের মুখ দেখা যায় না জামা দেখা যায়। কেউ কড়া নাড়লে সেই ফুটো দিয়ে আগে চেক করতাম জামাটা খাঁকি কিনা। কিন্তু রাজাকার বোঝার কোন উপায় নেই!dec_3_bishobangla

সেদিন সন্ধ্যা এমন ঘন ছিল যে মিরপুর সড়ক মাড়িয়ে যাওয়া পাকিস্তানী ট্রাকগুলোও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। আব্বা আম্মা তাদের ঘরে নরম স্বরে কথা বলছেন। সবাই ঘুমে।আমাদের ঘরে শোয়েব স্বাধীন বাংলা শুনছে। আমি এটো বাসন ধুয়ে অবশিষ্ট খাবার তুলে রাখছি তারের জালি দেয়া মিটসেফে, রান্নাঘরে। তখনই কড়াতে মৃদু টংকার। বড় আলাদা শব্দ। এত মৃদু যে আমি ছাড়া আর কেউ শুনছে না। ফুটো দিয়ে দেখি চেক চেক মলিন এক জামা।শামীম আপা দরজা খুলেন। নাম বললো না।

এত অল্প বয়সের ছেলেরাও যুদ্ধে এসেছে ওকে না দেখলে জানতে পারতাম না। সে পরিচয় দিয়েই আমাদের সেই প্যাসেজের বাঁয়ে ভৃত্যদের টয়লেটের সামনে যেখানটা অন্ধকার এবং কিছু হাবিজাবি রাখা সেখানেই তার পিঠের ব্যাগটা রেখে নিজেই পর্দাটা টেনে দিলো। আমি তাকে মুখ ধোবার জায়গাটা দেখিয়ে একটু বিব্রত ভাবেই প্রচুর ভাত আর তার সঙ্গে কোনক্রমে মেখে খাবার মত মিষ্টি কুমড়ার লাবড়া দিলাম। ডাইনিং স্পেসে আলো জ্বালানো নিষেধ। যখন তখন বিপদ হতে পারে। প্যাসেজের অল্প আলোতেই সে খুব দ্রুত খবর দেয়া ও খাবার খাওয়া শেষ করে গালে টোল ফেলে হেসে বল্ল, আপা মজা হইসে।

আব্বা আম্মা ততদিনে ব্যাপারটা আঁচ করে নিয়েছেন। কিন্তু সরাসরি কিছু বলছেন না। সে যেমন অন্ধকারে এসেছিলো তেমন অন্ধকারেই চলে গেল। সে চলে গেলে আমি সেই সোনা রঙ কিশোরের এঁটো বাসন হাতে রান্না ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি। পেছনের গেট নিরাপদে পেরিয়ে গেল কিনা। ভাবি কে তুমি কিশোর? কোথায় তোমার বাবা মা? কতদিন স্নান করোনি। এভাবে পেট ভরে ভাত খাওনি! তোমার কি নিজের কোন বোন আছে? আমরা একতা যুদ্ধে আছি। এসব এখন অবান্তর কথা। সেই ছিলো বুলবুলের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষ্যাৎ। তারপর কোন কাজে এলেই আমাকে এক ঝলক দেখেই যেতো। আমাকে কিছু খবর পাচার করতে বলতো। কিছু নিয়ে যেতো।

omipialblog_1252830415_5-bশেষ দিনের কথা মনে আছে। বাইরে কেবল গুলি আর গুলি ফুটছে। আমরা স্বাধীন হয়ে যাচ্ছি। সাদা প্লেন এসে এয়ার পোর্ট থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সব বিদেশী নাগরিক। ১৩ ডিসেম্বর এক ধরনের মাইক্রোবাস কেবলই এদিক থেকে সেদিকে যাচ্ছে। কালো কাঁচ কিচ্ছু দেখা যায় না। চলে যাচ্ছে আমাদের কাছেই মিরপুরের দিকে। এবং এখনই যেকোন মুহুর্তে স্ট্রিট ফাইট শুরু হয়ে যতে পারে। ঐ লরো ভরা সৈন্যরা বুঝি এসে গেল। আমারিকার সপ্তম নৌবহর শুধু ঈশারার অপেক্ষায়। ১৪ তারিখে হঠাৎ দমকা কুন্ডের মত বুলবুল এসে বললো, আপা অবস্থা ভাল না। কিছু একতা ওরা করতেসে। আপা আর দেখা নাও হতে পারে। আমি তড়তড়িয়ে গেলাম সিঁড়ি পর্যন্ত।মাথায় আদর করে দিলাম।

এলো ১৬ ডিসেম্বর। গুলি আর গুলি আকাশে বাতাসে। ওরা আনন্দে গুলি ছুড়ছে। এবার জোরে কড়া নাড়ার শব্দ। এবার মাথায় গামছা হাতে উমুক্ত স্ট্যানগান। ঘরে ঢুকেই এক চিৎকার … আপা আমরা স্বাধীন! পাশে আম্মা আব্বা। কিন্তু তাদের দিকে একবার চেয়েই নিচু হয়ে আমার পায়ে ধরে সালাম। আমি হতভম্ব। এর আগে কেউ কোনদিন আমার মত এত ছোট তরুনীকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেনি। কিন্তু আমরা কে কি বলছি তার কোন দিশা নাই। সে হড়বড় করে অনেক কিছু বলে না খেয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।

তারপর কত কুসুম ফুটেছে মরেও গেছে। কিন্তু বুলবুলই আমার শিক্ষকদের শবদেহ দেখে এসেছিলো। আমারো নামের সাথে কত পরিবর্তন হয়েছে। একদিন আমিও চলে আসি পূর্বাচল ছাড়িয়ে। শিশু সন্তান দুটো বড় হয়। ঊনিশ বছরের বছরের ঢাকাই শাড়ি পরা পিঠ ছাপানো চুলের গোছা সরু হতে থাকে। গায়ে গায়ে ওজন বসে। ছেলেমেয়েরা যে যার মত ভাল থাকে আর আমি থাকি আজাদকে নিয়ে কি এক মহা পূর্ণতা নিয়ে সময় পাড় করতে থাকি। ঢাকার কাগজগুলোতে নিয়মিত লিখি। ভোরের কাগজে ‘বিলেতের কথা’ নামে লিখি কলাম। আর নিচে ছাপা হয় আমার শেঁতুলী এ্যাট ইয়ায়াহু ডট্ কম নামে পাঠোক রেস্পন্স পাবার জন্য এক ইমেল এ্যাড্রেস ছাপা হয়। সেখানে নানান পাঠক তাদের প্রতিক্রিয়া লেখন আমিও উত্তর দেই। ততদিনে ফেইসবুক ও হয়ে গেছে।1971_dec_3ef
প্রতি ডিসেম্বরেই আমি স্মৃতি কাতর হয়ে যাই। আমার শিক্ষকদের হারানোর ক্ষত এখনো তাজা। ডিসেম্বর এলে বিলেতের চারিদিক ঝলঝল করে, কত তুষার পড়ে। কত ডিসেম্বর আসে আবার যায় কিন্তু কেউ আমার অনুজপ্রতিম বুলবুলের কথা জানে না। কে জানবে তাও জানিনা।
একদিন ইমেল পেলাম জনৈক কবীর খান যুক্তরাষ্ট্র থেকে জানতে চাইলেন আমি কোনদিন শামীম তরফদার এমন নামে লিখতাম কিনা! আমার বুকের দুয়ার ভেঙে দরিয়া এসে গেল। আহা কে আমারে আমার নাম ধরে ডাকে। আমার সেই নাম। আমার বিবাহের আগের নাম! তারপরেও কদিন গেল বুলবুলের শালিকা সাঁতীর স্বামী কবিরের মধ্যস্থতায়। ওরা আমাকে খুঁজে নিয়েছে বুলবুলের কাছ থেকে আমার লেখক পরিচিতির সূত্রে। সে নাকি যেকোন মানুষ লিখছে বা লেখক বা কবি পেলেই আমাকে আমার হারানো নামেই খুঁজতো। আমার সেই সহপাঠি বেঁচে নেই। অত ছোট বয়সে যুদ্ধের বিভিষিকা ও যুদ্ধের পর কিছু মানুষের অবিশ্বাস্য স্বার্থপরতা তাকে এতটাই বিচলিত করে যে প্রায় অপ্রকিতিস্থ হবার দশায় দেশ ত্যাগ করে।

তারপর থেকে কারো কাছে যুদ্ধ নিয়ে কিছু বলে না। দেহে বয়সের দাগ ও অসুখ এবং ভারী মন নিয়ে থাকে নিজের মধ্যে। বিশাল আমেরিকায় অন্য কোন স্টেটে সাগরের পাড়ে। তার এখন উপল নামে নির্ভযোগ্য এক যুবক পুত্র আছে। আছে মিষ্টি কুর্মজীবি স্ত্রী। সাঁতী তারই বোন। কবীর ইন্টারনেট ছেনে আমাকে বের করে উপলকে বলেছে। বুলবুল এসব নেটফেট কিছু বোঝে না। ফেসবুক তার নেই। সে বোঝে টেলিফোন। কিন্তু যখন আমাদের যোগাযোগ হল আমরা এত কাঁদলাম এত কাঁদলাম। অনেকটা অস্বাভাবিক কান্নার মত। ওদিকে উপল ও তার মা অবাক। আঢ় আটলান্টিকের এপাড়ে আমিও। আমরা সুস্থির হয়ে পরে অনেক কথা বলেছি। সে তক্ষুনি আমাকে তার কাছে যাবার জন্য টিকিট কেনে এমন! সেই আগের মতই পাগল!

কিন্তু কেন এত কেঁদেছিলাম! একচল্লিশ বছরের হারানো ভাইকে ফেরত পেয়েতো হো হো করে হাসার কথা। আজ এত দিন পর মনে হচ্ছে, আমরা দুভাইবোন দুজনকে ফিরে পেয়ে এতদিনের না দেখার কারণেও কাঁদিনি। আমরা হতভাগ্য দেশের জন্য কেঁদেছিলাম। যে দেশ তছ্‌নছ্ করে সেই কীটেরা আবার কামড় বসিয়েছে। আমাদের যৌবনের হাড়ে এখন শুধু সময়ের বেদনা। কিছু করার ক্ষমতা নেই। তাই আমরা কেঁদেছিলাম।

ছবি: সংগৃহিত