যেভাবে বিজয় চিনে নিলাম

আঞ্জুমান রোজী/rozy

আঞ্জুমান রোজী

বিজয় দিবস কীভাবে প্রথম দেখেছিলাম তা ভাবতে গিয়ে স্মৃতি হাতড়িয়ে-হাতড়িয়ে বের করে আনতে হলো। মুক্তিযুদ্ধের দামামা আমি দেখিনি। বাবা-মা আর লোকমুখে শুনে এবং পত্রপত্রিকা ও বই পড়ে জেনে এসেছি আমাদের বিজয়গাথা। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে থাকাকালীন আমরা গৃহবন্দী ছিলাম। আমার বাবা পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ছিলেন। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল বাইরের কোনো কাজের জন্য আর বাবাকে অফিসে হাজিরা দেওয়ার জন্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাবাদের উপর কড়া নজরদারী ছিলো। একরকম বন্দী করেই এক শহর থেকে আরেক শহরে নিয়ে যাওয়া হতো। নিতান্ত ছোট ছিলাম বলে কোনো কিছুই তেমন মনে নেই। দেশে ফিরে আসার পর আমার বাবা-মা’র কাছ থেকে যুদ্ধ নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। আমার মনে হয় এখনকার বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদের  সঙ্গে ভাবে এই দেশ অর্জনের কথা বলেন না। বললে দেশটা এভাবে অন্ধকারযুগে ফিরে যেতো না!

আমরা স্বপরিবারে দেশে ফিরে আসি ১৯৭৪ এর নভেম্বরে। দেশে ফিরে আসার পর বাংলাদেশ আমার কাছে নতুন এক আবহে ধরা দিলো। এটাই আমার দেশ, এই কথাটা বারবার বাবা আমাদের বলছিলেন। নিজের দেশ নিজের ঘরের মতো, একে নিজের মতো করে ভালবাসতে হয়। আমার মা’কে বাবা প্রায়ই বলতেন, ‘যে দেশে আমার মা থাকেন সে দেশ ছেড়ে আমি পৃথিবীর কোথাও থাকবো না।’ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানে থাকাকালীন বাবা মায়ের অস্থিরতার কথা সব সময় কোনা না কোন অজুহাতে তুলে আনতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানকে বন্দী করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার বাবা মা প্রায়ই রোজা রাখতেন। এমন কী, গৃহবন্দী থাকা অবস্থাতেও পাশাপাশি কয়েকটা ফ্যামিলি মিলে শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য দোয়া করতেন। যেদিন পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে সেদিন মহল্লারco মধ্যে কেউকেউ সেমাই শিন্নি রান্না করে গোপনে-গোপনে একে অপরের ঘরে গিয়ে মিষ্টিমুখ করিয়ে আসেন। বাইরে প্রহরারত পুলিশকে বলতে হয়েছিলো, ‘আমার ছেলে কোরাণ খতম করেছে, তাই আমার বন্ধুদের মিষ্টি দিতে যাচ্ছি।’ আবার কেউ বলেছে, ‘ আমার ছেলে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছে তাই মিষ্টি দিতে যাচ্ছি’কিম্বা ‘আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী’; এমন নানান বাহানায় এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কাছে গিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খুব গোপনে বিজয় আনন্দ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় অর্জনের পর থেকেই বাবা-মা অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন, কবে দেশে ফিরবেন! ইতোমধ্যে আমার ছোটচাচা, যিনি করাচী ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন, সেই চাচা কাউকে না জানিয়ে দেশের দিকে গোপন পথে যাত্রা করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর আরও কড়াপ্রহরায় সব বাঙালি অফিসার ও সৈ্ন্যদের উপর নজরে রাখা হলো। এরিমধ্যে জুনিয়র অফিসার দুজন পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়ায় পাকিস্তানীদের বেদম প্রহারে মৃত্যুববণ করেন। সেইসময় তাদের জানাজায় বাঙালি অফিসার সবাই চোখের জলে বুকভাসিয়ে একত্রিত হন। ১৯৭৪ সনে দেশে ফেরার সময় সব বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের রাওয়ালপিন্ডি  থেকে ট্রেনে করে ইরানের বর্ডার চশমা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পথিমধ্যে চলন্ত ট্রেন থেকে আরেক ইয়াং অফিসার লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে, তাকেও ধরে ট্রেনে বেদম প্রহার করে। পরে in_dec3_rচশমা ক্যাম্পে আরো পৈশাচিক নির্যাতন করে তাকে হত্যা করে। ইয়াং অফিসারের উপর নির্মম  অত্যাচারের লোমহর্ষক কাহিনী শুনতাম আমার মায়ের কাছে। রাতে তার মা-মা চিৎকারে কেউ ঘুমাতে পারতো না। এমন অনেক লোমহর্ষক ঘটনার মধ্যদিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা দেশে ফিরে আসি। দেশে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার ছোটচাচা আমাদের দেখতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কেঁদে ফেলেন। এই দৃশ্যটা এখনও আমার ভীষণভাবে মনে আছে। তারপর চাচা আমাকে কোলে তুলে নিয়ে আম্মার কাছে আসেন। তখন সবার চোখে জল আর পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিলো।

দেশে ফিরেই আমরা দুমাস গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। একবার নানাবাড়ি তো আরেকবার দাদাবাড়িতে। সে ছিলো এক আনন্দঘন সময়!  সবার আদরে আহ্লাদে সময় কাটিয়েছি। সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, জ্বালাও পোড়াও এর ক্ষতচিহ্ন এদিকসেদিক ছড়িয়েছিটিয়ে ছিলো যত্রতত্র। হাজারও ভাঙ্গা বাড়িঘর। রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত। আমরা অনেকে অর্থাৎ আমার বয়সী কাজিনদের সাথে করে সেই ধ্বংসস্তূপের ভিতর দিয়ে হেঁটে বেড়াতাম। তখনও বুঝিনি এটা যে যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থা! আসলে তখনও বুঝিনি, যুদ্ধ কী! সবাই বলতো, যুদ্ধ হয়েছিলো। পাকিস্তানীরা অনেক মানুষ মেরে ফেলেছে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দ জানলাম, জানলাম মুক্তিযোদ্ধাদের কথা এবং তাঁদের পরিচয়।  আমার নানাবাড়ি রাজাকার’রা পুড়িয়ে দিয়েছিল। বিল্ডিং, এমনকী টিনের ঘরগুলোতে তখনও আগুনের পোড়া দাগ ছিলো।  সবার মুখে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো ঘুরছে। কিছু বুঝি, কিছু বুঝিনা! এমনি একসকালে নানাবাড়িতে আছি, দেখি গ্রামের মেঠোপথ ধরে শতশত মানুষ বিভিন্ন রঙের প্ল্যাকার্ড হাতে, জয়বাঙলা শ্লোগানে মুখরিত এক মিছিল নিয়ে এগিয়ে  যাচ্ছিলো। আমি কিছু বুঝেওঠার আগেই আরও অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে বাড়ির বাইরে চলে এলাম। সমস্বরে এতো মানুষের কণ্ঠে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিলো। সেইসাথে আমিও প্রকম্পিত হচ্ছিলাম অজানা এক আনন্দে! আমি যেন জয়বাঙলার সুরের জাদুতে আটকা পড়ে গেলাম। তারপর হতে জয় বাঙলা এবং বাংলাদেশ আমার কাছে একই সূত্রে গাঁথা হয়ে গেলো। সেদিন ডিসেম্বর মাসে বিজয়ের এমন আত্মপ্রকাশে আমি বাংলাদেশকে চিনে নিলাম নতুন করে। হ্যাঁ আমার বাংলাদেশ, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অঙ্গীকার। জয় বাঙলা!!

ছবি: সংগৃহিত