ভালোবাসার শহর- ৩

শারমিন শামস্

শারমিন শামস্

রাজশাহী একটা ঘ্রাণের নাম ।রাজশাহী বললেই একটা সোদা সোদা গন্ধ পাই ।কেমন পুরোনো গন্ধ পাই! একটু ঝাঁঝালো, একটু টকটক, একটু মনকেমন কেমন করা, একটু আনমনা । রাজশাহী ভাবলেই ধুধু করে বালুরচরের মত ধূসরিমা ।বরেন্দ্র জাদুঘরের গা ঘেষে উদাস উদাস পথ।  আমার ছুটি ছিলনারে, কিন্তু শৈশব ছিল! আমি রোজ বিকেলে ফুল ফুল ফ্রক পরে গায়ে মুখে পাউডার দিয়ে খেলতে যেতাম । একটা তুলতুলে লাল চটি ছিল। মনে আছে খুব। এমনকি ওই চটির তুলতুলে আরামটাও! বিকেলে সঙ্গী-সাথীদের ভালো লাগতো না সবদিন। তখন হাঁটতে হাঁটতে সাগরপাড়া, মালোপাড়া নাকি সব কোথায় কোথায় আমি চলে গিয়েছি। একটা কচুরিপানা ভরা পুকুরের পাশে বেগুনি ফুলেদের দেখতে গিয়েছি। তারপর কোন এক বাচ্চা কুকুর গা ঘেষে পাশে বসে ছিল আমার। আমি ওকে বিস্কিট দেব বলে কত তোষামোদ করে বাড়িতে এনেছি। এখন আম্মা বলছে, বিস্কিট তো দেবেই না, আমাকে পিটিয়ে নাকি তক্তা বানাবে! এটা ক্যামন আম্মা!

রাজশাহী

রাজশাহী

আমি মন খারাপ করে বসে থাকি বারান্দায়। আম্মা বিস্কিট এনে কুকুরটাকে ছুড়ে দিচ্ছে দোতলা থেকে। আমার আর নিচে যাওয়া মানা। বোকা কুকুরটা জিভ বের করে হাসছে ক্যামন দেখো! পাশের বাসায় টুনি এসেছে। টুনি মানে লোপা । এইসব দিনরাত্রির টুনি, ওর নানুবাড়ি আমাদের বাসার পাশে। সেই টুনি তো মরে গেছে।, কত কত বছর পর লোপাও মরে গেছে নিজে নিজে! এইসব রাজশাহীর স্মৃতি। রাজশাহী একটা শহর। একটা বিশাল শহরের ছায়া ছায়া পথঘাট, মন খারাপ করা সন্ধ্যা, বাটার মোড়ের জিলাপি, নিউমার্কেটের বইয়ের দোকান, সাহেব বাজারের ইন্ডিয়ান কাপড়ের স্তুপ, রাশি রাশি পুরোনো দালান বাড়ি, পিএন স্কুল- আমি কোথায় পাবো তারে?

রাজশাহী

রাজশাহী

কোন এক মন ভোতা বিষন্ন দিনে যশোর থেকে একটা গাড়িতে চেপে রাজশাহী পৌছেছি আমরা। আমার মন হু হু। যশোরের স্কুল আর একমাত্র বন্ধুর শোকে। ওকে শেষ উপহার দিয়ে এসেছি। বই- বইয়ের নাম সোহরাব রুস্তম। আর সে আমাকে দিয়েছে গোপাল ভাঁড়। আমরা পড়তাম সেক্রেট হার্ট জুনিয়র হাইস্কুলের কেজি ক্লাসে। মিশনারি স্কুল। গাউন টুপি আর লম্বা চেনওয়ালা ক্রুশ লকেট পরা নানরা আদর আদর করে কথা বলেন। সেটাই আমার প্রথম স্কুল। যশোরের আর এন রোডের বাসা থেকে আমরা তখন কাজিপাড়ার বাসায় উঠেছি। দিনরাত তবু ওই আরএন রোডের বাসার কথাই ভাবি। সামনে বড় মাঠ তারপরে গেট। মানে বাসার নিজস্ব মাঠ আর কি। এমন হয় আর? সেই মাঠে দাপাদাপি করি। জামরুল গাছে উঠি। লাউয়ের মাচার নিচে লুকাই বাসায় টিকা দেবার লোক এলে। কত কাণ্ড। বয়স মাত্র পাঁচ। আম্মা স্কুলে দেবেই। তাই ভর্তি হয়েছি। এদিকে গল্পের বই পড়ি। বইয়ের নাম বিড়াল ছানার বড়াই। প্রথম লাই: ‘নিউ নিউ ছবি আঁকতে ভালোবাসে’। আম্মা বইয়ের উপর লিখে দিয়েছে- তুমি অ আ ক খ লিখতে শিখেছো বলে/ এই বইটি তোমার হাতের দিলেন আমি তুলে/ অনেক অনেক আশীষ আর ভালোবাসা/ জড়িয়ে দিলেম পাতার ভাঁজে ভাঁজে’।

ভৈরব নদ যশোর

ভৈরব নদ যশোর

কাজিপাড়ার বাসা থেকে আমি স্কুলে যাই। দুই আপু যায় মোমেন গার্লস স্কুলে। মেজো আপু যায় দাউদ ক্যান্ট পাবলিকে। জটিল অবস্থা। এর মধ্যে আব্বার বদলি অর্ডার এলো রাজশাহীতে। তার আগে দু’মাসের ট্রেনিংয়ে আব্বা চলে গেল ঢাকায়। বাসায় আমরা চার বোন আর আম্মা।

যশোরের রাস্তা, পথঘাট, গলি ঘুপচি কিছুই মনে নেই। মনে আছে শুধু সেই স্কুলবাড়িটা। হয়তো মাঠটা এতো বিশাল ছিল না। তবু সেই ছেলেবেলার কালে, বছর পাঁচের বয়সের চোখে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাঠ। আজো চোখ বুজলে সেই তেপান্তরের মাঠখানা দেখতে পাই!