মটরসাইকেল ডায়রী…৪

সুব্রত গোস্বামী

সুব্রত গোস্বামী

জঙ্গলের বুক চিরে এগিয়ে চলেছি আমরা। ছোটকেয়ির পথে। জঙ্গল কেটে তৈরি রাস্তা। বৃক্ষনিধন, জঙ্গলসাফ, ডি-ফরেস্টেশন এই সব শব্দেরা মনে ভীড় জমাচ্ছে। দিনদিন মানুষ বেড়ে যাচ্ছে, জঙ্গল কমে যাচ্ছে, আমরা কেন এসেছি এখানে? এখানে এসে পৃথিবীর কী উপকার করছি? নিজেদের চোখের, মনের আরাম খুঁজতে এসে ইঞ্জিনের শব্দে স্বার্থপর জহ্লাদের মত পাখির ঘুম ভাঙাচ্ছি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ভেতরটায় খোঁচা মারছে। “এসব অনেক জটিল তত্ত্ব” এরকম একটা প্রবোধ দিয়ে নিজেকে নিজের এই আপাত-দার্শনিকতা থেকে মুক্তি দিলাম।

আমার বাইকের চাকার মাড-গার্ডটায় কাঙ্গেরভ্যালির এবডোখেবডো পথে চিড় ধরেছিল। ফুলবনি আসার পথে চির টেপ লাগিয়ে, খুলে পড়ে যাবেনার মত একটা জায়গায় এনে দিল। এরকম নুডির রাস্তা দিয়ে আর ছ’কিলোমিটার গেলেই রিসর্ট।

গোপীবল্লভপুর

গোপীবল্লভপুর

দৃশ্যাবলি চাকা থামিয়ে দিলেও মনে একটা ভাবনা বেশ চেগে বসেছে। আসার পথে আগেও দেখালাম এখানেও দেখছি, টাইগার রিজার্ভের ভেতর একএকটা জনপদ। জঙ্গল কেটে তৈরি করা বনবস্তি। কিছুটা এগিয়ে দেখলাম একপাল গরু ছাগল চড়িয়ে ফিরছেন একজন। মনে প্রশ্ন জাগে বইকি, এমন কোন দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার এখানে থাকেন যাঁর ভয়ে এ জঙ্গলে বাঘে গরুতে সহাবস্থান করে। আসলে কোন জঙ্গলে কটা বাঘ এটা একটা সরকারি হিসেব মাত্র। ন্যাশনাল পার্ক থেকে টাইগার রিজার্ভে উত্তরণের ধাপ।

এই পথটুকু ওঠার সময় বাইক চালাতে চালাতে ঠিক করে ছবি তোলা যাচ্ছিলনা। রিসর্টে পৌঁছে রানাদার বাইকে চেপে আরেকবার এলাম। এই ছবিটা জরুরী বটে।

ভারী মনোরম জায়গা। স্তরে স্তরে স্নিগ্ধতা সাজিয়ে রাখা। যেন আপনার মন ভরাবে বলেই জন্ম নিয়েছে। আমরা পৌঁছনোর খানিক পরেই সূর্য পাটে যাবার প্রস্তুতি শুরু করে দিল। আমরা যে যার পছন্দে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এভাবেই সন্ধে নামল, রাত হল, ভোর হল।

গোপীবল্লভপুর

গোপীবল্লভপুর

আজ ভোর ছটায় বেরিয়ে পড়া নেই। কিন্তু এই কদিনের অভ্যেস সবাইকে আজও ঘুম ভাঙিয়ে দিল। এমনকি চিরকেও।

এবস্তুটি ছিল বলে চলার পথের তেজপাতা আদা এলাচ দেওয়া রান্না করা চাগুলো খেয়ে ততটা ক্রুদ্ধ হইনি কেউ, ঠিক যতটা হওয়ার ছিল। গোটা ট্রিপে যখনই সময় সুযোগ পাওয়া গেছে তখনই আমরা পছন্দের চা বানিয়ে খেয়েছি। হোটেলগুলোতে যতক্ষণ থেকেছি আমরা নিজেরাই চা বানিয়ে খেয়েছি।

ছোটকেয়ির এই রিসর্টে কটেজগুলো বেশ চমৎকার। দুজন মানুষের জন্য বরাদ্দ বেশ উঁচু বিশাল একখানা ঘর। জংলা বারান্দাটা অন্য হোটেলের শোবার ঘরের থেকেও বড়। একজন মানুষ শুধুমাত্র নিজের জন্যই কতটা ফাঁকা জায়গা উপভোগ করতে পারেন। এই নির্জনতা এতটাই উপভোগ করছিলাম যে, তিনদিন পরই হর্ণ, অফিস, জ্যাম, ধুলো এসব ভেবে আমার মত গৃহমেদুর মানুষও ভয় পেতে শুরু করল।

ছোটকেয়ির গ্রামটা

ছোটকেয়ির গ্রামটা

কাল রাতে এই ডাইনিং-এ বসেই রিসর্টের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ছিলাম আমরা। স্ব-নির্ভর গোষ্ঠী। এঁদের প্রত্যেককে হোটেল ম্যানেজমেণ্টের একটা বেসিক ট্রেনিং নিতে হয়েছে। তবে কেউ মাসমাইনে পাননা। ভাড়া থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ এঁরা পান রিসর্ট চালানোর জন্য। অনুগুলের অফিস থেকে বোর্ডারদের ডিটেল মেসেজ করে দেওয়া হয়। গোটা গ্রামে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বিএসএনএলের নেটওয়ার্ক আছে। প্রতিদিন সকাল দশটার পর কোনো একজন মোবাইলটাকে নির্দিষ্ট সেই জায়গায় নিয়ে গিয়ে মেসেজ ধরে আনেন। আমরা যেহেতু দুপুরে বুক করার পর সেইদিনই রিসর্টে চলে এসেছিলাম, এঁদের কারো কাছে আমাদের আসার খবরই ছিলনা। খাবার জল, বাথরুমের সাবান তোয়ালে দেরি করে পেয়েছিলাম বলে খুব রাগ হয়েছিল। গতরাতে এঁদের যত্ন-আত্তিতে সব ভুলে গেছি।

বাংরিপোসি

বাংরিপোসি

আজ দিনের একটা অর্ধে টিকরপাড়া বেড়ানো আর অন্য অর্ধে ছোটকেয়ির পুরো গ্রামটা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করা হল। রিসর্ট থেকেই আমাদের একজন গাইড দেওয়া হল। আমি আজ রানাদার বাইকের পেছনেই চড়ে বসলাম।

বলে রাখি, খাতায় কলমে আমরা একটি জঙ্গলের ভেতরে রয়েছি। সাতকোশিয়া টাইগার রিজার্ভ। গালভরা নাম। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর জনপদগুলো দেখে নিজেদের ওপর বিদ্রুপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকেনা। মানুষ, আমরা এই প্রকৃতির উন্নততম জীব। ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ে দখল নিচ্ছি প্রকৃতির অন্য অংশের। প্রতিদিন। নির্দ্বিধায় ধ্বংস করছি অরন্য, মৃত্যু উপহার দিচ্ছি অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের। সত্যি বলতে আমরা মানুষেরা এমন কোনও কাজই প্রায় করি না যাতে পৃথিবীর সামান্য উপকারও হয়। জীবনযাত্রার দিনলিপি বিশ্লেষণ করলে হয়ত দেখাযাবে আমাদের ওঠাবসা চলাফেরা সবকিছুতে একটা পরোক্ষ ক্ষতি সাধন চলছে প্রকৃতির। বুঝতে পারলামনা এই টাইগার রিজার্ভের ভেতর আস্ত একখানা স্কুল কোন বাঘেদের পড়াশুনো করাবে?

টিকরপাড়া

টিকরপাড়া

হাতি কোথায় জল খেতে আসে, হাতির পায়ের ছাপ, কোন সময়ে আসলে জংলি জানোয়ার দেখা যাবে, এসব বলে গাইডটি আমাদের সান্তনা দেওয়ার একটা চেষ্টা করছিলেন। আসলে ওঁকে আমাদের জানানো হয়নি যে আমরা জঙ্গলে পশু দেখতে আসিনি। জঙ্গলের গন্ধ, ঝিঁঝিঁর ডাক, পাতার আওয়াজ আর হঠাৎ করে স্তব্ধতার শব্দ, আমাদের ওটুকুই যথেষ্ট। জঙ্গলের এই অংশটা আমাদের খুব একটা মন কাড়লনা। কিছুক্ষণ মহানদির চড়ে বসে থাকব সিদ্ধান্ত হল। অতয়েব টিকরপাড়া। না, টিকরপাড়া যাবার পথে আগেই একটা অপুর্ব জায়গা আছে বললেন আমাদের গাইড মিহির। সেখানে দুদণ্ড কাটিয়ে তারপর যাওয়া যাবে টিকরপাড়া।(চলবে)