১৯৭১

একাত্তরের রণাঙ্গন অকাথত কিছু কথা’ বইটি লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক নজরুল ইসলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় জেষ্ঠ্য রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন।

নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রলালয়ের অধীন মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক বা প্রধান সেনাপতি কর্ণেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম.এ.জি ওসমানীর দফতরে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। এই সুবাদে তিনি ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখেন। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে পরে তিনি এই বইটি লিখতে শুরু করেন।  বইতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকাল, পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক বিন্যাস এবং ব্যক্তিগত বহু স্মৃতি সংযোজিত করেন।

অনুপম প্রকাশনী কর্তিৃক প্রকাশিত এই বইতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সেইসব কাহিনির কিছু অংশ প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে পুনঃমুদ্রন করা হলো। (প্রাবাস)  

nazrul_1971একদিন রাতে আমি একা প্রধানমন্ত্রীর ঘরে গিয়েছিলাম। রাত ১২টা পার হওয়া সত্ত্বেও তিনি খাটের উপরে বসে সামনের টেবিলের উপর মাথা নুইয়ে ফাইল দেখছিলেন। খুব ভয়ে ভয়ে পা টিপেটিপে কাছে গিয়ে কোন কথা না বলে একটা খালি চেয়ারে বসলাম। তাজউদ্দীন সাহেব মাথা নুইয়েই বললেন, কে, নজরুল? কি মনে করে? কোন প্রবলেম?

বললাম, জ্বী না স্যার।

তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন লোকেরা কী বলে? কর্ণেল রিখীর অফিসে ঠিকমতো ট্রেনিংয়ে যাই কি না, ট্রেনিং কেমন লাগে, তারাই বা কী বলে ইত্যাদি। এসব কথার জবাব দেয়ার এক ফাঁকে আমি বললাম, ওরা বেলছে কেন আমরা আমাদের প্রধান সেনাপতিকে ভারতীয় সেনাধ্যক্ষের সমপর্যায়ে উন্নীত করছি না?

তারপর আপনি কী বললেন?-প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, এটা সরকারের ব্যাপার, আমি এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারি না।1971_dec_3

প্রধানমন্ত্রী বললেন, ছিকই বলেছেন। তবে আপনারও তোেএ সম্পর্কে কৌতুহল থাকতে পারে। শুনুন, ওসমানী সাহেব ভারতীয় সেনা প্রধানের মতো পরিপূর্ণ সামরিক ব্যক্তি নন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং জাতীয় পরিষদের একজন নির্বাচিত সদস্য। এসব বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। যাক, এসব কথা যেন আর কোথাও আলোচনা না করেন। তবে এটা নয় যে আমি চাই না তিনি জেনারেল পদে উন্নীত হোন। আগে দেশ স্বাধীন হোক।

এরপর এ প্রসঙ্গ ছেড়ে তিনি আমার সম্পর্কে কথা বলেন।বললেন, ওসমানী সাহেবের বক্তৃতা-ভাষণ ইংরেজী থেকে বাংলায় আপনার অনুবাদ দেখলাম। আপনি কমান্ডার ইন চীফ (সিএসসি)-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন সর্বাধিনায়ক। সিএসসির বাংলা তরজমা কিন্তু সর্বাধিনায়ক নয়-প্রধান সেনাপতি। আমাদের সরকার সামরিক নয়। সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সেনাপতি একই ব্যক্তি থাকেন। এ জন্যই তখন সেনাবাহিনী প্রধানকে সর্বাধিনায়ক বলা হয়।

আমি খুব লজ্জিত হলাম।

মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের সর্বাত্নক প্রস্তুতির খবর আমরা ব্যাপকভাবে প্রচার করি। যেন পাকিস্তানের বাহিনী তাদের ক্যাম্প ছেড়ে বাংলাদেশের ভেতরে যেতে না পারে।

বাংলাদেশের ভেতরে চলাচলের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর1971_dec3_1 কোন সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় হতাহত হলে কিংবা মাইন বিষ্ফোরণে তাদের যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে খবরও খুব ফলাও করে ছাপা হতো। যাতে পাকিস্তানীদের মনে ভীতির সঞ্চার হয়।

আমাদের গেরিলা যুদ্ধের সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ারের পরামর্শকরা আমাদের ব্রিফ করলেন, খবরের পরেও খবর আছে। সে খবর লেখ এবং প্রচারের ব্যবস্থা করো। এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়। খবর লিখে ডেসপ্যাচ তৈরী করো-হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা এখন আর ভয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে চায় না। ক্যাম্প ছেড়ে তারা মফস্বল এ্রলাকায়ও যেতে চাইছে না।

আমরাও তাই করলাম। এ খবর ও প্রতিবেদন বিভিন্ন ভাষায় লিখে বিবিণ্ন প্রচারমাধ্যমকে সরবরাহ করলাম। আকাশবাণীসহ বিদেশী ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যম এবং ভারতীয় পত্র-পত্রিকাসহ সকল বিদেশী সংবাদ মাধ্যম আমাদেরকে সর্বাত্নক সহযোগিতা করেছিল এ কথা কৃতজ্ঞচিত্তে না বললেই নয়।

সামরিক প্রচার উপদেষ্টারা বললেন, এখন সার্বিক প্রচারযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত। আঘাত হানতে হবে জলে-স্থলে-আকাশে। এখন কেবল প্রচার মহাযুদ্ধ চালাতে হবে। পাকিস্তানী লোহা এখন গরমে লাল হয়ে আছে। এখন প্রচারের শক্ত হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে পারলে তাদের এই লোহা গলে যাবে। (চলবে)