প্রতিধ্বনি শুনি আমি প্রতিধ্বনি শুনি

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটাউজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

গান শেখা যখন থেকে শুরু তখন থেকেই অনেক কিছুই শিখি আমি,প্রতিনিয়ত। বস্তুত রোজকার ভাতের থালাতেও আমার কিছু শিক্ষা হয়।এটা নিয়ে আমি কখনওই গর্ব বা অহংকার করিনা,এটাও আমাকে শিখিয়ে দেয়া শিক্ষা বা মুল্যবোধের অংশ। উচ্চাঙ্গসংগীত শেখার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নজরুল সংগীত, লালনের গান,দেশের গান,কিছু পুরান হিন্দী, উর্দু গজল আমি শিখতে থাকলাম। সে বড়ই সৌভাগ্য আমার।কিন্তু তা যখন বাড়িতে আগত ভিক্ষুক কে শোনাতে হত তা বড়ই যন্ত্রণা দায়ক হত! আব্বার কি সে খেয়াল আছে? বর্ষাকালীন পুরো সময় আব্বা বড় নৌকো ভাড়া করে কিছু খাবারদাবার সহ পুরো পরিবার তাতে চড়ে বসতাম।লোকালয় পার হতেই আব্বা চোখ বুঁজে আবদার করতেন,মা কনা, এবার গান ধরো।

শুরু হত অনুরোধের আসর।এই পদ্মা এই মেঘনা, মুছাফির মোছ এ আখী জল, পথ চলিতে যদি চকিতে,চেওনা সুনয়না। কত গান! গাইতে গাইতে আমি আবিষ্কার করতাম,ঘরে বসে যখন এ গান গুলো গাই তার ভেসে বেড়ানো এমন না! এ যেন আমার কন্ঠের সুর এগিয়ে এগিয়ে এক অজানা গন্তব্যে ভেসে বেড়ানো। আব্বা কে একদিন বললাম সে কথা।আব্বা বলেন, কই,আমি তো তা শুনিনা! আম্মাকে বলি,আম্মা বলেন,হতেও পারে।আমি নাছোড়বান্দা। আব্বা বলেন ঠিক আছে আমরা আবার শুনবো। আবার শোনা হয়,নানাভাবে, নানা জায়গায়।আব্বা স্বীকার করেন আমার কথা।উপলব্ধি করেন আমার গান নানাভাবে ভেসে যাওয়ার অনুভূতি সঠিক।আব্বা গদগদ হয়ে আম্মাকে বলেন,মোমেনা—-তোমার মেয়েকে বিজ্ঞান শিখাতে হবে,বুঝেছো।আম্মা এবার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে বলেন, তাহলে গান ছেড়ে পড়ায় মনযোগী হতে হবে তোমাকে আমাকে কনাকে।

আব্বা প্রমাদ গোনেন।বলেন মাগো– প্রতিধ্বনি নিয়ে ভাবা বন্ধ কর।আমি বলি,আব্বা তা কি করে হয়! একদিন আমি আর আব্বা গুদারায় করে বাসাবো থেকে দক্ষিণ গাঁ ফিরছি।ঘুটঘুট অন্ধকার। আব্বা কে বলি—আব্বা —এখন আমি গান গাইবো, আপনি শুনবেন এখন কেমন প্রতিধ্বনি হয়? আব্বা চুপেচুপে বলেন মাগো,নৌকায় আরো অন্য লোক আছেন,তারা কি ভাববেন,আমি জিদ করতে থাকি।নৌকায় বসা পারাপারের অন্যরা বলেন, হয়ে যাক গান।আমি গান ধরি।সে ভীষন এক পরিবেশ। গান আমার নৌকার মতই চলচল করে ডুবে ডুবে এগিয়ে যেতে থাকে।আমি গান গাইতে থাকি।আমি বুঝতে পারি,শ্রোতারা কাঁদছেন।বাড়ি চলে আসি।নামাinside-dec_3র সময় অনেক আশীর্বাদ ধ্বনিত হতে থাকে।আশীর্বাদ এর বৃষ্টি নামতে থাকে ঝরঝর আমার মাথায়।আব্বা বাসায় ফিরে স্তব্ধ। আমি ভয় পাই।নৌকায় গান গেয়েছি বলে আব্বা রাগ করলেন?

কয়েকদিন পর আব্বা বললেন, মাগো .. এসো .. কথা আছে।মোমেনা.. তুমিও বস।আমি মনযোগী শ্রোতা।আব্বা মুখ খুললেন।

আব্বা বললেন— শোন,গান তো শুধু গান নয়।গান একটি শক্তিশালী মাধ্যম। শব্দের ইথারে গান যে ভেসে যায় সেখানে সে তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে ভেসে যায়।যে গায় আর যে শোনে তার মাঝখানে কাজ করে শক্তিধর ইথার।সে ইথার তার সামনের ওয়েভ,বাতাস,পরবর্তী প্রতিবন্ধকতা সব কিছুকে নিয়েই গানের শরীর তৈরি করে।ঘরের ভেতর এর আসবাবপত্র গানের সুরকে বাধাপ্রাপ্ত করে।গান যখন খোলামাঠে প্রবাহিত হয় তখন তা বাধাহীন হয়ে অতদূর পৌঁছায় যতদূর পর্যন্ত কোন বাধা না থাকে।গান যখন পানির ওপর ভাসে সে তখন পানির তরঙ্গ কে সঙ্গে নিয়ে শক্তিধর হয়ে ওঠে। আলো সেখানে শব্দের কিছু অংশ শুষে নেয়।গান যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন পানির প্রবাহতে প্রবাহিত হয় সে তখন একাকী। তার সবটুকু শক্তিই একত্রিত হয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে প্রবাহিত হয়

প্রতিটি ঘর বা দালানের নিজস্ব একটি ওয়েভ বা শ্রুতির নম্বর আছে।শ্রুতি হল আমরা যা শুনি তার শুক্ষ অংশ।একটি শব্দের বা স্বরের বাইশটি ভাগ আছে।এর এক একটি ভাগ ই শ্রুতি।আগেই বলেছি প্রতিটি রুমেরই নিজস্ব শ্রুতি আছে।তুমি যখন গাইবে তখন সেই ঘরের নিজস্ব শ্রতিতে আঘাত পাওয়া মাত্রই তা গমগম করে উঠবে।সেই সুত্রেই একটি কথা বলি মা, এই যে বলা আছে একদিন ইস্রাফিল আল্লাহর হুকুমে বাঁশী ফুঁকবেন আর পৃথিবী ধংস হবে।এবার শুধাও—এতো বড় পৃথিবী, বাঁশীর সুরের কি শক্তি যে তার এক ফুঁয়েই তুলার মত ধুনে ধুনে পৃথিবী পুঁজরা পুঁজরা হয়ে যাবে? ওই যে শ্রুতি? ইস্রাফিলের বাঁশীতে পৃথিবীর নিজস্ব শ্রুতি সেট করা আছে।সেই সুরে এই সুর মিলানোই ইস্রাফিলের বাঁশীর কাজ।

এবার আমি ভয় পেয়ে যাই,আম্মাও,স্বয়ং আব্বাও।গান তো শিখছি। গান গেয়েই শ্রুতিতে শ্রুতি মিলানোর দায়িত্ব আমার। কথা হল কোটি শ্রোতার হৃদয়ে সেট করা শ্রুতিতে শ্রুতি মিলিয়ে তাঁদের হৃদয়ে জায়গা করার মহা দায় আব্বা আমাকে দিলেন,নাকি আল্লাহ!

হে সৃষ্টিকর্তা,আমি আজীবন চেষ্টা করেছি নির্ভুল ভাবে সততার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করতে।বাকী সব তোমার হাতে,কারন এই কণ্ঠ, এই সুর, এই ইথার, এই ওয়েভ, এই প্রতিধ্বনি, এই প্রতিবন্ধকতা, এই সব হৃদয়, মন কান ,শ্রুতি, সব তোমার,আব্বা তাঁর ধারক,আমি বাহক।আল্লাহ …আমার দায়িত্ব টুকু পালন করার ক্ষমতা আমাকে দাও।আমি তোমার সব শব্দ প্রতিধ্বনিত হওয়া পর্যন্ত প্রবাহিত করার গুরুদায়িত্ব পালন করে যেতে চাই যে কোন আবহে,জলে,চরে,আঁধারে,কবরে এবং না দেখা সেই জগতেও।আল্লাহ …কোন শব্দ ভুল পথে প্রবাহিত হলে মাফ করে দিও আল্লাহ। কারন আমার পথপ্রদর্শক এখন শব্দ,ইথার শ্রুতিহীন এক প্রতিবন্ধকতাময় আঁধারে একাকী .. তুমি ছাড়া আমাকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে পথে দেখানোর আলোকবর্তিকা আমি আপাতত হারিয়ে ফেলেছি,আল্লাহ!

ছবি: লেখক ও অনিরূদ্ধ দাস