মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রঃ অবহেলার আড়ালে কিছুটা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এখনো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার প্রকৃত অবয়বে উপস্থাপিত হয়নি এমন অভিযোগ আর আফসোসের কথা প্রায়ই শোনা যায়। জানা গেছে গত চার দশকে ৫০টি‘র মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং সমসংখ্যক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সহজেই বলে দেয়া যায়, এই সংখ্যা আরও বেশী হওয়া উচিত ছিল। প্রয়োজন ছিল মুক্তিযুদ্ধে বাঙালী জাতির বীরত্বগাঁথা, সেই বিপদাপন্ন সময়ে জীবনের নানা কৌণিকে আলো ফেলে মুক্তিযুদ্ধের অনালোচিত দিকগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা। সেদিক থেকে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে বেশ অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।  muktijuddhe_cinema_inner_2_778370623
ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের সরকারী ও বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র। লক্ষ্য করে দেখবার বিষয় হচ্ছে গত কয়েক বছরে চ্যানেলগুলোতেও বেশী সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধের ওপর নতুন নির্মিত চলচ্চিত্র দেখানো হয় না। সোজা করে বললে, দেখানো সম্ভব হয় না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা তো আঙুলে গোনা যায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বাংলাদেশের অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা শহীদ জহির রায়হান ১৯৭০ সালে তৈরী করেছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। এই ছবির কাহিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ সূচীত হওয়ার আগেই তৈরী করেছিল স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট। বাঙালীর প্রাণের দাবিকে উপস্থাপন করেছিল পর্দায়। এই সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছিল আমার সোনার বাংলা এবং আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো‘র মতো দুটি গান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমার সোনার বাংলা গানটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরপর নির্মিত হয় বেশ কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি নির্ভর সিনেমা। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায় `ওরা ১১ জন’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নি সাক্ষী’, ‘আলোর মিছিল’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’-এর মতো ছবির নাম। কিন্তু এ ধরণের ছবিতেও কি মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাস, এর রাজনৈতিক গভীরতা, মানুষের আত্নত্যাগ, বেদনা আর এক বিশেষ সময়ে জাতির সবচাইতে সাহসী সন্তানদের বীরত্বের গল্প যথার্থ ভাবে ফুটে উঠেছে? কোথাও কেবল সদ্য প্রাপ্ত যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে রিল ভর্তি করা হয়েছে আবার কোথাও প্রাধান্য পেয়েছে পাক বাহিনীর ধর্ষণ। আবার কোথাও যথাযথ গল্পের অভাবে পর্দায় মুখ থুবড়ে পড়েছে জোড়াতালি দেয়া ঘটনাপরম্পরা। nurubrl-1451277075-dc5a8e3_xlarge
সমালোচকরা বলেন, রাজনীতির ধারাবাহিক ইতিহাসকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে-না পারা, ইতিহাসের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে ফেলে সদ্য স্বাধীন একটি দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে বিবেচনা করার যোগ্যতা না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের ছবি স্বাধীনতা প্রাপ্তির এতো বছর পরেও তার যথাযথ জায়গায় পৌঁছুতে পারেনি।
পাশাপাশি, ভালো কাহিনি, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাবকে অনেকে এজন্য দায়ী করে থাকেন।কিন্তু এই অভাববোধের দোহাই দিয়ে তো বেশীদিন চলা যায় না। যাবেও না। সময় পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি আর অর্থনৈতিক দৈন্য তো তার নিজের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কিন্তু তারপরেও ভালো লগ্নি, ভালো গল্প নিয়ে কটা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা তৈরী হয়েছে আমাদের দেশে? তাহলে কী বলে দেয়া যায় রাজনৈতিক কমিটমেন্ট আর দেশপ্রেম এখানে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে? হয়তো ভবিষ্যত এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে।
তবে এর মাঝেও উল্লেখযোগ্য কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন জহির রায়হান, আলমগীর কবির, চাষী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও জাহিদুর রহিম অঞ্জনের মতো নির্মাতারা। তাদের হাতে নির্মিত হয়েছে ‘জীবন থেকে নেয়া, ‘ওরা ১১জন’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘মাটির ময়না’ ও ‘মেঘমল্লার’ এর মতো চলচ্চিত্র।

01-1১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’। আলমগীর কবির তৈরি করেন ‘লিবারেশন ফাইটার্স’। এছাড়া বাবুল চৌধুরী নির্মাণ করেন ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’। এসব প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নৃশংসতা, গণহত্যা, শরণার্থী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, মুজিবনগর সরকারের তৎপরতাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে এসব প্রামাণ্যচিত্র বিশেষ ভূমিকা রাখে। ওই সময়েই জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিজয়ের দেড় মাসের মধ্যেই জহির রায়হান নিহত হন চক্রান্তকারীদের হাতে। পরে আলমগীর কবির চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। সে সময় উল্লিখিত চারটি প্রামাণ্য চিত্র ছাড়াও দশ মিনিটের একটি সংবাদচিত্র নির্মিত হয়। এ ছাড়া বিদেশী নির্মাতারাও বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
স্বাধীনতা অর্জনের পর চাষী নজরুল ইসলাম তৈরী করলেন প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র। তাঁর ‘ওরা ১১ জন’ মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। একই বছর মুক্তি পায় সুভাষ দত্ত নির্মিত ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, আনন্দ পরিচালিত ‘বাঘা বাঙালী’, মমতাজ আলী পরিচালিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’। আলমগীর কবির ১৯৭৩ সালে মুক্তি দেন ‘ধীরে বহে মেঘনা’। একই বছর নির্মিত হয় খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’, কবীর আনোয়ার পরিচালিত ‘শ্লোগান’, আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘আমার জন্মভূমি’। ১৯৭৪ সালে নির্মিত হয় নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘আলোর মিছিল’, চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘সংগ্রাম’ ও এস আলী পরিচালিত ‘বাংলার ২৪ বছর’।muktichetona-4-lg20150325220222
১৯৭৪ সালের পর প্রায় দুই বছর এক বন্ধ্যা সময় গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তির রাজনৈতিক প্রভাবেই মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কোন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। অনেকদিন পর ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় হারুন-অর-রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’। ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় শহীদুল হক পরিচালিত ‘কলমীলতা’।
‘কলমীলতা’র পর প্রায় ১৩ বছর চলে সেই খরা। তৈরী হয় না মুক্তিযুদ্ধের গল্প ভিত্তিক কোন ছবি।  সময়টাতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পায় কিন্তু সেখানে মুক্তিযুদ্ধ  ভিত্তিক সিনেমা ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। তবে ওই সময়ে বিকল্পধারায় বেশ কিছু প্রামাণ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য মিলিয়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এর মধ্যে মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’, তানভীর মোকম্মেলের ‘হুলিয়া’ ও ‘নদীর নাম মধুমতি’, আবু সাইয়ীদের ‘ধূসর যাত্রা’, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘একাত্তরের যীশু’, তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’ উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ এক যুগ পর ১৯৯৪ সালে সরকারি অনুদানে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন ‘আগুনের পরশমনি’। এরপর ১৯৯৮ সালে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রেও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এ সময়টাতে হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া আর কেউ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি।
images১৯৯৮ সালের পর চার বছর নির্মিত হয়নি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র। এরপর তারেক মাসুদ নির্মাণ করেন ‘মাটির ময়না’।একই সময়ে সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। একই পরিচালক ২০০৪ সালে রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘মেঘের পর মেঘ’। ওই বছরে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন ‘শ্যামলছায়া’ ও অভিনেতা তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন ‘জয়যাত্রা’। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় চাষী নজরুল ইসলামের ‘ধ্রুব তারা’ ও মোরশেদুল ইসলামের ‘খেলাঘর’।bd-pratidin-2016-11-13-023
২০১১ সালে নাসির উদ্দিন ইউসুফ নির্মাণ করেন ‘গেরিলা’। সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ ছবিতে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট ধরার চেষ্টা করা হয়। ওই বছর মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারী অনুদানে কিছু মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘জীবনঢুলী’ ও জাহিদুর রহমান অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশকিছু তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে। তার মধ্যে শবনম ফেরদৌসী‘র ‘জন্মসাথী’ উল্লেখ করার মতো একটি নির্মাণ। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষপটে বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতারা তাদের নতুন ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। এই ধারা তৈরী করেছে নতুন আশার জায়গা। হয়তো এই নব প্রজন্মের হাত ধরেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র তার যথার্থ আসন ফিরে পাবে।

অথৈ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ অনুপম হায়াতের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও ইন্টারনেট