জন্ম আমার ধন্য হলো

ক্র্যাক প্লাটুন। মনে পড়ে সেই কবিতার লাইন ‘ হাতে তাদের মারানাস্ত্র, চোখে অঙ্গীকার/ সূর্যকে তারা বন্দী করবে/ এমন অঙ্গীকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় এই গেরিলা যোদ্ধারা। এই দেশের অকুতোভয় তরুণদের নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবরুদ্ধ রাজধানী ঢাকার বুকে অপারেশন চালানোর জন্য গঠন করা হয় এই বিশেষ গেরিলা দল।তাদের কেউ তখন পড়তেন স্কুলে, কেউ কলেজে কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের বুক ভর্তি ছিল স্বপ্ন। ছিল জীবনের হাতছানি। বাবার স্নেহ, মায়ের ভালোবাসায় তারা বেড়ে উঠছিলেন। কিন্তু এক সময় এলো ১৯৭১ সাল। বাঙালী জাতির জীবনে এলো শেকল ভাঙ্গার কাল। দেশ মাতৃকা ডাক পাঠালো শোষণ আর বঞ্চনার অন্ধকার পেরিয়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনার জন্য। দেশের সাহসী সন্তানেরা মুহূর্তেই ছিন্ন করলেন গৃহের বন্ধন, উপেক্ষা করলেন স্নেহ আর মমতার পিছুটান। ঝাঁপিয়ে পড়লেন তারা রণক্ষেত্রে। তাদের সামনে তখন একটাই লক্ষ্য দেশের জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করা।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে এই গেরিলা বাহিনীর অসমসাহসী যোদ্ধারা পাক বাহিনীর কঠিন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা ঢাকার ওপর রুদ্ধশ্বাস অপারেশন পরিচালনা করেন। তাদের এই আঘাতে পাক বাহিনীর অবস্থান টালমাটাল হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারতের মাটিতে প্রয়াত মেজর (পরে জেনারেল) খালেদ মোশারফের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণ গেরিলারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনসহ ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় সফল অভিযান চালায়। আবু বকর, হাফিজ, জুয়েল, আজাদ, বদি, রুমিসহ তরুণ গেরিলাদের এই অভিযানগুলো তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছিল প্রেরণা। আগস্টের ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ অসমসাহসী, নির্ভীক, গেরিলা যোদ্ধারা পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তাদের সহযোগিতা ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হয় অমর একুশের গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদকে। হানাদারদের টর্চার সেলে তাদের ওপর চলে অমানুষিক, নির্মম, বর্বর নির্যাতন। এর পর তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তাদের সেই মহান লড়াই আর আত্নত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ পেয়েছি আমাদের প্রিয় স্বাধীন মাতৃভূমি। তাদের মতো আরও হাজার মুক্তিযোদ্ধার রক্তে এই দেশের মাটি পবিত্র হয়েছে। তাদের অবদান কোনদিন ভোলা যাবে না।
আজ বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবসে এই মাটিতে জন্ম নেয়া সেইসব নির্ভীক সন্তানদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রাণের বাংলার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

শহীদ বকর
১১ আগস্ট ১৯৭১, ঢাকা ইন্টারকন্টিনেনালে দ্বিতীয় দফায় একটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটানোর নেপথ্যে মূল নায়ক ছিল ১৮ বছর বয়সী একটি ছেলে, ক্র্যাক প্লাটুনের সর্বকনিষ্ঠ গেরিলা- মোহাম্মদ আবু বকর। ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টালে তার সেই দুঃসাহসিক শহীদ বকরএ্যাকশনের খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানী মিলিটারিদের দাম্ভিকতা, যারা ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত করে রেখেছিল। ১৮ বছর বয়সী এক বাঙালী ছেলে সেদিন তার সাহস আর দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসার ওপর ভর করে পাকিস্তানী সেনাদের সবচেয়ে নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গায় হামলা চালিয়ে আবার নিরাপদে বের হয়ে এসেছিলেন। পাক মিলিটারি পাগলা কুকুর হয়ে গিয়েছিল। তারপর এই দুঃসাহসী যুবককে ৩০ আগস্ট ভোরে গুলশান-২ এর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পাক আর্মিরা। নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরিসংলগ্ন এমপি হোস্টেলের বদ্ধ কামরায় অমানুষিক নির্যাতন চলে এই গেরিলার ওপর। সেদিনের পর বকর আর ফিরে আসেনি…।

শহীদ হাফিজশহীদ হাফিজ
শহীদ হাফিজ বেহালা বাজাতেন। সুরের পথ ধরেই তার সঙ্গে পরিচয় বাংলাদেশের আরেক অসীম সাহসী সুরকার আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে। হাফিজকে আলতাফ মাহমুদের ছায়াসঙ্গী বলে ডাকা হতো। একাত্তরের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গেরিলা যুদ্ধের অগ্নিময় বিস্তারের সময়ে এই দুজন মানুষ ছিলেন একসঙ্গে। মৃত্যুও তাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ৩০ আগস্ট পাক সেনাদের হাতেও তারা একসঙ্গে ধরা পড়েন। অত্যাচারের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে, হাফিজ টর্চার সেলেই ৩১ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

শহীদ আলতাফ মাহমুদ
৩৭০ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের বাসায় থাকতেন আলতাফ মাহমুদ। একাত্তরের গেরিলাদের জন্য এক দুর্গ বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল তার বাড়িটি। এ সময়ই তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ঢাকা শহরে কতগুলো অপারেশনে শহীদ আলতাফ মাহমুদগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের নির্দেশে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অপারেশন হয় আলতাফ মাহমুদের অংশগ্রহণে। তাদের কাছে প্রচুর বিস্ফোরক থাকায় সেগুলো নিরাপদে রাখার স্থান পাওয়া নিয়ে দেখা দেয় সমস্যা। আলতাফ মাহমুদ নিজ দায়িত্বে সব গোলাবারুদ তার বাসায় কাঁঠালগাছের নিচে পুঁতে রাখেন।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে ক্র্যাক প্লাটুনের সামাদ নামে একজন গেরিলা ধরা পড়েন। পাঞ্জাবী পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অমানুষিক নির্যাতনের মুখে তিনি আলতাফ মাহমুদের বাসার কাঁঠালগাছের নিচে লুকিয়ে রাখা গোলাবারুদের মজুদের কথা প্রকাশ করেন। সেই কালো দিন ৩০ আগস্ট ভোরে আর্মিরা প্রথমে আলতাফ মাহমুদকে ওই ট্রাংকভর্তি অস্রসহ ধরে নিয়ে যায়। তার পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শহীদ আজাদ
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। রাতে রাজধানীর একটি বাড়িতে হামলা চালায় পাকিস্তানী সেনারা। শত্রুর আচমকা হামলায় ধরা পড়ে যান ক্র্যাক প্ল্রাটুনের কয়েকজন যোদ্ধা। এই দলটির সঙ্গে ছিলেন আজাদও। আজাদকে ধরে নিয়ে গিয়ে রাখা হয় রমনা থানায়। শহীদ আজাদআজাদের মা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান। ছেলের কাছে গিয়ে সেদিন মা বলেছিলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনোকিছু স্বীকার করবে না।’ আজাদ সেদিন তাঁর মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়েছিলেন। মা ভাত নিয়ে ফিরে এসে ছেলেকে আর পাননি। আর কোনোদিনও মায়ের বুকে ফিরে আসেনি মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আজাদ।
১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। ঠিক ৩০ আগস্টেই মারা যান তিনি। পুরো ১৪টি বছর এক কণা ভাত মুখে তোলেননি সেই অসাধারণ মা। কেবল একবেলা রুটি খেয়ে থেকেছেন। কারণ তার একমাত্র ছেলে আজাদ ভাত চেয়েও খেতে পারেনি সেদিন। অপেক্ষা করেছেন ১৪টি বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। ১৪ বছর তিনি বিছানায় শোননি। মেঝেতে শুয়েছেন। শীত-গ্রীষ্ম কোনো সময়ই তিনি পাল্টাননি তার এই পাষাণশয্যা। কারণ তার ছেলে নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরিসংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে বিছানা পায়নি।

শহীদ বদি
বদিউল আলম ঢাকা শহর ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ অপারেশনে অংশ নেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— ৮ শহীদ বদিআগস্ট ফার্মগেটে পাক বাহিনীর চেকপোস্ট অপারেশন, ১১ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটানো, ১৪ আগস্ট গ্যাস বেলুনের মাধ্যমে ঢাকা শহরের আকাশে বাংলাদেশের অনেক পতাকা ওড়ানো, ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে অপারেশন, ২৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ১৮ ও ২০ নম্বর রোডে অপারেশন। এ সব অভিযান এখনো তাদের দেশপ্রেম আর দুঃসাহসিকতার উদাহরণ। এই উজ্জ্বল মানুষটির পেছনেই ছিল মায়ের মমতাময় আচলে ছায়া। মায়ের আদেশেই বদিউল আলম ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’র সদস্য হন এবং ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় একের পর এক দুর্ধর্ষ ও দুঃসাহসিক সফল অপারেশন পরিচালনা করেন।
২৯ আগস্ট ধানমণ্ডিতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাক বাহিনীর একটি দল হঠাৎ করেই বাড়ি ঘেরাও করে। বদিউল জানালা টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা কাজে আসেনি। পাক হায়েনারা সেখান থেকে শুধু বদিউলকেই ধরে নিয়ে যায়। আর কোনদিন ফিরে আসেননি বাংলাদেশের এই সূর্য সন্তান।

শহীদ জুয়েল
১৯ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন অপারেশনের সময় পাক বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে তিনি আহত হন। এর পর তাকে আলতাফ মাহমুদের বাসায় চিকিৎসার জন্য আনা হয়। আলবদরের তৎকালীন সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আহসান মোহাম্মদ শহীদ জুয়েলমুজাহিদ এই খবরটা পৌঁছে দেয় স্থানীয় পাকিস্তানী ক্যাম্পে। ২৯ আগস্ট পাক বাহিনী হামলা চালায় জুয়েলের বাড়িতে। আহত জুয়েলকে তারা ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। ক্র্যাক প্লাটুনের তথ্য ও সকলের পরিচয় জানার জন্য প্রচণ্ড অত্যাচার চালানো হয় তার ওপর। ক্রিকেট খেলোয়াড় জুয়েলের হাতের দুটি আঙ্গুল কেটে ফেলে পাক বাহিনী নির্মম নিষ্ঠুরতায়। প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখেও একটা কথা বলেননি তিনি। ৩১ আগস্টের পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তাকে ৩১ আগস্ট ক্র্যাক প্লাটুনের অন্য সকল যোদ্ধার সঙ্গে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ জুয়েলকে মরণোত্তর বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়।
১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তার বীরত্বভূষণ সনদ নম্বর ১৪৮। বাংলা মায়ের এক অকুতোভয় বীর সন্তান এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন।

শহীদ রুমি
সেক্টর-২ এর অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সৈয়দ শফি ইমাম রুমি। এই সেক্টরটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের প্রধান পুরুষ মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষ করে রুমি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। শহীদ রুমিরুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলা চালানো। এ সময় তাকে ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয়, যার মধ্যে ধানমণ্ডি রোডের একটি আক্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
ধানমণ্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তার সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তার নিজের বাড়িতে কাটান এবং এই রাতেই বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধার সঙ্গে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।
শহীদ রুমি ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে। ১৯৭১ সালে তাঁর লেখাপড়া করতে চলে যাওয়ার কথা ছিল দেশের বাইরে। মেধাবী ছাত্র রুমি বিদেশে লেখাপড়া আর গোছানো ক্যারিয়ারের হাতছানি উপেক্ষা করেছিলেন সেদিন। এই দেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে তিনি আরও লক্ষ মুক্তিসেনার মতো জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন দেশকে কতটা ভালোবাসতেন তিনি।

নিধি মঞ্জুর
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গেরিলা ১৯৭১