১৯৭১

একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা’ বইটি লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক নজরুল ইসলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন।

নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রলালয়ের অধীন মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক বা প্রধান সেনাপতি কর্ণেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম.এ.জি ওসমানীর দফতরে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। এই সুবাদে তিনি ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখেন। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে পরে তিনি এই বইটি লিখতে শুরু করেন।  বইতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকাল, পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক বিন্যাস এবং ব্যক্তিগত বহু স্মৃতি সংযোজিত করেন।

অনুপম প্রকাশনী কর্তিৃক প্রকাশিত এই বইতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সেইসব কাহিনির কিছু অংশ প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে পুনঃমুদ্রন করা হলো। (প্রাবাস)  

nazrul_1971মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্ভবত জুলাই-আগস্ট মাসে ঊদুল ফিতর পড়েছিল। মুসলমানদের জনর‌্য এটি একটি পরম আনন্দের দিন হলেও বিদেশ-বিভুঁইয়ে আত্নীয়-স্বজনহীন পরিবেশে ঈদুল ফিতর মুজিবনগরে সবার জন্য যেন ছিল বিষাদের দিন।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সেদিন মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেদিন যুদ্ধবিরতিও ঘোষিত ছিল। কিন্তু কার্যত মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধবিরতি পালন করেনি। সেদিন রণাঙ্গণে রাইফেল-বন্দুক হাতে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঈদের আনন্দ-উৎসব রণাঙ্গণে একজন শত্রু হননের চেয়ে বড় ছিল না।

মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরের ঝছাট মাঠে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে ঈদুল ফিতরের জামাত অনুাষ্ঠত হয়। সেদিন বাংলাদেশের দখলকৃত মুক্ত এলাকায় ঘটা করে ঈদুল ফিতর উদযাপনের ব্যাপক আয়োজনের খবর ফলাওভাবে প্রচারিত হয়েছিল। কলকাতার সকল পত্রিকায় মুজিবনগর সরকারের ঈদের জামায়েতের ছবি ছাপা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রহমত আলী, ঢাকার শাহাবুদ্দীন এবং আমি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে হাজির হলাম ঈদের দিনে ভালো খাবারের প্রত্যাশায়। কিন্তু হায়! প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে ঈদের কোন আমেজই পাইনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঈদের কোন খাবার পাননি। তাঁর মনোভাবও ছিল খুবই শীতল। তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে রহমত আলী আমাকে বললেন, চলুন, তাজউদ্দীন সাহেবের বাসায় যাই। বেগম জোহরা তাজউদ্দীন খুব ভালো রাঁধুনী। ওখানে নিশ্চই ঈদের পর্যাপ্ত খাবার রান্না হয়েছে।%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%a3-%e0%a7%ad-%e0%a6%ad%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a6%b0

রহমত অঅলীর সঙ্গে দুপুরের পর সিআইটি রোডের বাসায় গেলাম। হায় পোড়াকপাল!িইীদের আনন্দ! আমি আর রহমত অঅলী একই সঙ্হে ভাবি বলে ডাক দিয়ে জোহরা তাজউদ্দীনের কাছ থেকে ঈদের আনন্দের দিনে সাড়াটুকু পাইনি।

জ্বরে পুড়ে যাওয়া একমাত্র ছেলের শিয়রে বসা নির্বাক জোহরা তাজউদ্দীনের দুচোখ দিওেয় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাসার চুলায় হাঁড়ি পর্যন্ত চড়েনি। পাশের ঘরে আরও আত্নীয়-স্বজন আছেন। সবার মুখ কালো। কারো পেটে খাবার পড়েনি। সবাই উপোস। শুনলাম ঈদের দিনেও তাজউদ্দীন সাহেব একবারের জন্যও বাসায় আসেননি। ঈদের দিনে বাসায় খাবারের আয়োজন কী আছে, কিংবা নেই, কী রান্না হবে, ছেলেমেয়েরা খেয়েছি কি না, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিমশীতল তাজউদ্দিন আহমদ এসব চিন্তাভাবনার সঙ্গে একটিবারও নিজেকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তাটুকু অনুভব করেননি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা নীরবে চলে আসার সময় ভাবি আমাদের দেখে কান্নাজগিত কন্ঠে বললেন, রহমত আলী, নজরুল সাহেব, গতরাত থেকে ছেলেটির ভয়ানক জ্বর। সে কিছুই খাচ্ছে না। আপনাদের ভাই বাসার কোন খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না।বাসায় কোনদিনই আসেন না। আমরা কী-খাই, না-খাই কোন কিছুরই খবর নিচ্ছেন না। আপনাদের ভাইকে বলবেন যেন বাসায় আসেন। (চলবে)