ভালোবাসার শহর: ৪

শারমিন শামস্

শারমিন শামস্

যশোর থেকে রাজশাহী- সারা রাস্তা বন্ধু শিল্পীর দেয়া গোপাল ভাঁড়টাই পড়তে পড়তে এলুম। আজ আর মনে পড়ে না সেই যাত্রাপথের আর কোন স্মৃতি। বুকজুড়ে শুধু যশোর ছেড়ে আসার বেদনা আর গোপাল ভাঁড়ের হাসির গল্পের নিউজ প্রিন্টের পাতা ওড়া- আর কিছু নেই। রাজশাহীতে সাগরপাড়ায় দোতলা বাড়ি। সামনে ছোট্ট একটু জায়গা। বিকেলে খেলি ওইখানে। খেলতে খেতে একদিন সামনের রাস্তায় গিয়ে দেখি একটা জলা মতন পার হয়ে একটা বাড়িতে জানালার পাশে বসে আছে এক লোক বাঁদর নিয়ে। বুঝলাম বাঁদরটা তার পোষা। অবাক আমি। একপর সেই বাঁদরের টানে খেলা ফেলে ফেলে কেবলই সেই রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানো আর ইশারায় ওই বাঁদরওয়ালার সঙ্গে কথা কওয়া। বড্ড নিষ্পাপ জীবন ছিল রে। কেমন হারাই হারাই আর ফুলের গন্ধ মাখা। ঠিক যেমন হয় ছেলেবেলা!

পদ্না নদী

পদ্মা নদী

ভর্তি হলাম পিএনস্কুলে।অ্যাডমিশান টেস্ট কী জিনিস তাই জানিনা।কিন্তু আম্মার মুখ হাসিহাসি।পরীক্ষায় আমি প্রথম।সেই প্রথম আমার পড়ালেখার পরীক্ষায় প্রথম হওয়া, সেইশেষ।এরপর কোনদিন তৃতীয়’র বেশি উঠি নাই।প্রথম কেন হতে হবে, এইটাও বুঝি নাই।মাঝেমাঝে এখন মনে হয়, বইয়ের পড়াগুলোও আমি বোধহয় ঠিকঠাক বুঝতাম না।সব ক্যামন কঠিন আর এলোমেলো লাগতো প্রায়ই। ক্যানো কে জানে। সে কথা জানতো না তো কেউ। এমনকি আমিও। এমনটা যে হতে পারে, সেইটাই বুঝি নাই। এদিকে ক্লাসের ভিতরে ছায়া ছায়া অন্ধকার, বাইরে খেলার মাঠে টু টু করে ডাকতো কোন পাখি, জাম্বুরা গাছের ভিতর দিয়ে ওইপাশে হোস্টেল বিল্ডিংটা দেখা যেত। দুপুরে অলস ক্লাসের ভিতরে বই থেকে মুখ তুলে দেখতুম, একটা হুলো বেড়াল পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে ক্লাসের সামনের বারান্দাটায়। আমি তাকে হাত ইশারায় ডাকতাম আর ভাবতাম কখন ক্লাসের ঘন্টি বাজলে টিচার বেরিয়ে যাবে টিচার্স রুমের দিকে আর আমি হুলোটাকে ধরে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে পারবো। ও তো এসেছে আমারই খোঁজে, গত তিনদিন ধরে আমার ন্যাওটা, মাত্র একখানা জিলিপির বিনিময়ে আমার প্রেমে পড়ে গেছে। এমনকি আমি কোন্ ক্লাস কোন্ সেকশন সেটি পর্যন্ত মনে রেখেছে মোটাসোটা লেজফোলা হুলোটা!

রাজশাহী শহর

রাজশাহী শহর

তো সেই হুলো, কি কোনদিন মিনি, কোনদিন তাদেরি ছানাপোনাদের আদর করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা খেতাম বুলু আপা কি খুকু মিসের কাছে। ছোট ছিলাম বলে মৃদু ধমকে পার পেতাম আগে। ক্লাস নাইন কি টেনে যখন একই কাজে ধরা খেলুম, আহা, সে কি গা জ্বলানো অপমান আর তিরস্কার! বিড়ালের শখ মিটে যাবার কথা ছিল বটে। বেশি বেশি নির্লজ্জ বলেই মিটলো নাহ!

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

তো পিএন স্কুলের পিছনে বিশাল রাস্তা। সোজা চলে গেছে- কোথায়? আজ আর মনে নেই। কিন্তু কোন একটা রাস্তা ছিল বটে, যেটি চলতে চলতে এসে মিশে যেত পদ্মার পাড়ে, ঢেউ ভাঙ্গা শব্দে আকুল হয়ে আমরা প্রায়ই বিকেল বেলা বালুময় চরে দাঁড়িয়ে কী যেন খুঁজতাম সূর্যাস্তের আলোয়। যা খুঁজতাম, সম্ভবত কেউ কখনো খুঁজে পেত না তা। তাই থমথমে হারাই হারাই মুখে বিষাদ জমিয়ে বাড়ির পথ দেখতো পদ্মা’র পাড় ফেরত লোকেরা।

শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর

শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর

তারপর মফস্বলে সন্ধ্যা নামতো জাকিয়ে। অলিগলি পুরানো ইটকাঠ প্রাচীর পেরিয়ে সুলতানাবাদের বাড়িতে গোল হয়ে বসে দেখতাম ডিডি সেভেন। ভারতীয় শাড়ি আর ভারতীয় চ্যানেল সক্কলের আগে পেত সেই রাজশাহীবাসী। শনিবারে লামহে আর রোববারে উত্তম সূচিত্রা দেখার পর মানবজন্ম ধন্য মনে হত। শুক্রবারে থান্ডার ক্যাটস আর বৃহস্পতিতে ক্যাপ্টেস প্ল্যানেট ছিল আমার একার। আপারা দেখতো গার্লস ফ্রম টুমরো। ড্রইং রুমের সামনে লম্বা টানা বারান্দা, সামনে রাস্তার ওই পারে আকবর ভাইয়ের বাসা। ছাদের বাগান ফুলে ফুলে ছাওয়া আর দুইটা সাদা বাদামী খরগোশের ছানা। ওই রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে স্কুলে যাবার রিকশা পেতে দাঁড়াতাম বোর্ড চেয়ারম্যানের বাড়ির গেটের ধার ঘেষে। মাটি থেকে ঘ্রান আসতো মিঠে। সামনের লন্ড্রীতে যে লোকটা দিনরাত একাকার করে ইস্তিরি ঘষতো সাদা আর রঙীর কাপড়ে, ওর বয়স হাজার পেরিয়েছে, ঠিক এই শহরটার মত!

ছবি: ইন্টানেট