মটরসাইকেল ডায়রী…৫

সুব্রত গোস্বামী

সুব্রত গোস্বামী

এই জায়গাটার একটা নাম বলেছিলেন আমাদের মিহির, মনে নেই। নাইবা মনে থাকল। তাতে সৌন্দর্যের কী যায় আসে? মহানদির বুকে পাহাড়ি প্রতিবিম্বেরা মায়াবী আবেশ এঁকে চলেছে। এমন মুহুর্তে সৌন্দর্য-পিপাসার কাছে চড়া রোদ হার মানতে বাধ্য। যদিও রিসর্টে আজ স্থানীয় মাছ রান্না করার কথা বলে এসেছি তবু এখানে জেলেদের ডিঙি দেখে নতুন করে মাছের ইচ্ছে চাগাড় দিল। তবে এত ছোট মাপের কালবোশ বলে আর নেওয়া হলনা।

টিকরপাড়া পৌঁছলাম। সাতকোশিয়া এসে আমাদের এখানেই থাকার কথা ছিল। মহানদির চরে টেণ্ট রিসর্টে। রানাদা, চির আগে এখানে থেকে গেছে। সুখস্মৃতিই ওদের এখানে আবার টেনে এনেছিল, কিন্তু থাকা হলনা। এরকম একটা জায়গায় চাঁদের আলো গায়ে মেখে রাত্রিযাপন করতাম, কল্পনা করেই রোমাঞ্চিত হচ্ছি। চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। বেশ কিছুক্ষণ বসেও রইলাম। স্থানীয় মাছের ঝোল আর গরম ভাতের লোভ আমাদের অবশেষে রিসর্টমুখি করল।

গোপীবল্লভপুর

গোপীবল্লভপুর

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর গ্রামটা ঘুরে দেখতে বেরোলাম। ছোটোবেলার আঁকার খাতায় গ্রাম বলতেই যে ছবিটা আঁকতাম এটা ঠিক সেই ছবিটা। যদিও বাঘ ছাগল সহাবস্থান আমাদের অস্বস্তি বাড়িয়েই চলেছে, তবু স্নিগ্ধ গ্রাম হিসেবে মনে জাঁকিয়ে বসছে। সংসারের সকল মায়া ত্যাগ করে একা থাকার বিলাসীতা করা গেলে মন্দ হতনা।

হেঁটে চলেছি একটু ভেতর দিকে। মিহির আমাদের নিয়ে চলেছেন। উনি আমাদের একটা জঙ্গল জঙ্গল অনুভুতি দেওয়ার চেষ্টা দেখলাম সকাল থেকেই করে চলেছেন। উড়িয়া ভাষী মিহির এ জঙ্গলের অতীত বর্ণনা করলেন হিন্দিতে। ওঁর হিসেবে করেগা খায়েগা মানে করত খেত। কালের সীমা পেরিয়ে আমরা কালের গল্প শুলতে থাকলাম।

সূর্য ঢুলুঢুলু চোখে অপেক্ষা করছে। আমরা রিসর্টের আরাম কুঠুরীতে পৌঁছলে তবেই অস্তাচলে যাবে বোধহয়। বনবস্তির কোনোএক কুঁড়েঘরে সন্ধে নামার আগেই রাতের খাবার তৈরির চুলো জ্বলে ওঠে। কোনোএক দামাল ছেলে খেলা শেষ করে খেলতে খেলতেই ঘরে ফেরে। আমরাও এগোতে থাকি ধীরপায়ে। আবার কাল ভোরে বেরিয়ে পড়া। পৌঁছতে হবে বাংরিপোসি।

ছোটকেয়ির রিসর্টের ভোর

ছোটকেয়ির রিসর্টের ভোর

বেরিয়ে পড়লাম বাংরিপোসির উদ্দেশে। চায়ের দোকানে শুনলাম এই নদিটা পেরোনোর কিছু পরেই মহানদি কয়লা অঞ্চল শুরু হয়ে যাবে। তারপর আবার বেশ ভালো রাস্তা। ভালো রাস্তায় পৌঁছে একটু জিরিয়ে নেওয়া চলছে। এই পাহাড়ি পথ আজই শেষ। বাংরিপোসি পৌঁছনোর ঠিক আগেই শেষ হবে। বাংরিপোসিতে আমরা যেখানে থাকব ঠিক করেছি, সেটা আগে ওটিডিসির পান্থশালা ছিল। এখন বেসরকারি হাতে চলে গেছে। এই সেই হোটেল। আজ আমাদের বাইক এক্সপিডিশানের শেষ দিন। আলাদা আলাদা ঘরে না থেকে সক্কলে মিলে একটা ঘরে থাকলে বেশ হত, এরকম একটা জল্পনা চলছিল। কিন্তু ফোরবেডেড রুমটার সাইজ আমাদের এই লাস্টনাইট সেলিব্রেশনের সঙ্গে ঠিক মানাচ্ছিলনা। ফাঁকা হোটেল। আমরা ছাড়া পর্যটকের চিহ্ন মাত্র নেই। আখাম্বা একটা ডরমিটরি ভাড়া করে নিলাম। যদিও ভাড়া চারটে বেডেরই দেওয়া হবে ঠিক হল।

রাতটা গল্প করেই কাটল। তাই ঘুম ভাঙার প্রয়োজন হয়নি। এখান থেকে বাড়ি তিনশ কিলোমিটারেরও কম। তবু নিয়মের অন্যথা হয়নি। ছটাতেই বেরোনো।

এই এগারোদিনের মধ্যে এই রাস্তাটা সবথেকে খারাপ। চির বলল লোধাশুলি পর্যন্ত পুরোটাই খারাপ ছিল আগেরবার। এই রাস্তায় এক কিলোমিটার পথ পেরোতেই আট দশ মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে। পেট্রলপাম্পে খবর পেলাম অন্য একটা পথের।

ছোটকেয়ির গ্রামটা

ছোটকেয়ির গ্রামটা

বাংলায় ঢুকে পড়েছি। এটা গোপীবল্লভপুরের কাছে একটা জায়গা। যদিও ইডলি এখনো পিছু ছাড়েনি। এই ইডলি বড়া এগুলোর একটা সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতা আছে দেখলাম। নর্থ-ইস্ট ছাড়া প্রায় সব জায়গায় এই খাবারটা সহ্য করতে হয়।

বাড়ির আরো কাছে চলে এসেছি। খড়গপুর ছেড়েছি একঘণ্টা আগে। গোপীবল্লভপুরের জলখাবার অতিক্রম করে এখনো পর্যন্ত লাঞ্চের ভাবনা মাথায় আসেনি। আরেকপ্রস্থ চা হোক তবে।

বোর্ড বলছে কোলকাতা আর বাহাত্তর কিলোমিটার। কিছুক্ষণ পর বাস, ট্যাক্সি বলে দিল ঘর বেশি দূরে নয়। দুপুরের খাওয়া নাহয় সেখানেই হবে। আরো কিছুক্ষণ পর ধুলো ধোঁয়া হর্ন। আমাদের আবার বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা শুরু হল হয়ত। শুরুতেই বলেছিলামনা যে, হতচ্ছাড়া ভাল্লাগেনা ছাই বলে গাল পেড়ে বেরিয়ে পড়ব, তবু এই শহরটাকে ছেড়ে বাঁচবনা বলে বারবার ফিরে আসব।

ছবি: সুব্রত গোস্বামী