কবিতাতঙ্ক

দীপারনি ভট্টাচার্য্য.diparun bhattacharyya

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

ছোট বেলা থেকেই আমি কবিতা লিখি। তবে লেখায় জোয়ার এলো যখন মৃন্ময় আর তুহিন আমাদের স্কুলে ভর্তি হলো এগার ক্লাসে। তিন কবির গভীর বন্ধুত্ত্ব হলো খুব সহজে। প্রথমে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর হতো পার্কে। পরে তা মৃণ্ময়ের পড়ার ঘরে গিয়ে উঠলো।

আমাদের মধ্যে তুহিন ছিলো বেশি অ্যাক্টিভ। লিটিল ম্যাগে ওর লেখা বেরোত। কি করে যেন সে দেখা করে ফেলেছিলো শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গাঙ্গুলী ও জয় গোস্বামীর মতো মহান কবিদের সাথে। জয় গোস্বামীকে সে জয়দা বলতো। মনে হতো তিনি যেন ওর প্রাণের বন্ধু। একদিন মৃণ্ময়ের একটা কবিতা তুহিনের বিশেষ ভালো লেগে গেলো। তুহিন চিৎকার করে পড়তে লাগলো কবিতাটা,

আমার অস্তিত্ত্ব আজও অনাবিষ্কৃত জানি তবু
শুধু তোমাকে ভুলে যাবার আগে,
আগুনের শিখার ভিতর, তুমিযে স্পর্শ করেছিলে…..

পড়া শেষ হতেই মৃন্ময় চেপে ধরলো, তোর তো অনেক চেনা জানা, দে না কবিতাটা “দেশ”-এ ছাপিয়ে।
– দেশে ছাপাতে গেলে তো জয়দা কে পড়াতে হবে!
– পড়া না, কে মানা করছে!
– ঠিক আছে, দেখছি। তুহিন বেরিয়ে গেলো।

তারপর আর কোন কথা নেই। দু-হপ্তা কাটার পর আমি বললাম, কিরে, মৃণ্ময়ের কবিতা ছাপার কিছু হলো?
আমতা আমতা করে তুহিন বলল, আসলে জয়দা বললেন ওরা একেবারে আনকোরা কবির লেখা ছাপেনা। অন্য কাগজে দু-চারটে লেখা ছাপলে তবেই গিয়ে লাভ হবে। তাই বলি কি তুই বরং কালুদার সাথে দেখা করে, ‘লবণহ্রদ বার্তা’ দিয়ে শুরু কর।
মৃন্ময় বেঁকে বসলো, আমার কবিতা ছাপবে না তাও ভালো কিন্তু আমি কালুদার সাথে দেখা করবোনা।
আমি কালুদা কে বিন্দু মাত্র চিনিনা। তাই বললাম, কেন কালুদা কি অপরাধ করেছে?সোময়েত্রী ভট্টাচার্য্য
– তুই জানিস না দীপু, কালুদা পার্টির জোরে কাগজ চালায়। পাতায় পাতায় মাল ছড়ায়। ঐ লোকটার কাগজে আমি লিখবো না।

নানান প্রশ্ন করে বুঝলাম, ‘লবণহ্রদ বার্তা’র হর্তা কর্তা বিধাতা সবই কালুদা। তিনি একাধারে গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, সমালোচক এবং কবিও বটে। মাঝে মাঝে নতুন কবিদের নিয়ে তিনি আসর বসান। এছাড়া কাজ বলতে করুনাময়ী আটো সমিতির দেখাশোনা। যাই হোক, বহু বোঝানোর পর মৃন্ময় রাজি হলো। তুহিন ব্যাবস্থা করলো। যাওয়ার আগে মৃন্ময় বলল, আমাকে তুই জোর করে নিয়ে যাচ্ছিস তো, দেখবি কি করে আসবো।

কবিতার আসরে কিন্তু কালুদাকে অটো সমিতির লোক বলে মনে হলো না। টুকটাক কথার পরে তিনি মোক্ষম প্রশ্নটা করলেন মৃণ্ময়কে, তুমি কবিতা কেন লেখো?
এ প্রশ্নের কি উত্তর হওয়া উচিত বুঝতে না পেরে আমরা সবাই চুপ করে রইলাম।
– না না, চুপ করে থাকলে চলবেনা। তোমাদের জানতে হবে তোমরা কবিতা কেন লেখো। এতো কিছু থাকতে কবিতা কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে তুমি কবি হবে কিভাবে?
মৃন্ময় একটা পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো, কালুদা আপনি কেন কবিতা লেখেন?
– কি জানার আগ্রহ, ঠিকই তো, সবাই সব জানবে এমন তো কোন কথা নেই। যাই হোক প্রশ্ন হলো, আমি কেন কবিতা লিখি? লিখি, কেননা আমার কবিতা পায়।
আমরা তিন জন এক সাথে বলে উঠলাম, মানে?
– হ্যাঁ, আমার কবিতা পায় – যেমন ঘুম পায়, ক্ষিদে পায়, হাগা পায়। আমার তেমন কবিতা পায়।
– আপনার কবিতা পায়!!! দেখলাম তুহিনও অবাক।
– আসলে সবার তো কবিতা পায় না। কারো কারো পায়। এই জন্যই জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’।

এই পর্যন্ত তাও ঠিক ছিলো। এর পর শুরু হলো কালুদার কবিতা পাঠ, একের পর এক। তুহিনের মুখ দেখে মনে হলো, সেও এতোটা আশা করিনি। মৃণ্ময়ের চোখ মুখ কান গরম। মনে পড়ছিল, সুকুমারের একুশে আইন। অত্যাচারটা চলল প্রায় এক ঘন্টা। এবার তুমি শোনাও, বলে তিনি মৃন্ময় দিকে তাকালেন।
মৃন্ময় বরাবর রকচটা ছেলে। ভাবছি কি উত্তর দেবে। এমন সময় সে একটু নড়ে বসলো। হালকা কাশির পর বলল, আমরা তো গল্প শুনতে এসেছিলাম, তাই সাথে কবিতা আনিনি। তবে আপনি বললে স্মৃতি থেকে চেষ্টা করতে পারি।
সম্মতি পেয়ে সে শুরু করলো, কবিতার নাম, সিঁড়ি।
কালুদা মনে হলো শ্রোতা হিসাবে ভালো। চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে কবিতা শোনার চেষ্টায় ছিলেন। মৃন্ময় অদ্ভুত কায়দায় শুরু করলো, প্রথম লাইন বলল তার পর বাকি গুলোও ………

আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছি
আমি সিঁড়ি দিয়ে নাম
আমি সিঁড়ি দিয়ে না
আমি সিঁড়ি দিয়ে
আমি সিঁড়ি
আমি সিঁ
আমি
আ আ আঃ আঃ আঃ আঃ আঃ আঃ আঃ আঃ

কালুদা উঠে দাঁড়ালেন এক ঝটকায়, হাতে তুলে নিলেন তার হাওয়াই চটিটি। আমরা তখন ছুটছি প্রাণপনে। কবিতার ভূত সেদিনই আমাদের ছেড়ে পালিয়েছিল। এর পর আর কোন দিন কোন সম্পাদক বা প্রকাশককে কবিতা শোনাই নি।

ছবি:সোময়েত্রী ভট্টাচার্য্য