ভ্যানগঘের কান-কথা

সময়টা এরকমই। শীতকাল। ১৮৮৮ সালের বড়দিনের আগে কোন এক শীতল সন্ধ্যাবেলা। জায়গাটা ফ্রান্সের ছোট্ট্ শহর আর্লস। খুবই স্বল্পপরিসর ঘরে কাঠের দেয়ালে ঝোলানো আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালেন পৃথিবী বিখ্যাত, আলোচিত চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ। দাড়ি কাটার ক্ষুরটা হাতে নিয়ে একটানে কেটে ফেললেন নিজের বাম কান। তারপর? তারপরের গল্প তো ইতিহাস।

la-mousme-seduta-van-gogh-analisi

গ্যাবরিয়েলা বারলাটিয়ার

ভ্যানগঘের কাটা কান এবং কেটে ফেলার ঘটনাটি সারা পৃথিবীতে আজও আলোচনার বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। চলছে নানান বিশ্লেষণ।
কিন্তু নিজের কান কেন কেটে ফেলেছিলেন শিল্পী? কেউ বলেন মদের নেশায় এক ধরণের পাগলামীর পরিণতি এই তীব্র এবং রক্তাক্ত ঘটনা। আবার অনেকে বলেন, প্রায় অবিচ্ছেদ্য বন্ধু আরেক আঁকিয়ে পল গঁগার সঙ্গে ঝগড়ার পরিণতিতে এই কান কাটা। এরকমও শোনা যায়, স্থানীয় এক পতিতার প্রেমে পড়ে ভ্যানগঘ তাকে উপহার দিয়েছিলেন নিজের কাটা কান।
এই আলোচিত ঘটনাটির বয়স এখন শতবর্ষ ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি শিল্পবোদ্ধা মার্টিন বেইলি তার নতুন বই ‘স্টুডিও অফ দ্য সাউথঃ ভ্যানগঘ ইন প্রভিন্স’-এ হাজির করেছেন এক নতুন ব্যাখ্যা। বেইলি বলছেন, ভ্যা্নগঘ ছোট ভাই থিও‘র চিঠি পেয়ে কান কেটেছিলেন। ওই চিঠিতে থিও ভাইকে তার বিয়ের খবর জানিয়েছিল। এরকম একটা আনন্দ-সংবাদ শুনে কান কেটে ফেললেন কেন ভ্যানগঘ? লেখক বলছেন, খবরটা তার জন্য এক ধরণের দুঃসংবাদ বয়ে এনেছিল। হয়তো তার মনে হয়েছিল ভাই বিয়ে করে ফেললে তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। পাশাপাশি তখন ভ্যানগঘকে তখন নিয়মিত টাকা পাঠিয়ে সচল রেখেছিল অনুজ। ভ্যানগঘ হয়তো ভেবেছিলেন, সেই অর্থ সাহায্যও বন্ধ হয়ে যাবে।

বেইলির এই বক্তব্য কেউ কেউ উড়িয়ে দিতে চাইলেও লেখক নিজের অবস্থানে অবিচল। তার মত হচ্ছে, কান কাটার ঘটনার পর নতুন বছরের জানুয়ারী মাসে শিল্পী মাসোহারা পেয়ে থিওকে চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে ২৩ ডিসেম্বর টাকা পাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। বেইলি‘র অনুমান ২৩ তারিখের চিঠিতেই ছোট ভাইয়ের এনগেজমেন্টের খবরটা পান ভ্যানগঘ। এই ঘটনার দুদিন আগে ভ্যানগঘের মা ছেলে থিও‘র কাছ থেকে একটি চিঠি পান। সেখানে থিও তাকে বলে, এনগেজমেন্টের খবরটা সে ভাইকে আগেই জানাতে চায়, যাতে অন্য কারো মুখ থেকে তাকে খবরটা পেতে না হয়। বেইলির অভিমত হচ্ছে, খবরটা ভ্যানগঘকে মানসিকভাবে যন্ত্রণা দিয়েছিল। ঠেলে দিয়েছিলগিভীর নিশ্চয়তার মাঝেও। হয়তো তার মনে হয়েছিল, বড় সং12345sdসার টানতে গিয়ে এবার থিও তাকে আর টাকা পাঠাতে পারবে না। তবে এই ঘটনার পেছনে খানিকটা ঈর্ষারও ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখক। তার কথা হচ্ছে, নিজের জীবনে ভালোবাসার অভাবের জায়গাটা হয়তো তখন পীড়া দিচ্ছিল শিল্পীকে। এক ধরণের শূণ্যতার অনুভূতি হয়তো পেয়ে বসেছিল তাকে।তবে কান কেটে রক্তাক্ত অংশটুকু কাপড়ে মুড়ে আর্ল শহরের পতিতা পল্লীর গ্যাবরিয়েলা বারলাটিয়ারকে উপহার দেয়ার অংশটাও বাদ দেননি বেইলি। তিনি বলছেন ১৩০ বছর আগেও এই ঘটনাটা নিয়ে স্থানীয় সংবাদপত্রে তোলপাড় হয়েছিল। পাঠক হুমড়ি খেয়ে খবরটি পাঠ করেছিল। গ্যাবরিয়েলা নামে মেয়েটি অবশ্য এই অভিনব উপহার পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
গবেষণা বলছে, গ্যাবরিয়েলা নামে এই মহিলার পরিচয় নিয়েও খানিকটা সংশয় আছে। বার্নাডেট মারফি নামে আরেকজন লেখক ‘ভ্যানগঘ এয়ারঃ দ্য ট্রু স্টোরি’ নামে আরেকটি বই রচনা করেন। সেখানে অবশ্য গ্যাবরিয়েলাকে পুরোপুরি ভাবে একজন পতিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বলা হচ্ছে এই নারী, ভ্যানগঘের পরিচিতও হতে পারেন। এই ঘটনার পর অবশ্য ভ্যানগঘকে পুলিশ নিয়ে যায় হাসপাতালে। সেখানে তার কাটা কানের জায়গার চিকিৎসা হয়।
সবই অনুমান নির্ভর তথ্য। গবেষকদের গবেষণার ফলাফল। কিন্তু তাতে কি আর ভ্যানগঘ নামে দুনিয়া কাঁপানো এই শিল্পীর সেই প্রতিক্রিয়ার আসল কারণ জানা সম্ভব? নয় বলেই ভ্যানগঘের ‘কাটা কান’ আজও এক রহস্যের পর্দার অন্তরালেই রয়ে গেছে।

 

নিধি রহমান
তথ্যসূত্র ও ছবি :সিএনএন অনলাইন