টেলিভিশনে সুলতানি আমল

Ishtiak (2)

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

বহির্বিশ্বে আজকাল বাংলাদেশের নাম বেশ সুনামের সঙ্গে উচ্চারিত হয় এবং সেটা এদেশের গুণী কিছু মানুষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের কারনেই।আবার বহির্বিশ্বে কখনও কখনও বাংলাদেশের নাম উপহাস, অবজ্ঞা আর দুর্নামের সঙ্গে উচ্চারিত হয় এবং সেটাও এদেশেরই কিছু মানুষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মকান্ডের কারনেই। বাংলাদেশের দুর্নাম কারা কখন বয়ে নিয়ে এসেছিলেন সেই লিস্ট করতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিছু ‘অতি গুণী’ মানুষের ‘অতি অস্বাভাবিক’ কর্মকান্ডের কারনে হয়ত আবারো বাইরের দেশের মানুষের কাছে আমাদের হাসির পাত্র হতে হবে। বলছিলাম একটা টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত তুর্কী সিরিয়ালের বাংলায় ডাবিং করে প্রচারের বিরুদ্ধে দেশের অতিশয় গণ্যমান্য শিল্পীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে। এটা কোন কথা! দেশে এতগুলো টিভি চ্যানেল, তার মধ্যে মাত্র একটা চ্যানেলে ঐ সিরিয়ালটা চলে। সেটা বন্ধ করার জন্য আল্টিমেটাম!চ্যানেলের অফিসের সামনে অবস্থান! হাসির খোরাকী যোগানোর জন্য আর কি বাকী থাকল? ইন্টারনেটের কল্যাণে আজকাল কোন কিছুই আর গোপন রাখা যায় না, কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বললে সেটারও স্ক্রিনশট বেরিয়ে যায়।আর এখন মনে হচ্ছে, এই আন্দোলনের তো ‘ভিডিও’ বের হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার হওয়ার জন্য আর বাইরের দেশের লোকদের হাসানোর জন্য। এই বিশ্বায়নের যুগে কেন আমরা ভিনদেশী টিভি সিরিয়াল দেখতে পারবোনা? এমনতো না যে দেশে প্রথমবারের মত কোন বিদেশী সিরিয়াল বাংলায় ডাবিং করে দেখানো হচ্ছে। ছোটবেলায় যখন বিটিভি ছিল আমাদের একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম, তখন কত কত বিদেশী সিরিয়াল, সিনেমা, কার্টুন আমরা দেখেছি। সেই সঙ্গে বাংলা নাটক তো ছিলই।তাই বলে নাটক থেকে কি কেউ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো?বরং তখন নাটক বা অন্যান্য প্রোগ্রামের প্রতি মানুষের আগ্রহ  অনেক বেশি ছিলো। সেও তো আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগের কথা বলছি। এত বছর আগে যদি নিজেদের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এতগুলো বিদেশী অনুষ্ঠান দেশের একমাত্র চ্যানেলে চলতে পারে, তাহলে আজ এতদিন পরে যখন দেশে চ্যানেলই প্রায় ২৫ এর উপরে চ্যানেল তখন কয়েকটা চ্যানেলে অল্প কিছু বিদেশী সিরিয়াল চললে কি দেশের শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে?নাকি নিজেদের খোঁড়া চোরাবালিতে এখন নিজেরাই আটকে গেছি আমরা?dipto_featured-ftpo

কিছু ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। মান-সম্মান তো এমনিও গেছে, ওমনিও গেছে, আর লজ্জা করে কি লাভ? দেশে ফিরে প্রথম যখন মিডিয়াতে কাজ শুরু করলাম তখন প্রথম কাজটা ছিল দেশের প্রথম সারির একজন নামকরা পরিচালকের সঙ্গে ।উনি আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে একটা নাটক বানালেন। পুরো নাটকটা ছিল স্ক্রিপ্ট ছাড়া। দ্বিতীয় যে কাজটা করলাম সেটাও একটা নাটক এবং সেখানেও দেখলাম পরিচালক নিজে ২ ঘন্টা লেট করে সেটে এসে নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখছেন। কেন আগে স্ক্রিপ্ট হয়নি জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারলাম আগে সময় পাননি।উত্তরায় একটা বাড়ি ভাড়া করে, এখানে সেখানে, রাস্তার পাশে টং দোকানে কিছু দৃশ্য শ্যুট করেই হয়ে গেল একটা নাটক।এতো গেল ফিকশন, এবার আসি নন-ফিকশনের কথায়। টিভি চ্যানেলগুলোর সারা বছর খেয়াল থাকেনা, শুধু ঈদ, পূজা এসব উৎসব কাছে আসলেই মনে পড়ে এখন মানুষ হাসাতে হবে।আর তখনই ডাক পড়ে আমার মত নগণ্য মানুষদের। কতবার, কত চ্যানেলে গেলাম কিন্তু কোথাও দেখলাম না আগে থেকে কোন প্ল্যান বা স্ক্রিপ্ট করা কিংবা আর কিছু না হোক অনন্ত যদি সপ্তাহ খানেক আগে থেকেও বলতো তাও হয়ত নিজে কিছু লেখার চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু না, ধর তক্তা… মার পেরেক! একদিন আগে ফোন আসবে, প্রস্তুতি নেয়ার কোন সময় নেই। এখন যদি টিভিতে চেহারা দেখানোর ইচ্ছা থাকে তাহলে করো, নাহলে অন্য কাউকে ডাকি! টাকা পয়সা নিয়ে তো কথাই বলা যাবেনা। যদিও মার্কেটে প্রচার হয়ে গেছে ইসতিয়াক ছেলেটা খুব বেয়াদব, বেশি অহংকার, টাকা ছাড়া কাজ করতে চায় না। দুই দিনের আর্টিস্ট, তাও আবার রিয়েলিটি শো থেকে উঠে আসা, তার আবার ভাব দেখ কত!অবশ্যই আমি ভাব ধরব, অবশ্যই আমি অহংকার করবো। কত কষ্ট করে, কত রাতদিন খেটে পরিশ্রম করে আমি একটা জায়গা তৈরি করেছি, সেটা কি বিনামূল্যে বিকানোর জন্য? আপনারা গাড়িতে চড়ে ঘোরেন আর আমি বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলব?আর যদি আমাকে দেয়ার মত টাকা না থাকে, নাটকের বাজেট যেটা হওয়া উচিৎ সেই পরিমান টাকা যদি না থাকে, আর্টিস্ট কাজ করে যদি টাকা না পায় তাহলে কিসের জন্য এত কষ্ট করা? আর এত টাকা যাচ্ছেই বা কোথায়?

আন্দোলন হচ্ছে কারন এখানে অনেক মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্ন জড়িত। যেখানে বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং অর্থের লেনদেন থাকবে সেটাকে অর্থনিতির ভাষায় বলা যায় একটা মার্কেট বা ইন্ডাস্ট্রি। সারা পৃথিবী জুড়ে মিডিয়া এখন সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেই হিসেবে যদি ধরে নেই বাংলাদেশেও এটাকে আমরা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে বিবেচনা করবো, তাহলে প্রথম প্রশ্ন এই ইন্ডাস্ট্রিতে কারা কাজ করবে?শিক্ষিত, রুচিবান, আধুনিক মন মানসিকতা সম্পন্ন লোকেরা, তাই তো? কিন্তু আমরা গত দশ বারো বছরে কি দেখেছি? ছোটবেলায় দেখতাম নাটকে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করা হতো। সেটাকে নষ্ট করে করেছে কারা? দেখা গেছে একজন পরিচালকের সঙ্গে অল্প কয়েক মাস কাজ করে নিজেই পরিচালক হয়ে গেছে অনেকে। কিভাবে এটা সম্ভব? লেখালেখির কাজকে বলা হয় সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ কাজ। সেই লেখালেখি এখন মুড়ি মুড়কির মত হয়ে গেছে, অল্প কিছু টাকা হলেই নাটকের স্ক্রিপ্ট পাওয়া যায়, অনেক পরিচালক আবার এত মেধাবী যে তাদের স্ক্রিপ্টও লাগেনা। এত মেধা আসলো কোথা থেকে এদের মধ্যে? শুধু বরিশাল আর নোয়াখালীর ভাষার উপর ভিত্তি করে বছরের পর বছর নাটকও চলছে।বাংলাদেশের মানুষকে এত বোকা ভাবলে হবে না, যে তারা এইসব নাটক দেখবে?নাটক ছাড়াও যেসব নন ফিকশন অনুষ্ঠান হয় সেগুলোরও একই অবস্থা।এত সহজ টিভিতে নাটক বানানো? এত সহজ অনুষ্ঠান বানানো? কারা কাজ করে এই সব চ্যানেলের প্রোডিউসার হিসেবে? কারা আজকাল নাটক বানায়? নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখে কারা?

kanuni-hurrem-coverফাঁকিবাজি করলে নিজের ফাঁকেই পড়তে হয়। গত এক যুগ ধরে যে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচার, স্বজনপ্রীতি করে নিজের নাটক বানানো এবং চালানো, টিভি চ্যানেলগুলোতে যোগ্য মেধাবী ছেলে মেয়েদের নিয়োগ না দিয়ে অশিক্ষিত আর নিজের শালা শালীদের চাকুরী দেয়া, যাদের ন্যুনতম শৈল্পিক বোধ নেই তাদেরকে মাথায় তুলে নেচে নাটক সিনেমার দেশসেরা পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, সব বিনোদন চ্যানেলে খবর আর টক্‌ শো প্রচার করে একই জিনিষের চর্বিত চর্বন মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা, মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের যন্ত্রনায় দর্শকের বিরক্তির চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম এসমস্ত কিছুরই প্রতিফলন আজকের দিনের ‘সুলতান সুলেমান’এর এত জনপ্রিয়তার কারন। আন্দোলন করে একে থামানো যাবেনা। যদি সৎ ইচ্ছা আর সত্যিকারের যোগ্যতা থাকে তাহলে উচিৎ হবে ভাল কনটেন্ট নিয়ে ভাবা এবং কাজ করা। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, গাজিপুরের জয়দেবপুরে ভাওয়াল রাজার বাড়ি আছে। এই ভাওয়াল সন্নাসী বা রাজাকে নিয়ে ভারতে ‘সন্নাসী রাজা’ নামে একটা সিনেমা নির্মিত হয়েছিল। যাতে রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। এই ভাওয়াল সন্নাসী দীর্ঘ বারো বছর পর ফিরে এসে যখন তার রাজত্ব ফিরে চান, তখন ব্রিটিশ আদালতে মামলা হয় এবং দীর্ঘদিন সেই মামলা চলে। রূপকথার গল্পকে হার মানাবে সেই কাহিনী। দেশের রাজার গল্প নিয়ে বিদেশে সিনেমা হয় আর বাংলাদেশে? জানামতে এখনও তেমন কিছু হয়নি। অথচ ভাওয়াল রাজার গল্প দেশে বিদেশে এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আপনারা যারা আন্দোলন করছেন, তারা কি জানেন সুলতান সুলেমানের যে গল্প, তার চেয়ে হাজার গুনে শক্তিশালী আমাদের এই ভাওয়াল রাজার ইতিহাস? আপনারা কি জানেন বাংলাদেশে এই রকম আরো কত রাজ পরিবারের গল্প গাঁথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে? আপনারা সেই সব নিয়ে পড়াশোনাও করেন না, গবেষণাও করেন না, আপনারা সেই গল্প নিয়ে নাটক সিনেমাও বানাতে পারেন না, আপনারা পারেন খালি হাসির খোরাকী দিতে। এই লেখাটা আমি রম্য-রচনা হিসেবেই লিখবো ভেবেছিলাম, কিন্তু না। পরে চিন্তা করে দেখলাম সেটা অতিমাত্রায় নিষ্ঠুরতা হয়ে যাবে। ছোটবেলা থেকে আপনাদের কাজ দেখেই তো বিনোদন পেয়েছি। বড়বেলায় এসে কোথায় আজ আপনাদের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে কাজ করব, উল্টো ‘আন্দোলন’ এর ভাষা এবং ‘গতিপথ’ দেখে এত দিনের জমানো শ্রদ্ধা কোথায় যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তুপের উপরে দাঁড়িয়ে অট্টালিকা বানাবার স্বপ্ন না দেখাই ভালো। সবার আগে উচিৎ হবে এতদিনের জমানো ময়লা আবর্জনা, জঞ্জাল, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা। নয়ত কে জানে কোন ঝড় এসে হয়ত সবাইকেই উড়িয়ে দেবে। তবে সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেলে একটাই সুবিধা, আবারো নতুন করে শুরু করা যায়।

ছবি: ইন্টারনেট