পারভীন আপা, সাঈদ ভাই ও কিছু সংলাপ

সাগর লোহানী

সাগর লোহানী

২৫ ডিসেম্বর, বড়দিন, যীশুর জন্মদিন। সন্ধ্যায় bloody merry র গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে সারাদিনের কথা ভাবছিলাম। ২৪ তারিখে পারভীন আপার মৃত্যু সংবাদ শুনে মনটাকে শান্ত করতে পারছিলাম না। সকালে ঘুম ভেঙ্গে সঞ্জীবকে খুব miss করছিলাম, ওর জন্মদিন, ও চলে গেছে তাও ৯ বছর পেরিয়ে গেছে। ওর জন্যে দুটো ফেসবুক পোষ্ট দিয়ে গেলাম পারভিন আপাকে শেষবারের মত দেখতে তার লালমাটিয়ার বাসায়। সেখান থেকে ভাগ্নির জন্মদিনে যেতে হলো কলাবাগানে। সেখান থেকে বের হয়ে নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়ালাম এখানে সেখানে। শেষে সেই কুলায় ফিরলাম, অনেকটা সময় ধরে শাওয়ারের নিচে রইলাম, নিজের কাছ থেকে কান্না লুকোবার চেষ্টা করলাম! জন্ম-মৃত্যু-জীবন ……….. এক অদ্ভুত ইকুয়েশন! এক কিম্ভূত নিঃসঙ্গতা ছেয়ে ফেলেছিল আমায়।

৩০/৩১ বছর আগে স্বরশ্রুতির কোন এক অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে সন্ধ্যায় গেলাম নাট্যকার, নাট্যজন সাঈদ আহমদের বাসায়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে এক সরকারী বাড়ীতে থাকেন কোন এক মন্ত্রনালয়ের সচিব সাঈদ ভাই। একটু ভয়ে ভয়েই দরজায় নক করেছিলাম কেননা সেই বয়সে একজন সিএসপির সামনে দাঁড়াবার সাহস ছিল কষ্টসাধ্য! তবে সাহসে ভর দেয়া সম্ভব হয়েছিল পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের কারনেই। আর একটা কারণ ছিল। আমার খুব আদরের এক ছোট বোন রিমা জামাল খান, সাইদ ভাইয়ের নাতনী, রিমার কাছে অনেক শুনেছি যে সাইদ আহমদের বড় ভাই নাজির আহমদ, যার অবদান এদেশের বেতার এবং চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অপরিসীম, তিনি আমার চাচা ফতেহ লোহানী ফজলে লোহানীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

বাড়ীর পরিচারক অনুমতি নিয়ে আমায় পৌঁছে দিল সাঈদ ভাইয়ের রিডিং রুমে। সেখানে অদ্ভুত সুন্দর এক পরিবেশে এক গ্লাস হুইস্কি হাতে দেখা হলো আমাদের সময়ের এক অসাধারণ সংস্কৃতিবান, জ্ঞানী, নাট্যবোদ্ধা সাঈদ আহমদকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে এলেন পারভীন আহমদ, সাথে ট্রলিতে চা আর অন্যকিছু খাবার। সাঈদ ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন কামাল লোহানীর ছেলের পরিচয়ে, তারপর পরই হয়তো আমার অভিব্যক্তি দেখে বললেন আমার সাংস্কৃতিক কাজের সংশ্লেষের কথা (যা উনি এপয়েন্টমেন্ট করবার সময় ফোনে জেনেছেন)। অনেকটা সময় ছিলাম সেদিন ওঁদের বাসায়। কথা বলেছি খুবই কম, শুনেছি অনেক। এক অদ্ভুত স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে সে সন্ধ্যা আমার মননে আজও।

আমার আর আমার স্ত্রীর অত্যন্ত প্রিয় মানুষদের মাঝে একজন ছিলেন পারভীন আপা। রিতার ক্লারা রোজারিও সাথে আপার সম্পর্কটা গড়ে ওঠে পেশাগত কারণে যখন রিতা Concern, Ideas International, Skill Development এ ছিল। সে সময়ে পারভীন আপা ঘনিষ্ঠভাবে দেশের হস্তশিল্প, নক্সীকাঁথা, নারী উদ্যোক্তা, ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করছেন। ১৯৯৭ এ আমার অফিস কাকরাইল থেকে লালমাটিয়ায় ১/১, সি ব্লকে নিয়ে এলাম। মেয়ের বয়স তখন ২ বছর, রিতা চাকরি করছে না। মেয়ের জন্মের পরে ৬ বছর চাকরি না করে মেয়েকে সময় দিয়েছে রিতা, অবশ্য আজও তাই দিচ্ছে। মা মেয়ে চলে আসে অফিসে দুপুরের পরে, বিকেলে কিছু বন্ধুবান্ধব আসে আড্ডা আর স্বাদ তেহারী ঘরেরnir_dec_5 তেহারী কিম্বা কাবাব চলে রাত পর্যন্ত। সে সময়ে সাঈদ ভাই অবসরে গেছেন এবং পারভীন আপাসহ সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হতেন। প্রায় দেখা হত আমার অফিসের গেটের সামনে। কথা হতো প্রায় দিনই গেটেই দাঁড়িয়ে।

২০০৪ এ যখন Cotton Bangladesh নামের আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনের সম্পাদকের দায়িত্ব নিলাম তখন আমার পেশাগত সম্পর্ক তৈরি হলো পারভীন আপার সাথে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ঐতিহ্যের সূত্রে। সখ্য বাড়লো দুজনের সাথেই। বিবিসিতে কাজ করার সুবাদেও গিয়েছি দুজনের কাছেই। সবচেয়ে বেশী সময় কাজ করেছি “ঢাকা আমার ঢাকা” নামের রাজধানীর ৪০০ বছর উপলক্ষ্যে ২০০৮ থেকে দুবছরের আয়োজনে। দিনের পর দিন সাঈদ ভাইয়ের সাথে আলোচনা হয়েছে ঢাকাইয়া ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইত্যাদি নিয়ে, কোথাও খেই হারিয়ে ফেললে পারভীন আপা খেই ধরিয়ে দিতেন সাঈদ ভাইয়ের। যেন তিনিও ঢাকাইয়া!

পারভীন আপার পরিচিতজনের মধ্যে ক’জন জানেন যে তিনি একজন পাঞ্জাবী? খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া কেউ জানবার কথাই নয় কেননা কথাবার্তা চালচলন বেশভূষায় তা বোঝার কোন উপায় ছিল না। পাঞ্জাবের মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন ভারত বিভাগের আগে ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দে। দেশভাগ হলো, রাতারাতি ভারতীয় থেকে হলেন পাকিস্তানী, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে পেশা জীবন শুরু করে কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করলেন বাঙালী সাঈদ আহমদকে। চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পর হয়ে গেলেন বাংলাদেশের নাগরিক। এক জীবনে এমন বর্ণাঢ্য নাগরিক জীবন ক’জনের হয়! একজন খাস পাঞ্জাবী হয়ে তিনি নিজেকে গুছিয়ে নিলেন বাঙালীত্বের আভরণে। শুধু কি তাই! লেগে-পড়লেন বাঙালী নারীর জীবনমান আর এদেশের অসামান্য কৃষ্টি আর ঐতিহ্যের উন্নয়নে। তাই আজ যা কিছু নিয়ে আমাদের গর্ব, মসলিন, জামদানী, নক্সিকাঁথা, এমব্রয়ডারী, ক্রুসির কাজ, পাটের শিকা, ইত্যাদির সংরক্ষণ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, পেশাগত উন্নয়ন, বিপনন, প্রতিটা ক্ষেত্রে পারভীন আহমদের ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। ১৯৭৪ সালে “বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমবায় সমিতি” “কারিকা” প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ন্যাশনাল ক্র্যাফট কাউন্সিল, সোনারগাঁও লোকশিল্প ও কারু ফাউন্ডেশন, ফেমকম, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ কমিউনিটি এডুকেশন (BACE), স্কিল ডেভেলপমেন্ট, এমন অসংখ্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকে তিনি এদেশ আর এদেশের মানুষকেই সহায়তা দিয়েছেন। বাংলাদেশের নারীদের সম্ভাবনা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, গ্রামীণ নারী শিক্ষা, নারী ও গ্রামীণ অর্থনীতি এবং হস্তশিল্প বিষয়ে অসংখ্য উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্র রেখে গেছেন যা আমাদের জন্যে হয়ে রইলো ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টেশন। বাংলাদেশের নকশি কাঁথা নিয়ে তিনি একটি উন্নতমানের প্রকাশনাও রেখে গেছেন। World Craft Council তাঁকে Honorary Life Member করে সম্মানিত করেছে অথচ কি দুর্ভাগ্য যে রাষ্ট্র বা জাতির উন্নয়নে তিনি তাঁর জীবনের সবটুকু দিলেন সেই রাষ্ট্র তাঁকে ন্যূনতম সম্মান দিতে ব্যর্থ হলো।

২০০৭ এ যখন দ্বিতীয়বারের মত ৪৪টা দেশের অংশগ্রহণে “Bangladesh Cotton & Textile Convention” আয়োজন করেছিলাম তখন পারভীন আপা Traditional Textile of Bangladesh শিরোনামে অত্যন্ত তথ্যবহুল একটা বিশাল লেখা দিয়েছিলেন আমার অনুরোধে। জানিনা বাংলার টেক্সটাইল ঐতিহ্যের উপরে এর চেয়ে ভাল কোন লেখা আছে কিনা।

কিছুদিন আগে সাঈদ ভাই চলে গেলেন এখন গেলেন পারভীন আপা, প্রকৃত অর্থে এই দুটি মৃত্যুতেই বাংলাদেশ হারিয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ দুজন মানুষকে, অপূরণীয় এক শূন্যস্থান রেখে গেলেন তাঁরা। আমি আর রিতা হারালাম আমাদের খুব প্রিয় মানুষ।

ছবি:  সাগর লোহানী (সৌজন্যে)