সিন্ধুর টিপ আন্দামানে

রাজা ভট্টাচার্য

রাজা ভট্টাচার্য

সব বেড়ালের ভাগ্যেই একদিন না একদিন শিকে ছেঁড়ে। এই মাস্টারেরও প্লেনে ওঠা হল আন্দামান যাওয়ার চক্করে। আকাশ থেকে দেখা হল সুন্দরবনের রিলিফ ম্যাপ, অনন্ত সমুদ্দুরের নীল, তারপর ‘সিন্ধুর টিপ’ আন্দামান। নেমেই শুরু হল দৌড় – এই বিচ থেকে ওই বিচ ; রস আইল্যান্ড থেকে হ্যাভলক ; কোরাল রিফ থেকে বাতিঘর। ছুট আর ছুট। চারদিনের দিন সন্ধ্যেয় নীল আইল্যান্ড-এ পৌঁছে তাই আমার এক্সপ্রেশন ‘বাপ রে!’ থেকে ‘আহা!’-তে পৌছে গেল মুহূর্তে।
পথের দু’পাশে ঘন আম-জাম-কাঁঠালের বন। ঘাসজমি। ধানক্ষেত। বনের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে মাটি আর খড় দিয়ে তোলা কুঁড়েঘর – যেমন ছেলে আঁকে তার খাতায়। গরু আর লাঙল নিয়ে চাষের কাজ সেরে ঘরে ফিরছে চাষী, উচ্চকণ্ঠে বাংলায় গালি দিচ্ছে সে ধানের গোলায় মুখ-দিতে-যাওয়া গরু দু’টোকে। হাঁস তাড়িয়ে নিয়ে গেল কোনো এক গাঁয়ের বধূ। সন্ধ্যা হয়…আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে….
বাংলা থেকে এত দূরে আর-এক টুকরো বাংলা! শুধু, ভেসে-আসা সমুদ্রগর্জন-টুকু মনে করিয়ে দিচ্ছে – এটা বাংলা নয়!
রাস্তাতেই চা নিয়ে এল কেয়ারটেকার রাজু। আবেগের বশে বলে ফেললাম -“বুঝলে ভাই, পারলে থেকেই যেতাম এখানে, একটা বাড়ি করে।”
অকাতরে সে বলল -“কিনে ফেলুন স্যার জমি। এক কোটি কুড়ি লাখ টাকা করে বিঘে যাচ্ছে তো! বিঘের কম তো বিক্রি হয় না স্যার!”
হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। তারপর তুমুল জিজ্ঞাসাবাদ – এবং জানা গেল – এটাই এখন এখানকার রেট যাচ্ছে। হ্যাভলক আইল্যান্ডের জমি শেষ। রিসর্ট-ব্যবসায়ীদের নতুন টার্গেট এখন নীল আইল্যান্ড। জমি তাই সোনা হয়ে গেছে হঠাৎ। সেই সাতচল্লিশ সালে, উদ্বাস্তু বাঙালিদের ঠাঁই হয়েছিল এখানে। তাঁরা পেয়েছিলেন পাঁচ বিঘে করে জমি। তার মানে – এখন সেই সর্বহারা মানুষগুলো ছ’কোটি টাকার উপর বসে আছেন! ছ য় কো টি টাinside-chobi_dec_5 কা !! বলে কি !!! তাহলে সব্বাই – প্রত্যেকে – টপাটপ জমি বিক্রি করে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে না কেন? আমার স্বাভাবিক এবং নাগরিক প্রশ্নের উত্তরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেল রাজু।
পরদিন ভোরে সীতাপুর বিচ থেকে অলৌকিক সূর্যোদয় দেখে হেঁটে ফিরছি। হোটেলের ঠিক আগের বাড়িটায় একটা দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। ইংরিজি L আকারের মাটির বাড়ি একটা। নিকোনো উঠোন তকতক করছে। একটা বকফুল গাছের নিচে মাটিতে মাদুর পেতে বসে চা খাচ্ছেন এক বৃদ্ধ। চারপাশে তাঁর হামাগুড়ি দিচ্ছে রোদ্দুরের ছানা। পাশেই গোলা। পিছনে উঁকি দিচ্ছে সোনালি ধানক্ষেতের লাবণ্য। এসব ব্যাপারে আমি দ্বিধাহীন। ঢুকে পড়লাম পায়ে পায়ে। বসলাম বুড়োর সামনে, মাটিতে। আলাপ হল। নিত্যানন্দ দাস। বয়েস আশি ছাড়িয়েছে। এখনও নিজে হাতে চাষ করেন। এক ছেলে গাড়ি চালায় ; অন্যজন হোটেলে কাজ করে। শুধোলাম -“এই জমিটুকুর দাম যে ছ’কোটি টাকা – জানেন?” এক গাল হেসে মাথা নাড়লেন -“জানি বাবা। খুব জানি। দু’বেলা আইস্যা জানাইয়া যাইতেয়াসে লোকজন।” তাহলে যে বড় চাষ করছেন? লোভ হয় না?
এইবার তাঁর চোখ চলে গেল সুদূরে। বললেন -“দ্যাশে থাকতেও চাষই করতাম। আমাগো পিতৃপুরুষের কামই এইয়া – জমি-চষা। তারপর পার্টিশন হইল। এহেনে আইয়া ফের জমি পাইলাম। বুনা, বেতালা জমি। ফসল হয় না। কেরমে কেরমে হেই জমি বশে আইল। ধান হইল। আম-কাঁঠাল হইল। আইজ দ্যাহো – সোনা ফলতেয়াসে জানি।”
ভারি মায়াময় চোখে খানিক সেই জমির দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন -“পোলারা কয় – বেইচ্যা দাও। বড়লোক হইয়া যামু। আমি কই – দ্যাখলাম তো একবার, জমি হারাইলে লাগে ক্যামন। এক জীবনে কয়বার উদ্বাস্তু হয় মাইনষে? কও দেহি বাবা! অহন যেই কয়ডা দিন আছি, বাঁইচ্যা আছি – এহেনেই থাকুম। এই যে বকফুল গাছ – দিদি লাগাইসিল নিজে হাতে। যতদিন বাঁইচ্যা আছিল – আইতো ফুল কুড়াইতে। অহন সেই গাছ – সেই ফুল কি বেইচ্যা খামু – কও দেহি!”
স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম আমি। সব প্রশ্নের উত্তর কি আমি জানি – মূর্খ মানুষ! হ্যাঁ, আজ ঠাকুমা থাকলে ঠিক বলে উঠত সাদা ছাঁটা চুল আর সাদা থান নাড়িয়ে -“হক কথা কইসেন, কত্তা!”
ঠিক তখন লাল পাড় শাড়ি পরে, দোক্তার গন্ধ মাখা হাসি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অনেকটা ঠাকুমার মতোই দেখতে এক বৃদ্ধা। হাতে তাঁর কলাই-করা ডিশ। সামনে রেখে বললেন – “বকফুল ভাজা খাও তো বাবা? চা দিয়া জানি অমর্ত। খাও।”

দন্তহীন মুখে একগাল হেসে নিত্যানন্দ দাস বললেন -“খাও বাবা। বাড়ির ফসল। নিজের জমির ফসল…”

ছবি: ইন্টারনেট