মানিপ্ল্যান্ট,আমি ও হিংসুটে ডাইনী

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়িরমতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটাউজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুনকাটাঘুড়িবিভাগে।

কনকচাঁপা

 বাচ্চা বয়স থেকেই আমি গাছ খুব ভালবাসি। শান্তিবাগ বাসায় আমার শোয়ার ঘরের জানালার পাশে একটি সবুজ,অপূর্ব সবুজ বোতলে কিছু মানিপ্ল্যান্ট গাছ ছিল।রোজ ঘুমানোর আগে আমি দেখতাম চকচকে নতুন পাতা।একটি বেড়ে ওঠা লতার আগা,আমি ওদের সঙ্গে কথা বলতাম।বলতাম লতা,তোমার বেড়ে ওঠা আমি দেখতে চাই।নিদেনপক্ষে নড়াচড়া। লতা তো আমাকে ধরা দেয়না! kataghuri_dec_5আমি নাছোড়বান্দা হয়ে ঘুমানোর আগে তাকিয়ে থাকি তাকিয়ে থাকি।একসময় চকচকে লতার আলোকচক্র আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।ওর কিলবিলে শিকড় আমাকে ভয় দেখায়।স্বপ্ন দেখি শেকড় গুলো আমাকে অক্টোপাস হয়ে জড়িয়ে নিচ্ছে।কান্না ও চিৎকার এ ঘুম ভাঙ্গে।দুঃস্বপ্ন ভাঙ্গে ।সব দোষ গিয়ে ওই সবুজ বোতলের ওপর পড়ে।আমি দুঃখ পাই।কারন ওই সবুজাভ বোতল প্রায়শঃই আমার সমুখসমুদ্র হয়ে যায়। আম্মা আব্বাকে এই সুযোগে নালিশ করেন, এই মেয়েকে নিয়ে কপালে দুঃখ আছে।আব্বা কপোট রাগে ফেটে পড়ে বলেন, তাহলে দাও মেয়ে সহ বোতল ফেলে দিয়ে আসি।আমি গুমরে গুমরে কাঁদি।হাহাহা।একদিন এক হিংসুটে বান্ধবী বলে তোর এই মানিপ্ল্যান্ট মিথ্যা।কেন? সে বলে যাদের মানিপ্ল্যান্ট থাকে তারা বড়লোক হয়।তোদের তো টাকাই নাই।এই গাছ মিথ্যা।কথাটা আমাকে খুব আঘাত দিলো। আমি জানালার কাছে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লাম।আমাদের টাকা নাই এজন্য নয়।টাকা থাকলে কি হত আর না থাকায় কি হচ্ছে এই বোধ আমার তখনও ছিলনা,এখনো হয়নি।আমি কাঁদছিলাম গাছের মিথ্যাচার এ।আম্মা পুরো ব্যাপার প্রত্যক্ষ করে বোতল রেখে গাছ ফেলে দিলেন।আমি কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে গেলাম।রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি।চিৎকার করে উঠি রোজ রোজ।জানালা ধরে বসে থাকি।বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বেরুনোর পর ছুটি।আমি মাঠে খেলতে যাইনা।আব্বা এবার সত্যি রেগে গেলেন।বললেন তোমরা সবাই মিলে আমার এই মেয়েটার সঙ্গে এমন করলে আমি মেয়েটাকে নিয়ে একদিন নিরুদ্দেশ হবো।আমি আরো ভেঙ্গে পড়ি।আমা গলায় তাবিজ ওঠে।একদিন আম্মা আবার কোথা থেকে একগুচ্ছ মানিপ্ল্যান্ট এনে বোতলে গুঁজে পানি সহ আমার জানালায় রেখে দেন।আমি আবার তাদের দিকে তাকাই।একটি দুটি কচি কিশলয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে।আমি আবার হাসিখুশী হয়ে যাই।ধীরেসুস্থে মনের ক্ষত সেরে ওঠে। মানুষের মনে দুঃখ বেশীদিন স্থায়ী হয়না।কোন কিছু হারাবার বেদনা বা জ্বালা যন্ত্রণা আল্লাহ একভাবে না একভাবে সারিয়ে তোলেনই।দিন আসে রাত হয়,আবার রাতের অন্ধকার সরিয়ে সূর্য ওঠে।আবার জীবন,ভাবনা,প্রকৃতি আলোকিত হয়ে ওঠে।কিন্তু মানুষের কুলষিত মন এতো সহজে ভালো হবার না।আমার গলায় যে তাবিজ উঠেছিল তাতে দোয়া কালামই লেখা ছিল বিধায় আম্মা সেটা আর খোলেন নি।লম্বা ছুটির পর যখন স্কুলে গেলাম তখন ওই হিংসুট মেয়েটা আমার পাশে এসে বসলো। ও আমার এই মানিপ্ল্যান্ট জনিত বিরহ এবং অসুস্থতা সব জানে।আমি একটু লজ্জিত ও রাগান্বিত। যদিও বার্ষিক পরীক্ষা তে প্রথম হয়েছি কিন্তু ও পাশে বসাতে আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল।এবং যা ভাবছিলাম তারই পুনরাবৃত্তি হল! ও মোক্ষম সময় বুঝে আমাকে চোখে চোখ রেখে বললো — মানিপ্ল্যান্টের বদলে তাবিজ? মানিপ্ল্যান্ট দিয়ে বড়লোক হইতে না পারলে তাবিজে কাজ হবেনা!

কাভার ছবি: ইন্টারনেট