ভুত…

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

জয়দীপ রায়

জয়দীপ রায়

এ্যারোব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে, ঠিক ফ্লাইটে ওঠার মুখে, একদম তখনই হল বিষ্ফোরণটা। দড়াম করে। খেয়াল করিনি আশপাশে আইসিস বা আইরিশ, কোন জঙ্গিই ছিল কিনা। শুধু খেয়াল করলাম আরও অনেকের সঙ্গে আমিও উড়ে যাচ্ছি। একটু একটু করে মরে যাচ্ছি। পাশে শানু। চেঁচিয়ে বললাম, শানু..।
আস্তে আস্তে করে বেঁচে থাকার জগৎ থেকে মরে যাবার জগতে ঢুকে যাচ্ছি। এক চেতনা থেকে বেরিয়ে আর এক চেতনায়। আর ভাবছি, এতদিন যা ভেবে এসেছি, ঠিক কিনা। মরার পরেও বাঁচা থাকে কিনা। প্রবীর ঘোষের বইগুলোর কথা ভাবছি। ভাবছি, ইতালিয়া নাইন্টিতে মারাদোনার জাদু দেখে রাত তিনটেয় তেঁতুলবেড়ের কারখানার ঘাটের উপরের বাঁশতলা দিয়ে আসার সময় যে ভয়হীনভাবে হেঁটে এসেছিলাম, সেটা জাস্টিফায়েড কিনা। একটু ভয়ও কি পাওয়া উচিত ছিলনা সেদিন! গাছগুলো তো নড়ছিল একা একা। আসলে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু দেখাইনি। সেদিনকে ভয় পাওয়াটা দেখালে আজ এভাবে বেইজ্জত হতে হত না।
হ্যাঁ, বেইজ্জতই তো বটে। এই যে আমার আশপাশে এখন টুপুমামা, ভেলো, ছোটকাকা এসে খ্যাক খ্যাক করে গা জ্বালানো হাসছে, সে সুযোগই দিতাম না। ভেলো আবার জিভ ভেঙিয়ে বলে উঠলো, সারাজীবন ধরে আমাকে ভুলভাল বই পড়িয়ে গেছিস, আর অলৌকিকে বিশ্বাস করতে বারণ করে গেছিস, এবার দ্যাখ ক্যামন লাগে! ওই দ্যাখ নন্টেমামা, তুই যাকে ডুবসাঁতার স্পেশালিষ্ট মাতাল কিশোরকে ডেকে, ইছামতির জলের তলা থেকে তুলে আনলি, একদম ফ্যাকাশে সাদা হয়ে যাবার পর, ওই দ্যাখ আসছে।
দেখি সত্যি সত্যিই, নন্টেমামা হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে, হাতে একটা লাটাই আর সুতোয় না মাখানো ছোটবেলার শেষ মাঞ্জাটা নিয়ে। ওই তো পিছনে পিছনে অজয়ের বাবা ছুটে আসছে। অজয়দের বাড়ির অর্জুন গাছের ছালই তো চুরি করে চেঁছে আনা হত, মাঞ্জা আরও ধারালো করার জন্যে। সব্বোনাশ, মান সম্মান সব শেষ। মেয়েটাকেও ভুলভাল শিখিয়ে আসলাম। কোনওদিন ভূগোল বা অঙ্ক না শিখিয়ে, এতদিন ধরে ভুত, প্রেত, গৌরের কবচ শুধুমাত্র শীর্ষেন্দুর বইতে পাওয়া যায় বলে আসলাম যে!
আজকেই দিদিমা বলছিল, মনা, আমি মরে যাবার পর একটা কাজই করবি, মোমবাতি জ্বেলে ঘর বন্ধ করে আমাকে ডাকবি। আমি ঠিক আসবো, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দের সঙ্গে দেখা হয়ে কি কথা হয়েছে বলে যাব। আমি আর শকুন্তলা খুব হাসছিলাম। মজা লাগছিল। আর ফেসবুকীয় জ্ঞান স্ক্রল করতে করতে ভাবছিলাম, বয়স হয়ে এসেছে তো, বুড়ি ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছে। foboli
মরার পরে বুঝতে পারলাম, মানুষ মরার পরের কোন কিছুই আমরা জানি না। মাম্মা, তুই যদি কখনো আমার এই লেখাটা পড়তে পারিস, জানবি সেদিন সেভক রোডে আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে স্কুটি চালিয়ে পাহাড়ের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলাম যখন, আমাদের পাশে পাশে টুপুদাদুও পালসার নিয়ে যাচ্ছিল। আর ডি বর্মনের গান করতে করতে। আমরা টের পাইনি। তুই বড় হলেও কিন্তু ভুলে যাবি না, তোর চারপাশে সব মরে যাওয়া ভাল ভাল লোকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোর দিকে খেয়াল রাখছে।
হঠাৎ দেখি ছোটকাকা। দড়িতে সত্যি সত্যি ঝুলে পড়ার আগে পর্যন্ত রোজ ভাবতাম, ভয় দেখায়। ব্ল্যাকমেল করে নেশা করার টাকা নেবে বুঝি। ছোটকাকা হাতে করে একটা আকাইয়ের ভিসিআর নিয়ে রানওয়ের পরে টেবিলে বসানো গাব্দা কালার টিভিতে লাইন জুড়ছে। দূর থেকে ড্যান্স ড্যান্সের ভিডিও ক্যাসেটটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সারা ছোটবেলা ছোটকাকা আমাদের ঝুলিয়ে গেছে মিঠুনের সিনেমাটা দেখাবে বলে। আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে ডাকলো, শিগগির বাবাই, টুপু, মোহনলাল সবাইকে ডেকে নিয়ে আয়। এখনই শো শুরু করে দেব।
আরে, মোহনদা তো এখনো পৌঁছয়নি। সবে জ্যাঠা মারা গেছে। টাকাপয়সার হদিস সদ্য পেয়েছে। কিছুদিন আরাম করতে দাও ওকে। তুমি চালাও তো। এই তো আমি, বাবাই, টুপু, নন্টে আছি তো। ছোটকাকা ভিসিআর এর ইজেক্ট বাটন চেপে দিল। সবাই না আসলে মিঠুন নাচবে না। মোহনদাকে স্পেশাল ভালবাসতো আমাদের ছোটবেলার হীরো ছোটকাকা।
পাশ দিয়ে পল্লব বেরিয়ে গেল। চিনতে পারেনি। পল্লব আরাবল্লী পাহাড়ের এক লেকের ধারের রিজর্ট ম্যানেজার ছিল। গেস্ট অ্যাটেন্ড করতে করতে মালিক প্রিন্স আসার পরেই ডিউটি ছেড়ে যায়। প্রিন্সকে বলে যায়, আই নীড অ্যা লং রেস্ট। বলে, দোতলায় নিজের ঘরে গিয়ে ঝুলে পড়ে।
এই পল্লব, পল্লব। ডাক শুনে পল্লব ঠিক পিছন ফেরে। চিনতে পেরেছে। রাত বারোটার সময় বিশাখাপতনম্ ষ্টেশনে আমার জন্যে একবার নিজের হাতে ড্র্যাগন আলু, তন্দুর চিকেন, বিরিয়ানি বানিয়ে এনেছিল। আমি চেন্নাই মেলে করে ফিরছিলাম, একা। কি সাংঘাতিক সুস্বাদু সে খাবার। তারপরে আর কখনো ড্র্যাগন আলু খাইনি। জয়! বলে এসে জড়িয়ে ধরলো। আর আমি ড্র্যাগন আলুর গন্ধ পেলাম। ভুতেরা তাহলে শুধু মাছের গন্ধই পায় না।
সারাজীবন শুধু ভুতেদের নামে ভুলভালই শুনে আসলাম। অথবা কিছুই শুনলাম না। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সঞ্জয়দা বা প্রতি মঙ্গলবারে কালির উপোসে থাকা দেবদাস, কেউই ভুতপ্রেত সম্পর্কে কিস্যু জানে না। বেঁচে থেকে অত ভাল জানা যায় না। বেঁচে থেকেও যেটুকু যা জানে, জানে ওই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শীর্ষেন্দুর বই পড়বি, মাম্মা। ফেলুদা আর কাকাবাবু, সব ছাইপাঁশ। ভুত নিয়ে ওদের কোন কান্ডজ্ঞানই নেই। একমাত্র শীর্ষন্দু পড়লেই তুই জানতে পারবি, অমাবস্যার রাতে পলতার বাঁওড়ের ঠি ক কোনখানটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াই ফাইটা অন করলে বাবা আবার টুক করে হটস্পটে তোকে কানেক্ট করে নেবে।

ছবি: ইন্টারনেট