এই আনন্দ এই বিষাদে

সময়। সময়ের মস্ত বড় একটা ভালো গুন হলো তা কেটে যায়। না কাটলে তো আবর্জনার মতো জমে থাকতো। কিন্তু সময় পার হয়ে যায়, দুঃসময় থেকে সুসময়ে যায়। পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোরে, সূর্য ডোবে, অন্ধকার আসে। আবার সূর্য ফিরে আসে।আর আমরা ভাবি নতুন সূর্য ওঠে। নতুন দিন আসে, নতুন সূর্য আসে। এই পৃথিবীতে নানা ধরণের ধারণার ভেলায় ভেসে তার অধিবাসীরা বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকে, নতুন আশায় ঘর বাঁধে, নতুন করে তাকায় জীবনের দিকে।

awesome-clocks-wallpaper-computer-816

সময়ের ভালো গুন সে কেটে যায়

একটা বছর ফুরিয়ে যাচ্ছে তার সব ক্ষত নিয়ে, কষ্ট নিয়ে, আনন্দ নিয়ে, ভালো স্মৃতি নিয়ে, কষ্টের স্মৃতি নিয়ে। একটা বছর মানে তো বেশ অনেকটা সময়। দিন আর মাসের হিসেবে ঘেরাও কিছুটা সময়। সময় তো আসলে ধারাবাহিক একটা প্রক্রিয়া। তার ওপর ছুরি কাঁচি চালিয়ে ভাগ করি আমরা মানুষেরা।বিদায় জানাই পুরনো বছরকে, স্বাগত জানাই নতুন বছরকে।
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বর্ষ বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানো মানুষের আবেগ ও হৃদয়বোধেরই একটি অন্তর্নিহিত প্রতিফলন। ইতিহাস সচেতন পাঠকমাত্রেরই জানা, প্রাচীন রোমের পৌরাণিক দেবতা জেনাসের নামানুসারে নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারির নামকরণ। দেবতা জেনাসের দুটি মুখ।

maxresdefault-1

এই আনন্দ

একটি সূর্য অপরটি চন্দ্র। সূর্য উত্তাপ বিকিরণ করে জীবন সঞ্চালন ঘটায়। চন্দ্র তার মধুর আলোয় জীবনের পরিপুষ্টি আনে। আবার জেনাসের একটি মুখ ভবিষ্যতের প্রতীক, অন্যটি অতীতের। তিনি পার্থিব মানুষের জীবন দরজার প্রহরী।

dancers-and-flutists

প্রাচীন মিশরে নববর্ষ

তাই দৃষ্টি প্রসারিত করে আছেন আমাদের অতীত থেকে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। অতীত থেকে অনাগতের যাত্রাপথে যে চলমান প্রবাহমানতা, জেনাস তার নিয়ামক এবং নিয়ন্ত্রক। তিনি স্বস্তি, শান্তি আর কল্যাণের দেবতা। প্রাচীন রোমানরা একে ভক্তিভরে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করতেন বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্ঠানে। ব্যবসা–বাণিজ্য শুরুর আগে ও পরে, শিশু জন্মের মুহূর্তে। কৃষিকাজ আরম্ভে কিংবা শস্য সংগ্রহ শেষে সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বহু প্রাচীনকালেই জীবন সম্বন্ধে মননশীল মানুষের মনে সুকুমার ভাবনার যে জাগরণ ভালোবাসা ও আবেগের সংমিশ্রণে ঘটেছিল, মানুষ তাকে বর্ষ বিদায়ের বেদনাময় অনুষ্ঠানে যেমন রূপায়িত করতে চেয়েছে, তেমনি জীবনের শুভ কামনায় জগতের অনিবার্য নিয়মে নতুনকেও অভিনন্দিত করতে সে ভোলেনি। ইতিহাসবিদেরা জানিয়েছেন, চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার বেবিলিয়নরা ‘আকিতু’ নামে নববর্ষ অনুষ্ঠান পালন করে সুখী, শান্তিপূর্ণ, শুভময় ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা জানাতেন দেবতার দুয়ারে।

dhaka

সময়কে কে চিনতে পারে

এবার বিদায় জানাতে চলেছি ২০১৬ সালকে। মানুষ নতুনকে ভালোবাসে।পুরনো সময়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চায় সে।ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনটি অতিবাহিত হলেই আমাদের ধারণা অনুযায়ী নতুন একটি বছরে প্রবেশ করবে পৃথিবীর মানুষ। সেই নতুন বছর ২০১৭ কে স্বাগত জানানোর জন্য চলছে নানা আয়োজন। গোটা পৃথিবী জুড়ে ভীষণ বর্ণাঢ্য এই আয়োজন। আলোকসজ্জা, আতশবাজি, আনন্দ মিছিল, নাচ, গান…আরো কত কী।চারদিকে কেমন একটা উৎসবের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
এক বছরে কত কী ঘটে মানুষের জীবনে। রাষ্ট্রযন্ত্রের সিংহাসনে রাজা যায় রাজা  আসে, যুদ্ধ হয়, সংঘাত ঘটে, প্রাণ যায় মানুষের। রাজনীতি আমাদের জীবনে সবচাইতে বেশী আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। প্রেম সবচাইতে কম। মানুষের জীবন কখনো হতাশায় ছেয়ে যায়, আবার কখনো আনন্দে জীবনপাত্র ভরে ওঠে কানায় কানায়। জীবনের এই তো বৈপরীত্ব। আর এই দোলাচল না থাকলে বোধ হয় জীবনকে এতো সুন্দর, এতো মোহময় মনে হতো না। বছরজুড়ে লেখক বই লেখেন, পাঠক পড়ে, সিনেমা তৈরী হয় আবার ফ্লপও করে। কারও জীবনে প্রেম আসে, আবার কারো জীবন থেকে বিদায় নেয় এই ‘গোলাপ-মুহূর্ত’।
২০১৬ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে সবচাইতে আলোচিত ঘটনা ছিল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় আমেরিকা ছাড়াও পৃথিবীর দেশে দেশে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের এই ঘটনার বাইরে আরেকটি বিষয় পৃথিবীর মানুষকে শঙ্কিত করেছে, বেদনায় জড়িয়েছে। সেটি হচ্ছে দেশে দেশে ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠীর গুপ্ত হামলা। এই হামলায় প্রাণ গেছে বহু মানুষের। বিতর্কিত হয়েছে ধর্ম।
trumpসেব ঘটনার সূত্র ধরে পৃথিবীতে গত এক বছর ধরে আলোচিত হয়েছে আইএস জঙ্গীদের নাম। আলোচিত হয়েছে সিরিয়া আর ইরাকের গৃহযুদ্ধ।
এই জঙ্গীবাদের আগুন থেকে রক্ষা পায়নি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও। খোদ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষয়ী জঙ্গী হামলায় মারা গেছেন বহু বিদেশী নাগরিক এবং স্বদেশী। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ঘাতক-দালালদের ফাঁসিও একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন।
পাশাপাশি ক্রিকেটের মাঠে বাংলাদেশের বিশাল অর্জন রয়েছে। ক্রিকেট গোটা পৃথিবীতে বাংলাদেশের পতাকাকে আরও উঁচুতে বেঁধেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
২০১৬ সালে আমাদের বিদায় জানিয়ে পরপারে চলে গেছেন দেশের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। চলে গেছেন কবি শহীদ কাদরিও। বাংলা সাহিত্যে এই দুজন সাহিত্যিকের বিদায় এক ধরণের শূণ্যতার সৃষ্টি করেছে। এ বছর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের শেষ সৈনিক ফিদেল ক্যাস্ট্রো। তাঁর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী মানুষদের ব্যথিত করেছে।নতুন বছরকে আমরা ধুমধামের সঙ্গে স্বাগত জানাই বাংলা নববর্ষে। সেখানে আবার একেবারেই বাঙালীর চিরকালের উৎসবের আবহ তৈরী হয়। কিন্তু ইংরেজি বছরের অন্তে উৎসব অনেকটাই পশ্চিমা ঘরানাকে ছুঁয়ে থাকে। এই লেখা যখন লিখছি তখন কিন্তু এই ঢাকার বুকে তারকা খচিত হোটেলগুলো থেকে বর্ষবরণ অথবা বিদায় উৎসবের ক্ষুদে বার্তা এসে গেছে মোবাইল ফোনে।সামাজিক মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা ছোট ছোট গ্রুপ তৈরী করে নিজেদের পছন্দসই হোটেল-রেস্তোরাঁ অথবা কোন জয়েন্টে ব্যবস্থা করে ফেলেছে ডিজে পার্টির। রাজধানীর বাইরেও বিভিন্ন জেলায় রিসোর্ট আর হোটেলগুলোও ছকে ফেলেছে তাদের বর্ষবরণ উৎসবের পরিকল্পনা। বহু মানুষ হাজিরও হয়ে গেছে সেখানে।

islamic-state-isis-terror-attack-493632

আইস এক আতঙ্কের নাম

বলছি নতুন বছরের কথা।তিনশ পয়ষট্টি দিন পাড়ি দিয়ে আবারও আমরা সবাই ঢুকে পড়ছি আরেকটি বছরের চক্করে। ভবিষ্যত আমরা জানি না। বছর শেষে রাশিচক্রবিদদেরও একটা বড় ভূমিকা থাকে ভবিষ্যত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে। কিন্তু সবক্ষেত্রে সব ভবিষ্যতবাণী কি মিলে যায়? মেলেনা। তাই নতুন করে অনিশ্চিত সময়কে আমরা সম্ভাষণ জানাতে প্রস্তুত। কিন্তু কোথায় যেন এই উৎসব আমেজের ভীড়ে বিদায়ের করুণ সুরও বেজে চলেছে মনের গভীরে। বিদায়, বিদায় বলে কে যেন ডেকে ফিরে যাচ্ছে। সে হয়তো সময়। সে হয়তো অনেকের দীর্ঘশ্বাস, অনেকের ব্যর্থতা, হয়তো আরও কোন গভীর বেদনা। উৎসবের আয়োজনকে সফল করতে খানিকটা করুণ সুরও প্রয়োজন হয়। এই বেদনার বাঁশি হয়তো বেজে বেজে সেই আনন্দের সুরকে পূর্ণতা দিতে চলেছে। কোথায় কে কী পেলো না তার হিসেব হয়তো প্রাপ্তির হিসেবের তলায় চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে যাবে। নতুন বছরের নতুন আলোর ভেতরে সেই বেদনার কাহিনীও থেকে যাবে অন্তরে।

অথৈ আহমেদ
ছবিঃ ইন্টারনেট