তীব্র এক কবি সমর সেন

samar-sen_agamikal_4

সমর সেন

কবি সমর সেন। অম্ল, তীব্র আর ব্যঙ্গে সূচালো তার কাব্য। বাংলা কবিতায় শহরবাসের ইতিকথাকে প্রায় অপারেশন টেবিলে নিয়ে তুলেছিলেন এই কবি। বিস্তর কাটা-ছেঁড়া করে উন্মোচীত করেছেন আলো ঝলমল ‘নগরের রক্তাক্ত হৃদয়, জমানো ক্লেদ। ফরাসী কবি বোদলেয়ারের বইয়ের নাম ‘স্পিল্ন অফ প্যারিস’-এর মতো নগর জীবনের অর্থহীনতা, মেকি মানুষ, মিথ্যাচার, মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়ই সমর সেনের কবিতায় ভিন্ন প্রতিমা নির্মাণ করেছে।
সমর সেন যখন ‘ঘরে বাইরে’ কবিতায় লেখেন,
তোমার ক্লান্ত উরুতে একদিন এসেছিল
কামনার বিশাল ইশারা।
ট্যাকেতে টাকা নেই,
রঙিন গণিকার দিন হলো শেষ,
আজ জীবনের কুঁজ দেখি তোমার গর্ভে…’

তখন তো নগরীর রক্তক্ষরণের গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারে। চমকে উঠি সমর সেনের কবিতার দর্পনে নিজেদের ভাঙ্গাচোরা, তোবড়ানো চেহারা দেখে।
১৯৩৫–এ প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক ‘কবিতা’ পত্রিকা। তার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্র। আর সমর সেন ছিলেন সহকারী সম্পাদক। দু’বছর পর তিনি ‘কবিতা’র যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯৩৫–এ এই পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কয়েকটি কবিতা পড়ে রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেব বসুকে লিখেছিলেন, ‘সমর সেনের কবিতা কয়টিতে গদ্যের রূঢ়তার ভিতর দিয়ে কাব্যের লাবণ্য প্রকাশ পেয়েছে। সাহিত্যে তাঁর লেখা টেকসই হবে বলেই বোধ হচ্ছে।’ অথচ এই কবিকাব্য রচনা করেছেন মাত্র মাত্র বারো বছর— ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ তাঁর আঠারো থেকে তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর তিনি স্বেচ্ছায় কবিতা রচনা থেকে সরে যান। এই সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হয় তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ— ‘কয়েকটি কবিতা’ (১৯৩৭), ‘গ্রহণ’ (১৯৪০), ‘নানাকথা’ (১৯৪২), ‘খোলাচিঠি’ (১৯৪৩) এবং ‘তিনপুরুষ’ (১৯৪৪)। পরে ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘সমর সেনের কবিতা’।
সমর সেনের কবি আত্না ভীষণ এক অনুসন্ধানে নেমেছিলো। ভেঙ্গে পড়া, ক্ষতবিক্ষত নগর আর তার নাগরিকের যন্ত্রণাময় বোধের এক চালচিত্র সেই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তার কবিতায়। একেবারে আলাদা করে দিয়েছে তাঁর কাব্য ভাষাকে। এই ভাষার সঙ্গে তার সমকালীন কাব্য যাত্রীদের কোন সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি লিখছেন-
কাঁচা ডিম খেয়ে প্রতিদিন দুপুরে ঘুম,
নারীধর্ষণের ইতিহাস
পেস্তাচেরা চোখ মেলে প্রতিদিন পড়া
দৈনিক পত্রিকায়।
আর মধ্য এশিয়ার মরুভূমি, নীল-নির্জন সমুদ্র,
বিপুল পৃথিবী আর নিরবধি কাল।
এসব লাইন যেন শল্য চিকিৎসকের মসৃন, ছুরির মতো কেটে উন্মুক্ত করে আমাদের মধ্যবিত্ত চরিত্রকে। তারপর এই উন্মোচীত সত্যকে ঝুলিয়ে দেয় অপারেশন থিয়েটারের দেয়ালে। এখানেই সমর সেন বাংলা কবিতার উর্বর ভূমিতে একেবারে পৃথক ভঙ্গীতে লাঙ্গল চালিয়ে তৈরী করেছেন আলাদা এক জমি। যেখানে ফসল ফলেছে অফুরন্ত।

সমর সেন লিখেছিলেন, ‘যে কোনও সৃষ্টির পেছনে স্রষ্টার জীবন, পরিবেশ, মতামত, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে থাকতে বাধ্য।’ এই লাইন পাঠ করার পর সমর সেনের কবিতার পাঠক ঘুরে তাকানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন এই কবির জীবনের দিকে। সমর সেনের জন্ম ১৯১৬ সালের ১০ অক্টোবর। তাঁর পিতামহ ছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন, যিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ রচনা করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য’ও উল্লেখযোগ্য। ১৯০০ সালে ঢাকা জেলা থেকে সপরিবারে চলে এসে দীনেশচন্দ্র কলকাতার বাগবাজারে বসবাস শুরু করেন। তখনকার শিক্ষিত সাহিত্যানুরাগী বাঙালি সমাজের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল গভীর। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও ছিল তাঁর গভীর হৃদ্যতা। রবীন্দ্রনাথের আগ্রহেই সমর সেনের পিতা অরুণচন্দ্র সেন পড়াশোনা করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। মজার কথা, সমর সেনের পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সৌহার্দ্য কবি সমর সেনকে কোনওভাবে প্রভাবিত করেনি। তিনি কখনওই রবীন্দ্রভক্ত হয়ে ওঠেননি। বরং পিতা অরুণচন্দ্রের বন্ধুদের প্রভাব পড়েছিল কিশোর বা তরুণ সমর সেনের মনে। তাঁদের বাড়িতে কাজী নজরুল ইসলাম আসতেন। কিন্তু অন্য পিতৃবন্ধুদের মধ্যে কেউ কবি ছিলেন না। পিতা অরুণচন্দ্র ছিলেন কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন। বাড়িতে বামঘেঁষা রাজনীতির চর্চা ছিল। সেই সুবাদে বাড়িতে আসতেন মার্কসবাদী বঙ্কিমবিহারী মুখোপাধ্যায়, রাধারমণ মিত্র প্রমুখ। রাধারমণ মিত্র ছিলেন মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তি–পাওয়া আসামি। এঁদের প্রভাবে তরুণ সমর সেনের মনে শ্রেণীচেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের শেকড় ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর মনোভূমিতে। কিন্তু তিনি কখনও চূড়ান্তভাবে প্রভাবিত হননি কারও প্রভাবেই। মার্কসবাদে বিশ্বাস করলেও সরাসরি পার্টির সঙ্গে যুক্ত হননি। ১৯৪০ সালে দিল্লি চলে যান তিনি। কিছুদিন অধ্যাপনা করার পর ১৯৪৪–এ অল ইন্ডিয়া রেডিওয় নিউজ এডিটর পদে যোগ দেন এবং এই সময় থেকেই স্টেটসম্যান সংবাদপত্রে লেখা শুরু করেন।

samar-sen_agamikal_2

রবীন্দ্রনাথ ও সমর সেন

বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সমাজের তীব্র সব আলোড়ন সমর সেনকে বিচলিত করে তোলে। কবির কলম বন্ধ হয়। ১৯৫৬ সালে পাঁচ বছরের জন্যে মস্কো চলে যান অনুবাদকের কাজ নিয়ে। ১৯৬১–তে কলকাতায় ফিরে এসে পুরোপুরি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’–এ। ১৯৬৪–তে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নীতিগত বিরোধের ফলে এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের কথায় ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘নাও’–এর সম্পাদক পদে যোগ দেন। কিন্তু ছ’বছর পর ওই একই কারণে ‘নাও’ পত্রিকা ছেড়ে বের করেন ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘ফ্রন্টিয়ার’। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক অন্যায়ের প্রতি ‘ফ্রন্টিয়ার’–এর ভূমিকা ছিল আপসহীন। কিন্তু কবি আর কবিতায় ফেরেননি।
১৯৩৭–এ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কয়েকটি কবিতা’ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘বর্তমান সময়ের সংশয়াচ্ছন্ন অন্ধকার যে তরুণচিত্তকে আবিষ্ট করেছে, সমর সেন তারই প্রতিনিধি।’ আর তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৮–তে শঙ্ঘ ঘোষ লিখলেন, ‘কবিতার জগৎ থেকে নিঃশব্দে সরে গিয়ে এই উদ্বেলতার সঙ্গে যেভাবে নিজেকে তিনি মিলিয়েছিলেন, তাকেও বলা যায় এক সৃষ্টিরই জগৎ, সঙ্ঘাতের আন্দোলনের উদ্দীপনার সৃষ্টি।’ ১৯৮৭ সালের ২৩ আগস্ট প্রয়াত হন কবি ও সাংবাদিক সমর সেন।

কায়েস আহমেদ