বৃক্ষপ্রেমিক আমি এবং আমার সুন্দরী অরবড়ই

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা মাদারটেক এ যখন চলে আসলাম তখন আমার মনে হল আমি বেহেস্তে আসলাম। কত রকম গাছ,বৃক্ষ, ঝোপঝাড়, শস্য, জলজ,ঔষধি কত কিছুর সঙ্গে পরিচিত হলাম।ধানের ক্ষেত কে আমার সব সময় ছবি আঁকার ক্যানভাস মনে হত।নীচে ধানক্ষেতের সবুজ ক্যানভাস ওপরে নীলাকাশের চলন্ত ছবি। আহা।বন্দী আমি যেন সত্যিকার মুক্তি পেলাম।পড়াশোনা বাদে বাকী সময় গাছগাছালি পাখপাখালির সঙ্গে দিন কাটতো

বাড়ির পুবদিকে মা সব্জীবাগান করলেন।লাউ এর মাচান,আহা,লকলকে তার ডগা আজ এক হাত তো কাল চারহাত লম্বা! তার পাশেই ঢেড়শ বাগান।সকালে না তুললে বিকেলে বুড়ো হয়ে যায়।তার ফুল কি অপূর্ব! কোন কিছুই আমার চোখ এড়ায় না।ওখানেই একটা ঢাল মত জায়গায় চেরি টমেটো লাগালেন মা।রোজ ওই মাচানের নিচে চট বিছিয়ে আমি শুয়ে শুয়ে বই পড়তাম,আর পাকা টমেটো ছিড়ে খেতাম।আহা! স্বর্গ ছিল স্বর্গ।বাড়ির পুবদিকে আম্মা পেয়ারা গাছ লাগালেন।একটা পেয়ারা গাছই যেন সারা বাড়িকে ছায়া দেয়ার দায়িত্ব নিল।আর ফলের ভারে নুয়ে পড়লো। আব্বা বললেন এসো একটা সত্যি উদাহরণ দেই।কি উদাহরণ আব্বা? বইয়ের পাতায় পড়েছো না? যে গাছে যত ফল হয় সে তত নতমুখী হয়।মানে যে যত বড় যে তত বিনয়ী হয়।হয় বা হতে হয়।আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম,বুঝে গেলাম,আব্বার এই সত্যি উদাহরণ। কচুরিপানার প্রেমে পড়ে গেলাম।হাঁসের ছানাকে খাওয়াতে শামুকের সঙ্গে কচুরিপানা ও আমাকে আনতে হত।কিন্তু ওদের ছিড়তে খুব খারাপ লাগতো। ওদের আমি ময়ুরবৃক্ষ ভাবতাম।পুরো ফুলটাই ময়ুরের পুচ্ছ। আহা।তবে কচুরিপানার নীচের ঝালর গুলো ভীষন রহস্যময় মনে হত।চিনে গেলাম নীম গাছ,কালোকেশুর,দুর্বাঘাস,শুশনি শাক,হেলেঞ্চা শাক সহ আরো নাম না জানা পথমঞ্জুরীকে।ঢোলকলমীর গাছ দিয়ে বেড়া দেওয়া ছিল আমাদের পুরো বাড়ি।তাতে যখন বেগুনী বেগুনী কলকে ফুল ধরতো আমাদের বাড়িটাকে কি যে অপূর্ব লাগতো!

পাশের বাসার হায়দার কাকার বাড়ির ঢাল এ হঠাৎ চোখ পড়লো। দেখি দুই পাতার একটি হলুদ রঙের চারা তিরতির কাঁপছে। চেনা চেনা লাগে কিন্তু অচেনা।বন্ধু ইয়াসমিন ছিল সঙ্গে।বললাম তুলি? ও বললো এইটা তো লেinsite_k_1-2017দা! তুললেই মরে যাবে।আমার মন মানেনা,রোজদিন নজর রাখি।মরে গেলো নাকি,পাখি খেলো নাকি।এভাবে মাসখানেক যাওয়ার পর দেখি আঙুল খানের লম্বা হয়েছে।দুই পাতার জায়গায় ছয় পাতা।খুব সাবধানে তাকে তুললাম।একটা পলিথিন এর প্যাকেট এ গোড়ার মাটি সহ তুলে বাড়ি আনলাম।একটা পরিত্যক্ত টিনের কৌটায় পুঁতে দিলাম।রোজ খেয়াল করি।হাতের মুঠি তে পানি নিয়ে ফোটা ফোটা পানি দেই পরম যত্নে।আম্মা একদিন বলেন দেখি— কি নিয়ে এতো ব্যস্ততা? আম্মা দেখে বলেন ওমা! এটা তো দেখি অরবড়ই গাছ! কই পেলি।আমি সব বলি।আম্মা বলেন এই কৌটায় হবেনা তো! তো? দাড়া আমি জায়গা দেখিয়ে দেই।আম্মা পেয়ারা গাছের কাছে আর একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন এখানে লাগা।লাগিয়ে জলকান্দা র মত কিনার উঁচু করে দে।আম্মা যেভাবে বললেন সেভাবেই লাগালাম। খুব অদ্ভুত ভাবে গাছটি তরতর করে বেড়ে উঠে পেয়ারা গাছের সমান হয়ে গেলো। এবং গাছের গোড়া থেকে গাছের গা ফেটে ফেটে ফল ধরলো ঝাপিয়ে।সোনালী হলুদ ফলের গা ঠিকরে আলো বেরোয়।আমি সারাদিন অরবড়ই এর ফুল ফলের রূপ রঙ রস দেখতে থাকি।আম্মা বলেন, আল্লাহ, কি পাগল পেটে ধরলাম! হাহাহা।আমার এমন কথা গা সওয়া।শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার শুধু এই কথাটিই মনে হত,এতো বড় পৃথিবী, এতো গাছপালা,কিন্তু এই গাছটি একান্ত আমার।এর জীবন যৌবনে আমি জড়িয়ে আছি।এই গাছটি আমার বড়ই আপন।এই ভাবনা আমাকে রোজ সকালে আমাকে ইমোশনাল করে দিতে লাগলো। সেই অনুভব থেকেই আমি হয়ে উঠলাম বৃক্ষ প্রেমিক।

 ছবি: লেখক ও ইন্টানেট।