জন্মশতবর্ষে সাহিত্যিক শওকত ওসমান

লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ আর কবিতা। বাংলা সাহিত্যের ভূমিকে উর্বর করেছেন তাঁর বিচিত্রমুখী সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। তিনি শওকত ওসমান। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে প্রাণের বাংিলার পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা।

শওকত ওসমানের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে। নিজের গ্রামেই তাঁর প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ। ১৯২৯ সালে জুনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষা শেষ করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে সেখান থেকে ফাজিল পাস করার পর ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি নিলেও তিনি মাস্টার্স করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। লেখাপড়া শেষে তিনি কিছুদিন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে চাকরি করেন। পরে পেশা পরিবর্তন করে অধ্যাপনায় ফিরে আসেন। প্রথমে কলকাতায় ইনস্টিটিউট অব কমার্সে যোগ দেন। পরে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে। ১৯৫৮ সালে বদলি হয়ে ঢাকা কলেজে এবং ১৯৭২ সালে এ কলেজ থেকেই অবসর নেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন কলকাতার একটি স্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন। সেখানেই প্রখ্যাত অভিনেতা উত্তমকুমারকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন তিনি।

ধর্মান্ধতা আর কূপমন্ডূকতাকে ভীষণভাবে অপছন্দ করতেন শওকত ওসমান।সমাজ এবং পরিবেশের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর ছিল বিশেষ সচেতনতা। এই বিজ্ঘান নির্ভর, উদার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। বাঙালী মুসলমান সমাজের কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও অবিরাম লিখে গেছেন তিনি।

শওকত ওসমানের লেখালেখির বয়স ৬০ বছর। তিনি বেঁচে ছিলেন প্রায় ৮০ বছর। প্রথম গল্প ‘আব্বাস’ ছাপা হয় স্কুল ম্যাগাজিনে। সেই যে শুরু বিরামহীন পথচলা। শওকত ওসমান লিখে চললেন: ওটেন সাহেবের বাংলো, তস্কর ও লস্কর, আমলার মামলা, পিজরাপোল, বনী আদম, জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প; জননী, ক্রীতদাসের হাসি, প্রস্তরফলক, সমাগম, চৌরসন্ধি, রাজা উপাখ্যান, জাহান্নাম হইতে বিদায়, দুই সৈনিক, নেকড়ে অরণ্য, ভাবভাষা ভাবনা, পঞ্চসঙ্গী, জন্ম যদি তব বঙ্গে, ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী, নষ্টভান অষ্টভান, মুসলিম মানসের রূপান্তর, পূর্ণ স্বাধীনতা, চূর্ণ স্বাধীনতা ইত্যাদি।

অনেকে জননীকে শওকত-শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। কিন্তু ‘ক্রিতদাসের হাসি’ উপন্যাস বিদ্রোহী চেতনা আর নিজস্ব অধিকারবোধের লড়াইয়ে অস্বিত্ববান হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অনন্য সাহিত্য কর্মে পরিণত হয়েছে।

শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে রচনা করেছিলেন চারচট উপন্যাস-‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘দুই সৈনিক’, ‘নেকড়ে অরণ্য’ ও ‘জলাংগী’। বাংলাদেশের জাতীয় আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধ তাঁর উপন্যাসে ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে।

তাঁর ব্যাঙ্গধর্মী কবিতাও বাঙালী মুসলমানের অন্ধ বিশ্বাস আর ভুল চেতনাকে আঘাত করেছে বারবার।

এই সাহিত্যিকের লেখনী বাংলা সাহিত্য এবং আমাদের সমাজ বিকাশের ধারাকে সংস্কার করার চেষ্টার পাশাপাশি জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাষিত করতে চেয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। পুরনোকে ভেঙ্গে নতুন সাহিত্যে তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছেন নতুন এক ধারা।

প্রাণের বাংলা প্রতিবেদক