দারুন

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

ভারতের এক অঙ্গরাজ্য, ওড়িশা। এই রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বর। এই ভুবনেশ্বর শহরটির সঙ্গে আমার ব্যাক্তিগত যোগাযোগ অনেক দিনের। ১৯৯৯ সালে এক প্রবল ঝড়ে ছিন্নভিন্ন এই শহরেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছিলাম আমি। সেই থেকে আজ প্রায় ১৬-১৭ বছর এই শহরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। খনিজ সম্পদে ভরপুর এই রাজ্যে কল কারখানার সফল উন্নতি শুরু হয়েছে বিগত ১৫-২০ বছর। তাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে অন্য শহরে চাকরি করলেও এই রাজ্যে আসতে হয়েছে বার বার, বিভিন্ন কাজে। থাকতে হয়েছে ভুবনেশ্বর শহরে।

প্রায় বছর তিনেক ধরে আমি ভুবনেশ্বরে গেলেই “Ginger Hotel” এ থাকি। টাটা গ্রূপের এই হোটেলটি তুলনা মূলক ভাবে সস্তা ও আড়ম্বর হীন। আমাদের মতো business travelers দের জন্য হোটেলটি একেবারে আদর্শ। কিন্তু এই হোটেলের নাম কেন যে Ginger Hotel মানে আদা হোটেল রাখা হয়েছে সেটা আমি জানিনা। তবে ভারতে অন্য কিছু জনপ্রিয় হোটেলের মধ্যে Mango Hotel অর্থাৎ আম হোটেল বা Lemon Tree Hotel অর্থাৎ লেবু গাছ হোটেল ও রয়েছে। আমার ধারণা হোটেলের নামটা সাধারণ শব্দের ব্যবহারে অসাধারণ ও আকর্ষণীয় করে তোলাই কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য।

যাইহোক, ভুবনেশ্বরের Ginger হোটেলের প্রায় সব কিছুই সাধারণ। শুধু একটি মানুষ ছাড়া; সুশান্ত দাস। তিনি এই হোটেলের রেস্টুরেন্ট এ কাজ করেন। সারাদিন হাসি মুখে সবইকে খেতে দেন। বছর চল্লিশের সুশান্তের ব্যবহার এতো আন্তরিক, যে মুগ্ধ হতেই হয়। গেলেই জানতে চায়, কবে এলেন, কেমন আছেন। সকালে প্রাতরাশ করতে গেলে সে সকলের থেকে জানতে চায়, গত রাতে সব কিছু ঠিক ছিলো কিনা, ইত্যাদি। যদিও এসব তার কাজের মধ্যে পড়েনা এবং আমার বিশ্বাস হোটেল কর্তৃপক্ষ এর জন্য তাকে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ও দেন না। আসলে এটাই সুশান্তর স্বভাব।ginger-hotel-mail

অথিতিদের খাবার দেওয়া ও এঁটো বাসন তুলে রাখাই তার আসল কাজ। আর সেখানেও সে অসাধারণ। চিনি ছাড়া কালো চা আমার পছন্দ। মাসে একবার যেতাম তখন। বার দুয়েক যাবার পর থেকে, তাকে আর বলতে হয়না। এবার গেলাম প্রায় ছয় মাস পরে। দেখলাম আমার পছন্দ সে এখনও ভুলে যায়নি। আসার সময় হাসি মুখে প্রশ্ন করলো, আবার কবে দেখা হবে? কি উত্তর দেবো, প্রজেক্ট শেষ তাই আমি সত্যিই জানিনা আবার কবে আসবো এই শহরে। কেমন এক আন্তরিক উষ্ণতার ছোঁয়া পেলাম, ” আবার কবে দেখা হginger-hotel-photo1বে”। লক্ষ করে দেখেছি, অন্য অতিথিদের সঙ্গেও তার ব্যবহার মোটামুটি এক।

হোটেল থেকে চলে আসার পর, সব হোটেলই একটা e-mail পাঠায়, feedback এর আশায়। প্রায় কোনবারই আমি উত্তর দেবার সময় পাইনা। এবার ইচ্ছা করেই উত্তরটা দিলাম। দু চার কথা লিখলাম সুশান্তের আন্তরিক ব্যবহার নিয়ে। জবাবে হোটেল কর্তৃপক্ষ পাঠাল সঙ্গের e-mail টা।

বুঝলাম আমার মতামত হোটেল কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছেন এবং তাতে সে আনন্দিত। ভাবলাম, যে সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে সবাইকে আনন্দ দিতে চেষ্টা করে, আজ আমি তাকে খানিকটা আনন্দ দিতে পেরেছি। একটা দারুন অনুভূতিতে মনটা ভরে গেল। মনে পড়ল, খুব ছোটবেলা আমি নিজের নাম, “দীপারুণ” উচ্চারণ করতে পারতাম না। কেউ নাম জানতে চাইলে বলতাম, “দারুন”। পাড়ার অনেকে আমায় দারুন বাবু বলে ডাকতো। আমার ছোট বেলার নাম আর আজকের অনুভূতি সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মনে ভেসে এলো রবীন্দ্রনাথের সেই গান,

‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর —

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এতো মধুর’।।

ছবি:দীপারুণ ভট্টাচার্য্য