মেঘ দেখবো বলে…

লেখা ও ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

হোমায়েদ ইসহাক মুন

আকাশে ভরা পূর্ণিমার জোয়ার। বাতাস বইছে মাতাল হয়ে। আকাশলীনার ছোট্ট বারান্দায় আমরা কজনে সেই আলোতে হারিয়ে গিয়েছিলাম অসহ্য সুন্দরের মাঝে। জোৎস্নার সেই আলো যেন আমাদের অনেক দিনের চেনা। চারিপাশে নিরব নিস-ব্ধ, যান্ত্রিকতার ছোঁয়া নেই, আকাশে বাতাসে কার্বন, মিথেন বা নাইট্রাস এর কোন অস্তিত্ব নেই। এখানে মানুষের মন ভালো হয়ে যাওয়ার সব রকম উপাদান আছে। আধো আলোয় তখন গান হচ্ছিল, “মোর ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো…. দোলে মনো দোলে অকারণ হরষে,… হৃদয় গগনে সজলো ঘন নবীন মেঘে রসের ধারা বরষে।” গান গাইছিলেন রেহনুমা ভাবী। সূর তাল লয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক আনেক দিনের। গান কে যিনি ভালবাসেন তার কন্ঠে সুর শুনে আমরা শুধু আকাশ পানের ঐ চাঁদটার দিকেই চেয়ে রইলাম অনেক্ষন। সত্যিই অসম্ভব সুন্দর একটা রাত ছিল। তার সঙ্গে সুন্দর ছিল আমাদের সঙ্গে থাকা মানুষগুলো। সবাই একে অপরের আত্নার আত্নীয়। আইরিন আপা বলতেন, যারা রক্তের সম্পর্ক তারা রক্তিয় আর যাদের সঙ্গে আত্নার সম্পর্ক তারাই আত্নীয়। মনে ধরেছিল কথাগুলো। মানুষ বড় আজিব কিছিমের তবে সময় নিয়ে যদি চেনা যায়, তার সঙ্গে মেশা যায় তাহলে ভালবাসাও যায়। ক্ষণে ক্ষণে তার মায়ায় অন্যরাও আবদ্ধ হয়।unnamed-1

নীলগিরির আকাশনীলাতে এসে উঠেছি আজ সকালেই। গত রাতে আমি, ওয়াসিম, আইরিন আপা আর পারওয়েজ ভাই মিলে রওনা দিয়েছিলাম বান্দরবান এর উদ্দেশ্যে। বাসে বসেই ভোরের স্নিগ্ধতা স্পর্শ করলো। বাস থেকে নেমে নাস্তা সেরে আমরা জিপের খোঁজ করতে থাকলাম। আইরিন আপার কথার মধুতে সব কিছু কি করে যেন সহজেই ম্যানেজ হয়ে যায়। জিপের স্ট্যান্ডে আমরা টিটুকে পেয়ে গেলাম। সে তার ল্যান্ডক্রজার নিয়ে নীলগিরি যেতে রাজি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চেপে বসলাম। টিটু পাহাড়ি পথে চলেছে সেই ছোট বেলা থেকেই তাই পাহাড় তার কাছে অচেনা কিছু না। এঁকেবেঁকে যাওয়া পথের নিশানা সহজে সে ঠিকই খুঁজে বের করতে পারে। তবে শীতের সময়ে পাহাড়ের প্রকৃতি কিছুটা রূক্ষ, আবহাওয়াটা তেমন একটা ঠিক সায় দেয় না এ পথ মাড়াতে। বেলা বাড়তে বাড়তে রোদের প্রখরতা তীব্রতর হয়। কিন্তু’ তাতেও আমাদের আনন্দে ছেঁদ পড়ে না। তবে পারওয়েজ ভাইয়ার দোল খাওয়া পাহাড়ি পথে হয়তো শৈশবের ঘুম পাড়ানি মাসি পিষির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। আমরা হারানো দিনের গান শুনতে শুনতে পাহাড়ের দিগন্ত-জোড়া নীলিমায় হারিয়ে যাই। বান্দরবান শহর থেকে নীলগিরি যেতে প্রায় এক ঘন্টার ওপরে লাগে,দূরত্ব ৪৮কিমি।  পথে পড়বে দুটো চেক পোস্ট। পাহাড়ী শাপ লুডুর মতো রাস্তা দিয়ে কখন যে নীলগিরি পৌছে গেলাম টের পেলাম পরে।nilgiri

নীলগিরি রিসোর্টে বেশ কয়েকটি কটেজ রয়েছে আর রয়েছে তাবুও। এর নাম গুলোও বেশ আকর্ষনীয়, আকাশলীনা, মেঘদূত, মারমা রাইসা। আমাদের জন্য বরাদ্ধ ছিল আকাশলীনা। ভেতরে ঢুকে খোলামেলা পরিবেশ দেখে তো সবাই আনন্দে আত্নহারা। তখনো হুদা ভাইদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়নি। আমরা শুধু জানি যে আমাদের সঙ্গে আরো কয়েকজন এসে যোগ দেবে। তারাই যে একটু পরে আত্নার আত্নীয় হয়ে উঠবে ভাবিনি। রূম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই দেখি হুদা ভাই হন হন করে ভেতরে ঢুকেছে। আলাপ পরিচয়ের পরে সবাই বন্ধুর মতো হয়ে গেল। কামাল ভাই আর তার পরিবার এর মধ্যে এসে যোগ দিয়েছেন। তারা সবাই পেশায় সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ডাক্তার, আইরিন আপা হাসতে হাসতে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “এরা হচ্ছেন চর্ম ও মৌন বিষেশজ্ঞ”। আমরা সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি, আর সেই হাসির রেশ থেমেছে ঘুমুতে যাবার আগ পর্যন্ত। দুপুরের খাবারে আয়োজনে আমাদের জন্য ছিল মুরগির মাংস, ডাল চচ্চরি, সবজি। এখানে আগে থেকে খাবারের ব্যাপারে বলে রাখতে হয়, অনেক দূর থেকে পানি এবং খাবারের ব্যবস্থা করতে হয় কতৃপক্ষের। এখানে বিদ্যুৎ নেই সত্যি কিন্তু আমরা এর প্রয়োজনও অনুভব করিনি। এত অসহ্য সুন্দরের মাঝে যে সব কিছু ছেড়ে অনায়াসেই কাটিয়ে দেয়া যায় ভাবনাতেই ছিল না। তবে বিদ্যুৎ চাইলেই পাওয়া যায় কারন ঘন্টা প্রতি নির্ধারিত টাকার হিসেবে জেনারেটরের ব্যবসা আছে সর্বক্ষন। আর রাতে বিদ্যুতের ব্যবসা হয় সন্ধ্যা ৬ থেকে রাত ৯.৩০টা পর্যন্ত। বাকি সময় সোলারের আলো ব্যবহার করা যায়। আর এখানে থাকতে হলে কিন্তু কতৃপক্ষকে জানাতে হবে বেশ আগে থেকেই।unnamed

দুপুরে খাবারের পরে আমরা গল্পে মেতেছি তখনই আইরিন আপা তার ব্যাগ থেকে রঙ্গীন একটা ঘূড়ি বের করলো। আমি তো নিজেকে আর আটকাতে পারলাম না, বের হয়ে গেলাম ঘুড়ি নিয়ে। কিন্তু একি; নাটাই তো দেখি আর আমার কাছে ধরাই দিচ্ছে না। হুদা ভাই ঠিক যেন তার শৈশব ফিরে পেয়েছে, একে একে সবারই একি অবস্থা সবাই মনের আনন্দে ঘুড়ি উড়িয়েই যাচ্ছে। আমি ছবি তোলায় মন দিলাম। ঘুড়ি তার রংগুলো যেন সব আমাদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে। দেখতে দেখতে এই নির্মল আনন্দটুকু এক ঘুড়ি উৎসবে রূপ নিল। ঘুড়ি আর বাতাসের পত পত শব্দের মিতালীতে আমরা যেন অন্য কোন দেশে চলে গিয়েছিলাম। শেষতক অবশ্য ঘুড়িটি আমাকে আশির্বাদ করে আকাশে একেবারে মিলিয়ে গেল।nilgiri333

নীলগিরি জায়গাটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৪০০ফুট উপরে কোন এক মেঘের দেশে। সেখানে মুক্ত বিহঙ্গের মত কিছু মানুষ জীবনের স্বাদ নিতে এসেছে, প্রকৃতি যেন তাই আমাদের পানে চেয়ে বসে আছে। আজ যে দোল পূর্ণিমার রাত, তোমাদের জন্য আজ প্রকৃতির এই উপহার রইলো। আমরা গোধূলী লগ্নের অপেক্ষায় রইলাম রাতের পৃথিবীটাকে দেখার জন্য। সে পৃথিবীর বিশাল আকাশে সহস্র তারা গুঁজে থাকে। আকাশলীনার এক টুকরো বারান্দায় সেদিন সত্যিই পরি এসেছিল আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। গান ধরলো কামাল-রেহনুমার উত্তরসূরী প্রমা। মায়ের মতই দ্বরাজ গলায় সে গেয়ে যায় একের পর এক গান। আমরা আনন্দে পূলকিত হই, তার লাবন্যতা আর নির্মল হাসির সঙ্গে আমরাও সামিল হই। আর আকাশ আমাদের সেই হাসি নিয়ে যায় চাঁদের দেশে। আমরা কে কোথায় হারিয়ে গেলাম কিছুই টের পেলাম না। গভীর রাত অবধি চাঁদের দিকে চেয়েছিলাম পলকহীন ভাবে। তারপর এক আকাশ তারা মাথায় নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। ভোরে আইরিন আপার ঢাক শুনে জেগে উঠি, ‘জলদি বাইরে এসে একবার দেখে যা, ঐ দূর পাহাড়ের গায়ে কি অসম্ভব সুন্দর মেঘ জমেছে।’ দিগন্ত রেখার মিষ্টি আলো আমাদের সবাইকে আশির্বাদ করে দিয়ে গেল। তখন ভাবছিলাম, জীবনের এমন মায়াময় মূহুত্তগুলো যদি বার বার ফিরে পাওয়া যেত! সত্যিই যদি ফিরে পাওয়া যেত!!4980273938_0105d94c7b_z

সকালের নাস্তা হলো পাহাড়ি বিন্নি চালের খিচুড়ি দিয়ে। আমাদের ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে, কিন্তু  মন তো মানছে না করোরই। জিপের ঢাকনা খুলে উঠে দাড়ালাম, উঁচু পাহাড় থেকে দুপাশের বিস্তৃত আরো একবার মন ভরে দেখে নিতে। পাশে এসে দাড়ালো প্রমা। ফিরেতো এসেছি ঢাকায়, সব গুছিয়ে ফেরতও এনেছি, কিন’ মন যে আসেনি……….!!u1267_465442_237596

 

ছবি: ইন্টানেট