প্লিজ, নাক গলাবেন নাহ!

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

একটা জরুরী কাজে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যেয়ে পৌছাতেই ঠান্ডা কনকনে বাতাসের ঝাপটা লাগল শরীরে। অতঃপর নাকের মধ্যে হাল্কা সুড়সুড়ি। পূবের আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখে যেমন বোঝা যায় প্রচণ্ড ঝড় আসছে, তেমনি আমার নাকে সুরসুরানি শুরু হওয়া মানে ঝড়ের বেগে হাঁচি শুরু হবে একের পর এক। হাঁচির জন্য কোন পুরষ্কারের ব্যবস্থা থাকলে এতদিনে শচীন টেন্ডুলকারের সেঞ্চুরির রেকর্ড অনেক আগেই ভেঙে ফেলতাম। তো হাঁচির কথা বলছিলাম। এই হাঁচি পর্ব শেষ হওয়ার পরেই শুরু হয় টপটপ করে নাক দিয়ে পানি পড়ার পর্ব। ঠিক যেমনিভাবে শীতের রাতে টিনের চালে ঘন কুয়াশা টপটপ করে ঝরে পড়ে। পানি প্রবাহ দুই একদিন থাকবে, তারপর সেই পাতলা পানি জ্বাল দেয়া দুধের মত ঘন হতে হতে ঘন সর থেকে একেবারে ঘি-এ পরিনত হবে। ছোট বাচ্চারা অবশ্য সর্দি জিনিষটা কে ‘নাকের ঘি’ বলেই চেনে। মানে ঠান্ডা লাগার প্রাথমিক ধাক্কাটা নাকের উপর দিয়েই যায়। খালি ঠান্ডার কথাই বলি কেন, কোথাও ভাল রান্না হলে এই নাকই কিন্তু সিগন্যাল দেয় সবার আগে ‘এখন তোমার বিরিয়ানি খাওয়া দরকার! সে নিজের টাকায় খাও আর বেস্ট ফ্রেন্ডকে মুরগী বানিয়ে তার টাকায় খাও। গন্ধ নেয়ার বেলায় শুধু বিরিয়ানির কথা বললে একপেশে হয়ে যাবে। ইলিশ ভাজা, পোলাও, কোর্মা, মাটন রেজালা, খেজুরের গুড়ের পায়েস এগুলোর নামও চলে আসে। নানা রকমের ফুল তো আছেই কিন্তু আলাদা করে টাকার কথা আমাকে বলতেই হবে। টাকার গন্ধের উপরে আর কোন মিষ্টি গন্ধ হতে পারে না। আমি এত দামী দামী পারফিউম ইউজ করি কিন্তু কোনদিন কোনো মেয়ে বলেনি ‘ওগো, তোমার বুকের গন্ধ মুখে নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব’! বরং মানিব্যাগের স্বাস্থ্য যখনই একটু ভালো হয়, ওমনি কোথা থেকে যেন প্রেয়সীর দল হাজির। এ জন্যই ছেলেরা মানিব্যাগ প্যান্টের পেছনের পকেটে রাখে, যেন পশ্চাৎদেশ দিয়েও ভাল গন্ধ বের হয়। তবে গন্ধ শুঁকে শুঁকে কারও পশ্চাতে ধাওয়া করার ব্যাপারটাকে কুকুরদের পাশাপাশি মানুষদের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলার ব্যাপারে শার্লক হোমস বা ফেলুদার অবদান কিন্ত কম নয়। এখানেও নাকের ভূমিকা সব চেয়ে বেশি। প্রায় সব গোয়েন্দাদেরই নাক থাকে খাড়া। large-1বোঁচা নাকের কোন গোয়েন্দার গল্প আমি পড়িনি। আমার নাক অবশ্য বোঁচা এবং মোটা। এজন্যই সরু, টিকেলো নাকের কোন মেয়ে আমার প্রেমে পড়ল না।একবার সাহস করে এগিয়ে ছিলাম, মেয়েটা বলল বেশি বাড়াবাড়ি করলে ওর এক্স বয়ফ্রেন্ড কিন্তু বর্তমানে শুধু ‘ফ্রেন্ড’কে দিয়ে ঘুষি মেরে আমার নাক ফাটিয়ে দেবে। ফাটা নাক নিয়ে নাকিস্বরে কথা বললে কেমন লাগবে, সেই ভয়ে আর সামনে আগাইনি। কিন্তু নাকিসুরে গান গেয়ে হিমেশ রেশমিয়া ঠিকই বিখ্যাত হয়ে গেল। আমাকে অবশ্য একবার টিভি ক্যামেরার সামনেই গান গাওয়ার জন্য আমার গুরু মীর অনেক অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমার গলার যে সুর, নাকে খত দিয়েছি জীবনে আর কোনদিন গান গাওয়ার চেষ্টা করবো না। অনেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন গান গাইতে কি এমন সমস্যা? দেখুন, অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে আসবেন না। আমার গান গাওয়া শুনে, যারা ভাল গান গাইতে পারে তারা হয়ত মনের দুঃখে গান গাওয়া ছেড়েই দিল।তখন কি হবে? নিজের নাক কেটে, পরের যাত্রা আমি কেন ভংগ করতে যাবো? এমনিতেই আমি রেগুলার কোন ডে জব না করে, নিজেকে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান পরিচয় দেই বলে আমার মা বাবার লজ্জায় নাক কাটা গেছে। তাদের কথামত, আমি নাকি জীবন সম্পর্কে খুবই উদাস। বাস্তবতা না বুঝে খালি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই। কিন্তু বোঁচা হলেও আমার ‘নাক উঁচু’ স্বভাব আছে। অন্যের জন্য কাজ করাটা আমি পছন্দ করিনা। যাই হোক, শুরু করেছিলাম ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা দিয়ে। এখন আর এটা শুধু ঝাপটানো তে নেই, রীতিমত কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে শরীরের। আপাতত লেপের তলায় ঢুকি। নতুন বের করা লেপের ভাজে ভাজে ন্যাপথলিনের গন্ধ নাকে খারাপ লাগছেনা। এখন নাক ডেকে ঘুমাই, সামনের সপ্তাহে আবারো কথা হবে।

ছবি: গুগল