আমার অবনী স্যার

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

দীপংকর গৌতম

দীপংকর গৌতম

প্রতি বছর কুয়াশার পাতলুন গায়ে পরে শীত আসে। শীত যায়। শীত আমাকে খুব শৈশবমুখী করে তোলে। মায়ের গায়ের গন্ধ বড় বেশী টেরপাই। পান্তা ভাত গরম করে দিয়ে, অথবা রাতের ভাত(আমরা বলতাম কড়কড়ে ভাত) শিং মাছের জমাট ঝোলে মেখে খেতে দিয়ে বলতেন-তাড়াতাড়ি তৈরি হ, অবনী স্যার আসবেন। শিক্ষা বলতে তখন আমি অবণী স্যারকেই বুঝি। এর আগে বিভিন্ন বন্ধুদের বাড়ি বা মেজদি’র সঙ্গে স্কুলে গিয়ে দেখেছি। পড়া না পাড়লে স্যাররা বেত দিয়ে পেটান। অবনী স্যারকে প্রথম দেখে আমার স্যার ভাবতে কষ্ট হচ্ছিলো। এতো সাধারন মানুষ। আমার গনেশ কাকার( গনেশ চন্দ্র বিশারদ, আমাদের শিক্ষক ,বাবার সবচে ঘনিষ্টজন ও আমাদের পরমায়) মতো ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা নাতো? পুরানো ধূতি পড়া, তামাটে বর্নের মানুষ গায়ে কম্বল জড়ানো। শীতর কুয়াশা চিরে কাঁপতে কাঁপতে আসতেন। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে পথ চলতেন। তার গান বুঝতে বুঝতে তিনি গান বন্ধ করে দিতেন। তাই একদিন আড়াল থেকে শুনলাম তার গান। তিনি গাইতেন- নিধু বনে , শ্যামের বাঁশি বাজে। এসেই একটা চাটাই টেনে রোদ্দুরে বসতেন। বলতেন, পান্তা ভাত খেয়ে এসেছিতো একটু শীত শীত লাগে। এসো রোদ্দুরেই বসি। আমি রোদ্দুরে তার মেহনতী হাতের ভেতরে আমার হাত রেখে শ্লেটে লিখতাম। আর সুর করে পড়তাম- এই লেখিলাম স্বরে অ, এই লেখিলাম স্বরে আ ইত্যাদি। দ্রুত আমি লিখতে শিখলাম। একা একা কত কথা যে লিখতে থাকতাম তা আর মনে নেই। লিখে মুছতে হতো। আমার মুছতে কষ্ট লাগতো। প্রশ্ন জাগতো পড়ালেখা মানেই কি শুধু মুছতে মুছতে এগিয়ে যাওয়া? বাবা মাঝে মধ্যে অবনী স্যারকে বলতেন, কি ব্যাপার ছাত্রদের পিটাওনা কেন? হে হে হাসিতে মুখ ভাসিয়ে বলতেন, ওদের মারতে হবে না। inside_fb1-1_2017এমনিতেই ভালো পারে। অবনী স্যার সময়ে আামার ভেতরে জন্ম নেয়া প্রথম শিক্ষক। একজন মানুষ কত বিনয়ী হতে পারে সেটা আজ বুঝতে পারি। অবনী স্যারকে দিয়ে আামার চিন্তার বিকাশটা এতদূর ছড়িয়ে ছিলো যে, আমি আজও অবনী স্যারকে আবিস্কার করি। আমি বাড়ির পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে এক সময় স্কুলে যাই। আমার স্কুল জীবন শুরু হতে অবনী স্যার আমাকে পড়ানো থেকে বিদায় নেন। তারপর একবার অবনী স্যারকে এক মাঠে কাজ করতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। স্যার কৃষক? আমার সঙ্গে থাকা আমাদের সুধীর কাকা বলেছিলেন, তিনি সামান্য লেখাপড়া জানেন। নিজের জমি-পরের জমিকে কাজ করেন আর টিউশনি করেন। আমি সব কথা বিশ্বাস করেছিলাম আর একটি কথা শুনে কষ্ট পেয়েছিলাম। অবনী স্যার কম লেখাপড়া জানলে এত ভালো মানুষ ও শিক্ষক কিভাবে হয়? তখন মূল্যায়নের তর্জমা না বুঝলেও অবনী স্যারকে বুঝেছিলাম। স্কুল-কলেজ শেষ করলেও অবনী স্যারকে আজও আমি খুঁজে পাইনি। শুনেছিলাম তিনি অভাবে জমি -বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। আজও রাত হয়, দিন হয়। শীত আসে, শীত যায়।অবনী স্যারকে কোথাও দেখিনা। তবু ঘুমের ভেতরে নিরাপদ দূরত্বে এগিয়ে যেতে যেতে, কার্নিশ পেরোনো বিড়ালে থাবাচাটা শব্দ শুনতে শুনতে আমার মনে হয়,অবনী স্যারকে। যিনি আমাকে অক্ষরজ্ঞান দান করেছিলেন।

ছবি: লেখক