‘ও’ তে ‘ওড়না’ বিতর্কে আমরা

বিতর্কের মূল জায়গাটা হচ্ছে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দের ব্যবহার নিয়ে। বিতর্কের সূত্রপাত বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণীর পাঠ্য বইতে বাংলা ভাষায় বর্ণ পরিচয় উপস্থাপন। আলোচনার জায়গাটি আরও সংক্ষিপ্ত করে বলা যায়, কয়েকদিন আগে যে নতুন পাঠ্য বই বিতরণ করা হয়েছে সেখানে প্রথম শ্রেণীর বাংলা বইতে দেখা যাচ্ছে ‘ও’ বর্ণটি দিয়ে ‘ওড়না’ পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। বইতে বলা হয়েছে, ‘ও’ তে ‘ওড়না’ চাই।প্রথম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ওড়না-বিতর্ক
এই ইস্যুটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তৈরী হয়েছে বিতর্ক। কেউ বলছেন, ‘ও’ বর্ণ দিয়ে ওড়না শব্দটি সামনে নিয়ে আসা একেবারেই ঠিক হয়নি। আবার অনেকের বক্তব্য, সমস্যা কোথায়, ওড়না তো আমাদের দেশে অপরিচিত কোন বিষয় নয়!
বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাবিদদের কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেছেন, ‘ও’ তে ‘ওড়না’ শব্দটি ব্যবহার না করে ভিন্ন কোন শব্দ ব্যবহার করা যেত। বিবিসি বাংলা সার্ভিসের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, “বাংলা ভাষায় শব্দসম্ভার বেশ সমৃদ্ধ। সেজন্য ওড়নার স্থলে অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করাই যেত।’
বাংলাদেশে মেয়েদের পোশাকের যে বিবরণ তাতে ওড়না বিষয়টি সকলেরই পরিচিত। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই অতিপরিচিত একটি সহ পোশাকের নাম ব্যবহার করায় কী এমন বড় ভুল হলো? আসলে মূল আলোচনার জায়গাটি হচ্ছে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দের ব্যবহার নিয়ে। প্রথম শ্রেণীতে পাঠ গ্রহণকারী একটি শিশু কন্যার কাছে ওড়না শব্দটির প্রয়োজনীয়তা বা পরিচিতি কোনটাই তৈরী হয়নি। সেখানে এরকম একটি শব্দের ব্যবহার ছোটবেলা থেকে তার মনে তৈরী করছে নারী আর পুরুষের পার্থক্য। সূচনাতেই এক ধরণের জেন্ডার বৈষম্য তৈরী হচ্ছে তার মনে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ওড়না তো বাঙালী মেয়েরা সবসময়ই ধারণ করছে, ছোট বয়সে একটি কন্যা শিশু তা শিখলে ক্ষতিটা কোথায়? আমরা একটি বিষয় ভেবে দেখছি না, প্রথম শ্রেণীতে পাঠ গ্রহণ করতে আসা শিশুরা যদি জানতে চায় ওড়না কেন ব্যবহার করা হয় তখন শ্রেণী শিক্ষক অথবা অভিবাবক কী উত্তর দেবেন? যারা শিশুদের পাঠক্রম নির্ধারণ বা বাছাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন তাদের একটি বিষয় আগে ভাবা উচিত ছিল যে একেবারে ছোট বয়স থেকে নারী ও পুরুষে পার্থক্য তৈরী করে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করা কতটা সঠিক। imageকোন ক্লাসে এ ধরণের শব্দ পড়ানো হচ্ছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের বয়স কত, সে বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের জন্য জেন্ডার নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ।
এই প্রসঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। জড়িয়ে যায় চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টিও। নারীর স্বাধীন বেড়ে ওঠা এবং চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিষযটিও এখানে বিবেচনার দাবি রাখে। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আইন শৃংখলার দিকটি আমাদের যেমন ভাবনার মধ্যে রাখতে হবে তেমনি একই ভাবে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতার দিকটিও মাথায় রাখা প্রয়োজন। চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা বেশীরভাগ সময়ে উল্টো ফলাফল বয়ে আনে।

নেপিশা বেগম

ছবি: ইন্টারনেট