পাহাড়ে হেলান দিয়ে আকাশ ঘুমায় ওই …

দেশের মধ্যেই এমন এক জায়গা আছে যাকে বাংলার দার্জিলিং বলা যেতে পারে, সেখানে মেঘ এসে গা ভিজিয়ে দেয়, ঝাপসা করে দেয় চারদিক। অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আর এক নাম সাজেক। অবস্থান রাঙামাটি জেলায়। কিন্তু যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। সাজেক ভ্যালির অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কথা অনেক শুনেছি আর সেই থেকেই মনের কোণে  দানা বাঁধে সাজেকে যাবার ইচ্ছা।

আমরা ১২ জন মিলে একটা দল তৈরি করে ফেলি। এবার আমাদের প্রস্তুতি সাজেক ট্যুর নিয়ে। অফিস শেষ করে তারা হুড়ো করে এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনে ট্রেনে- কমলাপুর হয়ে আরামবাগ বাসস্টেশন যাব বলে রাত ১১,৩০ মিনিটে সেইন্টমার্টিনস পরিবহন বাসে চেপে খাগড়াছড়ি তার পর সাজেক এর উদ্দেশে যাত্রা। সারাটা রাত বাসে হইহল্লা ।

IMG_3872

কখনো গলা ছেড়ে বেসুরা কণ্ঠে গান। বাসে আমাদের মতো আরও দুইটা দল ছিল তাই কোন সমস্যা হয়নি। তাদের ও আনন্দের মাত্রাটা আমাদের মতই আকাশের মতো বিশাল । চলতি পথে মহাসড়কের জ্যামে গাড়ী থেকে নেমে আনন্দের বহি:প্রকাশ। এক সময় সূর্যমামা ও আমাদের সঙ্গ দেবার প্রস্তুতি নেয়। যেন আমাদের সঙ্গে আজ সূর্য মামার ও বাঁধভাঙ্গা আনন্দ। তখন ও কারো চোখে ঘুম নেই – নেই ক্লান্তির কোন রেশ , দুর থেকে চোখে পরছে উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি যেন কোন দানব পথের মাঝে দাড়িয়ে আছে ।আমাদের সবুজে ঘেরা পাহাড়ের রাজ্যে স্বাগত জানাতে। চোখ জুড়ানো প্রকৃতির রূপ সৃষ্টির এমন রূপের কথা প্রকাশের ভাষা আমাদের নেই। সকাল ৭ টায় গিয়ে পা রাখলাম খাগড়াছড়িতে। হোটেলে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পরলাম খাগড়াছড়ির পথে-পান্তরে , কখন ও পাহাড় কখনো ঝর্ণা কখনো পাহাড়ি গুহা -কখনো সবুজে ঘেরা প্রকৃতি । ঠিক এমন এক সময় দেখা মিলে মাটির মাঝে থেকে উঠে আসা এক সাদা মনের মানুষের – এতে আনন্দের মাত্রাটা যেন আরও শতগুন বেড়ে গেল , মানুষটি আমাদের সকলের প্রিয় আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান স্যার- এরকম মানুষকে কাছে পেয়ে কুশল বিনিময়য় করতে আর দেড়ি করলাম না- ছুটে গেলাম স্যার এর কাছে। সারাটা দিনের ক্লান্তি শেষে হোটেলে এসে স্বপ্ন সাজেক নিয়ে উত্তাল আলোচনা । পরদিন সকালের মিস্টি রোদ আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু পাহারের আঁকাবাঁকা পথ ধরে – সাজেক যাওয়ার পথটা খেনও পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক বলে ধরা হয়। যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ক’বছর আগেই রাস্তাটা বানিয়ে শেষ করেছে। আমাদের মত ভ্রমণ পিপাশুদের জন্য। দীঘিনালা তারপর বাঘাইহাট থেকে সাজেকের পুরো রাস্তাটাই প্রকৃতির অপূর্ব সুন্দয্য মেলিয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়ে যাচ্ছে। পথের দু পাশের মনোরম দৃশ্য । আবার কোথাও কোথাও এমন খাড়া – ঢাল পথ। পাহাড়ি রাস্তায় অভিজ্ঞ ও দক্ষ চালকের বাহনে সওয়ার না হলে মুহুর্তেই বিপর্যয় হতে পারে। বেশির ভাগ সময় রাস্তাটাকে রোলার কোস্টার মনে হচ্ছিলো ।

খাগড়াছড়ি থেকে রওনা হয়ে দীঘিনালা পার হওয়ার পরই অদ্ভুত মন ভালো করে দেওয়া একটা ব্যাপার চোখে পড়লো যা মনকে অন্য এক ভালোলাগা ভরিয়ে দেবে। – দূর থেকেই গাড়ির আওয়াজ পেয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা ছুটে এসে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ে স্বাগত জানায়। ওদের এভাবে অভিবাদন জানানোর কায়দাটা শিখিয়েছে কে কে জানে, কিন্তু দৃশ্যটা ভারি চমৎকার। হয়তো সকলের মনেই সাজেক বললেই মনে এই স্মৃতিটা উঁকি দেবে।IMG_4224

সবুজে মোড়ানো প্রকৃতির মাঝে আঁকাবাঁকা স্বপ্নিল পথ বেয়ে দুঃসাহসিক এই ভ্রমণ যেখানে শেষ সেটাই সাজেকের মূল কেন্দ্র। নাম রুইলুই পাড়া। ছবির মতো পথঘাট, পথের দুপাশে লাল-সবুজ রঙের বাড়ি। কাছে-দূরের সব পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মেঘ জমে আছে।

আর সাজেকে পা রাখতেই দেখি দুরের ওই কংলাক পাড়া একরাশ সাদা মেঘে ডুবে আছে। তাই কোন কিছু না ভেবেই মেঘ ধরার জন্য ছুটলাম কংলাক পাহাড়ে কিন্তু আমরা যেতে যেতেই মেঘ উধাও। যে মেঘের জন্য এতো কষ্ট করলাম এক সময় সেই মেঘের রাজ্যেই হারিয়ে গেলাম। বিকেলবেলা পুরো সাজেক পাহাড় ঢেকে ছিলো মেঘের চাদরে। আমারা যে রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম সেই রুমের জানালা আর দরজা দিয়ে রাশি রাশি মেঘ ঢুকছিলো ঘরে। সেই এক অন্য রকম অনুভূতি । সাজেকের প্রতিটা ক্ষণেরই আলাদা আলাদা রূপ আছে। আমরা প্রতিটি বেলায় সাজেকের বদলে যাওয়ার রূপ দেখেছি। সাজেকে রাতের অভিজ্ঞতাটা একেবারেই অন্য রকম। রাতে মেঘেঢাকা সাজেকের রাস্তায় সৌরবিদ্যুৎ চালিত ল্যাম্পোস্টের নিচে বসে আড্ডা ,গলা ছেড়ে গান । আকাশভরা তারা,পাহাড়ের কোলে জমে থাকা মেঘগুলোকে মনে হতে পারে নদী কিংবা জলাশয়। খুব ভোরে উঠে আবার মেঘ ধরার জন্য সবার দৌড়। সাজেক হেলিপ্যাড বসে ভোরের মেঘের আনাগোনা দেখা , হঠাৎ হঠাৎ এক টুকরো মেঘ অথবা বৃষ্টি এসে নাম মাত্র ভিজিয়ে দিয়ে যায়,  এভাবেই বদলে যায় সাজেকের দৃশ্যপট। এরই মাঝে মেঘ সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি এসে ঢেকে দিলো চারদিক এমন মেঘে ছেয়ে থাকা তার উপর বৃষ্টিভেজা সকাল- তাই সকালের নাস্তায় ভুনাখিচুড়ির বিকল্প কিছুই ছিলো না।

IMG_3997

সাজেক
আজ পাহাড় ট্র্যাকিং ও দুর্গম গিরিপথে চলা শুরু। চার পাশে পাহাড় আর ঘন অরণ্য, তার মাঝ দিয়ে চলছি মনের আনন্দে হেঁটে । দেহ মনে কোনো ক্লান্তি আসেনি, আসেনি কোনো ভাবনা, আর এখানে নৈঃশব্দের অরণ্যে হেঁটে চলা কতটা যে রোমাঞ্চকর, তা শুধু অনুভবই করা যায়, বর্ণনা করা যায় না। প্রায় ২ ঘণ্টা হাঁটার পর প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি আবিষ্কার করি। ছোট ঝর্নার জলরাশি সুন্দরভাবে সেজেগুজে আছে, যার তুলনা হয় না। এখানে বেশ কিছুক্ষণ শীতল পানি  লাফালাফি করে আবারও হাঁটা শুরু করি। এবারের পথটা যেন আরও রোমাঞ্চক আরও বেশি হূদয়ে গেঁথে থাকার মতো সুন্দর। দু’পাশের পাহাড় উঁচু হয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে, বিশাল আকৃতির গাছগুলো যেন তার সাথে পাল্লা দিচ্ছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে অনেক পাথর।

আঁকাবাঁকা  উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ ধরে গিরি পথে হেটে চলা, নিশ্চচুপ গহীন বনের ভিতর যতই এগিয়ে যাচ্ছি ততই পাহাড়ের সৌন্দর্য্য মুগ্ধ করে তুলছে। শুধু পাহাড়ের গাম্ভীর্য, পানির কলকল বয়ে চলা আর অচেনা পাখির ডাক। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে এখানে আকাশ ঘুমায়, পাহাড়ের বন্ধনহীন মিলন দেখা যায়। কোথাও কোথাও তুলার মতো দলছুট মেঘের স্তুপ ভেসে বেড়ায় পাহাড়ের চূড়ায়, এ এক যেন স্বপ্নরাজ্য।

খাগড়াছড়ি থেকে জীপগাড়ি (লোকাল নাম চাঁন্দের গাড়ি) রিজার্ভ নিয়ে একদিনে সাজেক ভ্যালী ঘুরে আসতে পারবেন । ভাড়া নিবে ৫০০০-৬০০০ টাকা । এক গাড়িতে ১৫ জন বসতে পারবেন । লোক কম হলে শহর থেকে সিএনজি নিয়েও যেতে পারবেন তাতে ভাড়া ৩০০০ টাকার মতো নিবে । অথবা খাগড়াছড়ি শহর থেকে দীঘিনালা গিয়ে সাজেক যেতে পারবেন । খাগড়াছড়ি থেকে বাসে দীঘিনালা জন প্রতি ৪৫ টাকা এবং মোটর সাইকেলে জন প্রতি ভাড়া ১০০ টাকা। দীঘিনালা থেকে ১০০০-১২০০ টাকায় মোটর সাইকেল রিজার্ভ নিয়েও সাজেক ঘুরে আসতে পারবেন । ফেরার সময় অবশ্যই সন্ধ্যার আগে আপনাকে বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প পার হতে হবে । তা না হলে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে ।

কিভাবে যাবেনঃ ঢাকা থেকে শ্যামলী , হানিফ ও অন্যান্য পরিবহনের বাসে খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন । ভাড়া নিবে ৫২০ টাকা । শান্তি পরিবহনের বাস দীঘিনালা যায় । ভাড়া ৫৮০ টাকা । এছাড়া সেন্টমার্টিন্স পরিবহনের এসি বাস খাগড়াছড়ি যায় ।

যোগাযোগঃ সেন্টমার্টিন্স পরিবহন – আরামবাগঃ ০১৭৬২৬৯১৩৪১ , ০১৭৬২৬৯১৩৪০। খাগড়াছড়িঃ ০১৭৬২৬৯১৩৫৮। শ্যামলী পরিবহন – আরামবাগঃ ০২-৭১৯৪২৯১ । কল্যাণপুরঃ ৯০০৩৩৩১ , ৮০৩৪২৭৫ । আসাদগেটঃ ৮১২৪৮৮১ , ৯১২৪৫৪ । দামপাড়া (চট্টগ্রাম)ঃ ০১৭১১৩৭১৪০৫ , ০১৭১১৩৭৭২৪৯ । শান্তি পরিবহন- আরামবাগ ( ঢাকা ) – ০১১৯০৯৯৪০০৭ । অক্সিজেন(চট্টগ্রাম) ০১৮১৭৭১৫৫৫২ । চট্টগ্রাম থেকেও খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন।

IMG_4245.CR2কোথায় থাকবেনঃ খাগড়াছড়িতে পর্যটনমোটেল ছাড়া ও বিভিন্ন মানের থাকার হোটেল আছে । দীঘিনালায় কয়েকটি হোটেল থাকলেও দীঘিনালা গেস্ট হাউজের মান কিছুটা ভালো । এছাড়া যাহার সাজেক ভ্যালীতে থাকবেন তাহাদের জন্য অনেক অনেক ভালো থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের সু-ব্যবস্থা আছে তাই তেমন ভাবনা-চিন্তার একদম কারণ নেই। ‘খাগড়াছড়ি’ পর্যটন মোটে: এটি শহরে ঢুকতেই চেঙ্গী নদী পার হলেই পরবে। মোটেলের সব কক্ষই ২ বিছানার । ভাড়া: এসি ২১০০ টাকা, নন এসি ১৩০০ টাকা । মোটেলের অভ্যন্তরে মাটিতে বাংলাদেশের মানচিত্র বানানো আছে । যোগাযোগ: ০৩৭১-৬২০৮৪৮৫ । হোটেল ইকো ছড়ি ইন: খাগড়াপুর ক্যান্টর্মেন্ট এর পাশে পাহাড়ী পরিবেশে অবস্থিত । এটি রিসোর্ট টাইপের হোটেল । যোগাযোগ:০৩৭১-৬২৬২৫ , ৩৭৪৩২২৫ । হোটেল শৈল সুবর্ন: ০৩৭১-৬১৪৩৬ , ০১১৯০৭৭৬৮১২ । হোটেল জেরিন: ০৩৭১-৬১০৭১ । হোটেল লবিয়ত: ০৩৭১-৬১২২০ , ০১৫৫৬৫৭৫৭৪৬ , ০১১৯৯২৪৪৭৩০ । হোটেল শিল্পী: ০৩৭১-৬১৭৯৫ । দীঘিনালা:  দীঘিনালা গেস্ট হাউজ: এটি দীঘিনালা শহরের বাস স্ট্যান্ডের উল্টো পাশে অবস্থিত । এটি দীঘিনালার আবাসিক হোটেল গুলোর মধ্যে একটু মানসম্মত । এখানে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে রুম নিয়ে থাকা যাবে । নূর মোহাম্মদ(ম্যানেজার) – ০১৮২৭৪৬৮৩৭৭। সাজেক ভ্যালী : ছায়াবিথী (হানিমুন কটেজ) : ১ রুম ২/৪জন (এক্সট্রা বেডে ২ জন এর জন্য আরো ৫০০ টাকা এড হবে) এটাচ বাথ ৩৫০০ টাকা মারতি রিসোর্ট : ১/২ বেড ২ জনের জন্য নন এটাচ বাথ ১২০০ টাকা,২বেড ৪/৬ জনের জন্য ২৫০০ টাকা। যোগাযোগ করুন : ০১৮৮২০০৯৫০০-০৪ সারা রিসোর্ট : ১ বেড ২ জনের জন্য, ২বেড ৩ জনের জন্য এটাচ বাথ ১৫০০ টাকা, ১ বেড ২ জনের জন্য নন এটাচ বাথ ১২০০ টাকা। মাখুম রিসোর্ট : ১ বেড ৩ জনের জন্য, এটাচ বাথ ২০০০ টাকা জীবনদাস রিসোর্ট : ২ বেড ৫ জনের জন্য এটাচ বাথ ৩০০০ টাকা। হাপিং টং রিসোর্ট : ১ বেড ২/৩ জনের জন্য ১২০০/১৫০০ টাকা, ২বেড ৫ জনের জন্য এটাচ বাথ ২৫০০ টাকা (এই উল্লিখিত ব্যয় ২০১৫ সালের জন্য প্রযোজ্য এবং যোগাযোগ এর তথ্য গুলো নেট থেকে সংগৃহীত ) ।

সম্রাট

  • Megh Duth

    নিউজ টা পড়ে অনেক কিছুই জানতে পারলাম , অনেক দিন আগে থেকেই খাগড়াছড়ি যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো। But সঠিক information এর অপেক্ষায় ছিলাম। ধন্যবাদ প্রাণের বাংলা কে…..

    • pranerbangla

      ধন্যবাদ আপনার মতামত এর জন্য .