কেন এই নিঃসঙ্গতা …

মানুষ কি একা? এই ভীড়ের ভেতরেও নিজের চিবুকের কাছে ভীষণ অচেনা ও একা? এই একবিংশ শতাব্দীতে রকেটের বেগে ছুটছে নাগরিক মানুষ। উদয়াস্ত কাজ আর ব্যস্ততার মাঝে তার দম ফেলবার ফুরসত কোথায়? কিন্তু তারপরেও নিজের মনের কাছে সে কখনো একা হয়ে যায়। নিঃসঙ্গতার গভীর চোরাবালি তাকে কি টেনে নেয় শূণ্যতার অনুভূতির ভেতরে? নগরের অধিবাসী আর নিঃসঙ্গতা হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটছে বহুকাল। কেমন সেই নিঃসঙ্গতা? এই অনুভূতি কতটা গ্রাস করে মানুষকে? কোথায় সে আশ্রয় খোঁজে তখন? এসব প্রশ্ন নিয়ে প্রাণের বাংলা মুখোমুখি হয়েছিল কয়েকজন বিশিষ্ট জনেরা। তারা জানিয়েছেন তাদের নিজস্ব ভাবনার কথা।

তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছ-হেলাল হাফিজ

প্রেসক্লাবে দেখা। একা একটা টেবিলে বসে আছেন ধ্যানস্থ কবি হেলাল হাফিজ। সামনে একটি একা চায়ের কাপ। সামনে বসে এ কথা-সে কথার ফাঁকে আচমকাই জানতে চেয়েছিলাম কবির নিঃসঙ্গতার গল্প। হাসলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে তাকিয়ে থাকলেন জানালা দিয়ে বাইরে। তখন খুব দূরের মানুষ মনে হচ্ছিলো তাকে। অনেকটা দূর থেকে দেখা দ্বীপের মতোন। খুব নিচু গলায় বললেন, মূলত প্রত্যেক মানুষই একা। সংসারের ভিতর  থাকলেই যে নিঃসঙ্গতা কাটে তা নয়।  আমি সংসার থেকে চিরকাল কিছুটা দূরেই। কিন্তু মধ্য যৌবন পরযন্ত নিঃসঙ্তার বোধ আমাকে কষ্ট দেয়নি। সময় ক্রমশ পার হয়েছে আর নৈঃসঙ্গের অনুভূতি এই একার ভেতরে আরও একা আমাকে চেপে ধরছে।
জায়গা বদল হলো আমাদের। কবি-ই উঠতে চাইলেন। আমরা গিয়ে বসলাম ক্লাবের লাইব্রেরীতে। ততক্ষণে কবির সঙ্গে বাক্যালাপ জমে উঠেছে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বললেন, আমি এখন থাকি তোপখানা রোডের একটা হোটেলে। হোটেল করণফুলি। সেখানে বসেই প্রথম লিখলাম একটা লাইন-তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছো। এরকম একটা লাইন আমাকে কখনো লিখতে হবে ভাবিনি। একটা সময় ছিলো নিজেই গভীর যত্নে নিঃসঙ্গতা তৈরী করেছি। কিন্তু সময় বড় ঘাতক। জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমাকে এই লাইন লিখতে হচ্ছে।
একসময় আমার মানসিক আশ্রয় ছিলো প্রেসক্লাবের জুয়ার টেবিল। আমাকে আমার নিঃসঙ্গ প্রহরে আশ্রয় দিয়েছে সিগারেট, মদ। এখন অবশ্য আমি এই আশ্রয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াই না। এখন আমার আশ্রয় ফেইসবুক। সময় কাটতে চায় না। তবুও তো একটা কিছুর অবলম্বন।
আমাদের কথা যেন হঠাৎ-ই ফুরিয়ে গেলো। দুজনে বের হয়ে এলাম বাইরে। হেলাল হাফিজ বিদায় নিলেন স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে ম্লান হেসে। মনে হলো ভীড়ের মধ্যে টিুপ করে হারিয়ে গেলেন একলা মানুষ।

একাকীত্বের মাঝে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়-শম্পা রেজা।

বিশিষ্ট অভিনেত্রী শম্পা রেজার কাছে নিঃসঙ্গতার অনুভূতিটা একটু অন্যরকম। নিঃসঙ্গতার ভেতরে তিনি বিষাদ খুঁজে পান না। তার কাছে মনে হয়, মানুষ এই পৃথিবীতে আসে নিঃসঙ্গ। ফিরেও যায় নিঃসঙ্গ অবস্থায়। কিন্তু তারপরেও মানুষের নিঃসঙ্গতার প্রয়োজ আছে। এই একাকীত্বের মাঝে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়।
শম্পা রেজার দিন শুরু হয় ব্যস্ততা দিয়ে। শুটিং  অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, মিটিং-একসঙ্গে অনেক কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন এই অভিনেত্রী। তাহলে নিঃসঙ্গতা তার কাছে ধরা দেয় কীভাবে? শম্পা রেজা নিজের ভেতরে একাকীত্বের সময়টাকে এনজয় করেন। প্রশ্নটা নিয়ে মনের ভেতরে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে বললেন, অনেক কাজের মধ্যে একা হয়ে মজা পাই আমি। অনেক কিছু তখন মনের মধ্যে খেলা করে। সেই পৃথিবীতে গান আছে, বই আছে। নিঃসঙ্গতার সৌন্দর্য্য আমি অনুভব করতে পারি। তখন নিঃসঙ্গতা আমাকে আনন্দ দেয়। broken-friendship
নিজের সেই একলা রাজ্যে অন্য এক পৃথিবীকে খুঁজে বেড়ান এই অভিনেত্রী। জানতে চেয়েছিলাম, যখন একা থাকেন তখন কী করেন? হেসে বললেন, নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। আমি নিজে তো এই মহা সৃষ্টির তুলনায় অতি ক্ষুদ্র। এই পৃথিবীতে কতকিছু আছে। তার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিই।
তবে একা হয়ে যাওয়ার কষ্টটাকেও উড়িয়ে দিলেন না শম্পা রেজা। বললেন, নিঃসঙ্গতার ভেতরে সৃষ্টির সূচনা হয়। সৃষ্টিশীল মানুষ নিজেকে উন্মোচিত করে সেখানে। আমি নিঃসঙ্গতার রূপটা দেখেছি।

ঘিরে থাকা নিঃসঙ্গতার মধ্যেও দু একজন মানুষ পাশে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে দেয় তখন স্বস্তি পাই-ফরিদ কবির

নিঃসঙ্গতার জট ছাড়াতে দিলে কবিরা কী করেন সেটা দেখার আগ্রহ নিয়ে এক দুপুরে মুখোমুখি কবি ফরিদ কবিরের। প্রশ্নটা শুনেই বললেন, মানুষ যখন সঙ্গ চায় তখনই সে নিঃসঙ্গ বোধ করে। নাগরিক মানুষ আসলে কোথাও তার অনূভূতিকে আশ্রয় দিতে পারে না। এই নগর নিষ্ঠুর এক জায়গা। নানা মত, নানা পথের মানুষ এখানে এক হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে এক জায়গায় করে রেখেছে স্বারথের  বন্ধন, তারা শুধু নিতে চায়। দিতে কেউ রাজি না। শহর তার ইতিহাসের শুরু থেকে মানুষের ত্যাগের সারল্যকে কেড়ে নিয়েছে। তাই নাগরিক সবসময়  একা।
আলোচনার ফাঁকে ফরিদ কবির তার দাপ্তরিক নানা কাজ করে যাচ্ছিলেন। এক সময় আমার সময়ও ফুরিয়ে এলো। ওঠার সময় নিজের কবিতার একটা লাইন শোনালেন। লাইনটা এরকম-মানুষ মূলত একা/ এমনকি জনসমাবেশেও।
নিঃসঙ্গতার এই অনুভূতির জট সত্যিই কি খুললো। নাকি তা আরও গভীর হলো? ফিরে আসার সময় কবির শেষ কথাটা কানে অনুরণন তুলছিলো-এই শহরে আমার জন্ম। কৈশোর, যৌবন থেকে এই মধ্য বয়স পযর্ন্ত শহরেই কাটিয়ে দিলাম। এই শহরের দালানকোঠা, পথের ধূলোর সঙ্গে সম্পর্ক আছে আমার। কিন্তু আমার নিঃসঙ্গতাও আছে। তবে যখন দেখি সেই অন্তরালে ঘিরে থাকা নিঃসঙ্গতার মধ্যেও দু একজন মানুষ পাশে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে দেয় তখন স্বস্তি পাই। ভালো লাগে। আসলে সব অভিজ্ঞতাই কাজে লাগে। আমি আমার লেখায় সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাই।

ভেতরে ভেতরে একজন শিল্পী তার সৃষ্টির সঙ্গে একা থাকে-শহীদুজ্জামান সেলিম

কথা হচ্ছিল অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিমের সঙ্গে শ্যুটিংয়ের ফাঁকে। একাকীত্ব অথবা নিঃসঙ্গতা নিয়ে অদ্ভূত কথা বললেন তিনি। তার ভাষায়, কেবল মূর্খরাই দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে ভালোবাসে। তারা সামাজিক প্রাণী হিসেবে পরিচিত হতে যায়। কিন্তু যারা জ্ঞানী তারা মৌনতার মাঝে, একাকীত্বের মাঝে আলাদা পৃথিবী নির্মান করে। সেই আলাদা পৃথিবীতে একটা শব্দ, আলাদা অনুভূতি তার ভেতরে নতুন এক ছবি আঁকে। 11006133_789450034469520_1925078754_n
তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, আমাদের চারপাশে এতো ভীড়, এতো যন্ত্র, বিনোদনের এতো উপাদান ভীড় করে আছে। সেখানে মানুষ কি সত্যিই একা? চায়ের কাপে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে কিছু একটা ভাবলেন এই অভিনেতা। তারপর বললেন, আপাতদৃষ্টিতে তো মনে হয় এতো যন্ত্র, এতো ভোগের সামগ্রীর ভীড়ে মানুষ একা নয়। তার একা হওয়ার সময় কোথায়? কিন্তু সত্যটা তো অন্য জায়গায় লুকিয়ে আছে। জন্মের সূত্র অনুযায়ী মানুষ আসলে একা। যারা জন্মের এই নিগুঢ় রহস্য বুঝতে পারে তারা একাই থাকতে চায়। একজন কবির সংসার নেই, একজন শিল্পীর সংসার নেই। ভেতরে ভেতরে সে তার সৃষ্টির সঙ্গে একা থাকে।

আমার নিঃসঙ্গতা নিয়ে আমি সুখী-শবনম ফেরদৌসী

শবনম ফেরদৌসী তথ্যচিত্র তৈরি করেন। অনেকদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। শবনম সিঙ্গেল মাদার। তার কাছে নিঃসঙ্গতা ধরা দেয় একটু অন্য মাত্রায়। শবনমের ক্যামেরা লেন্স বলে, নগরের মানুষ প্রতিদিন তার আবেগকে খুন করে। অন্য মানুষ তার এই অবেগকে বুঝতে পারে না। ফলে আবেগ মুছে দিয়ে আমরা শহুরে হতে চেষ্টা করি। চিন্তার ফরমে প্রবেশ করে বিকৃতি। মানুষ ক্রমশ একা হয়ে যায়।
শবনম মনে করেন শৈশব থেকেই তিনি একা। মনে মনে কথা বলতে তার ভালো লাগতো। সেই একা বোধটা মনে হয় এখনও তার মধ্যে রয়ে গেছে।
এই গভীর একাকীত্ব ঢাকতে মানুষ কী করে? শবনম বললেন, মানুষ একাকীত্ব কাটাতে শপিংয়ে যায় শাড়ি কেনে, সুগন্ধী কেনে, সেলফি তোলে। কিন্তু তাতে করেও শূণ্যতা তো দূর হয় না।
শবনম কাজের মধ্যে মুক্তি খোঁজেন। কারণ একটা বিষয় তিনি ভালো করেই বুঝে গেছেন, তার বোধের কোন সঙ্গী নেই। ভাবনা শেয়ার করা যায় না। তাই নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতা নিয়ে নিজেই সুখী শবনম। তার কাছে একাকীত্ব ভয়ঙ্কর। সেই ভয়ঙ্করের মাঝে সৌন্দর্য খোঁজেন তিনি।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে চমকে উঠেপাশে হাত দিই-খুঁজতে চেষ্টা করি সন্তানকে-স্বামীকে, বুঝতে চেষ্টা করি ‘একা’ হইনি তো হঠাৎ-রিনি বিশ্বাস।

রিনি বিশ্বাস পাশের দেশ ভারতের মানুষ। থাকেন শহর কলকাতায়। টেলিভিশনে উপস্থাপনা, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা আর সংসারের নানা কাজের মধ্যে ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু তার মধ্যেও নিঃঙ্গতার অনুভূতি ভাবায় তাকে। রিনির সঙ্গে কথা হচ্ছিলো অন্তরজালে। জানতে চেয়েছিলাম নিজের ভেতরে একাকীত্বের বোধটা টের পান কীভাবে? রিনি লিখলেন এভাবে-মাঝরাতে ঘুম ভেঙে চমকে উঠে বসি! হঠাৎ মনে হয় চারপাশে কেউ কোথাও নেই! আমি একা! ডুকরে কান্না আসে! ঘোর কাটলে বুঝতে পারি-ভাবনাটা ভুল, পাবলো তো পাশেই ঘুমোচ্ছে! এক-একদিন ঘুমের মধ্যেই কাঁদতে থাকি! উঠে বসে পাশে হাত দিই-খুঁজতে চেষ্টা করি সন্তা11043158_10155320785840013_3821226301534403317_nনকে-স্বামীকে, বুঝতে চেষ্টা করি ‘একা’ হইনি তো হঠাৎ? লিখতে লিখতে পেছনের কথায় ফিরে গেলেন রিনি। যেন খুঁজতে গেলেন বুকের ভেতরে রাখা একলা সময়ের সূত্র। একটু বিরতি দিয়ে রিনি আবার লিখতে শুরু করলেন-কতজনের কাছে শুনি একা থাকা তাদের কাছে বিলাসিতা! আমার কাছে একাকীত্ব দুঃস্বপ্ন! যেহেতু বাবা-মা চাকরি করতেন, ছোটবেলাটা কেটেছে খানিক একা-একাই; হরিদাসী মাসি থাকতো বাড়িতে- তবে সারাক্ষণ সে ঝিমোতো! তখন একা থাকাটা ছিল খানিক বাধ্যতামূলক! পরে যখন ভাই হল, সঙ্গী পেলাম। দায়িত্বও পেলাম বেশ ছোট বয়সেই। তারমধ্যেও মনে আছে স্কুল থেকে ফিরে টেবিলে বসে একা ভাত খেতে হত.. মা পরিপাটি করে সব ক্যাসারোলে সাজিয়ে রেখে যেতেন। তবু কান্না আসতো। কিছুতেই স্বাদ পেতাম না! এখনো একা খেতে বসলে কেন যেন সেই দুপুরগুলো মনে পড়ে! ভালো লাগেনা , যত ভালো খাবারই হোকনা কেন, তা খেতে! একা কোনকিছুই মনমত হয়না আমার! সদ্য পছন্দ করে কেনা বই এক নিশ্বাসে শেষ করেও শান্তি নেই যতক্ষণ না সেটার নির্যাসটুকু ভাগ করতে পারছি কারুর সঙ্গে। হাতে গোনা ক’জন আছে যারা আমার এই ভাগাভাগির অত্যাচারে জর্জরিত! আমার ভালোলাগা যাদের ভালো না লাগলেও-তারা ভাগ নিতে বাধ্য!! বই পড়া-গান শোনা-সিনেমা দেখা- ভালোমন্দ খাওয়া-বেড়ানো-ঘোরা এমনকি বুড়ো হতে চলার প্রতিটা মুহূর্তেই সঙ্গী চাই আমার! বাবা-মা-ছেলে-বর-আত্মীয়-বন্ধু, নির্দিষ্ট কিছুজনকে বাদ দিয়ে আমার ‘আমি’ সম্পূর্ণ হয়না আজও!
জানতে চাইলাম শেষ বয়সে পৌঁছে কী করবেন? তখন তো নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরবেই। রিনির লেখা আমাদের জানালো-বয়স বাড়ছে, নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি আপ্রাণ যে এই সমীকরণ এত সরল নয়; সবার নিজের নিজের জীবনের অঙ্ক আছে, সেটা মেলাতে সবাই যার যার মত ব্যস্ত! একসময় তাই আমাকেও ‘একা’ আমিতেই সন্তুষ্ট হতে হবে। চেষ্টা করি বুঝতে, পারি কই? কোন এক মুহূর্তেও আমি একা ভাবলে বাঁচার ইচ্ছেটুকুও চলে যায়… জানিনা প্রার্থনা করি কার উদ্দেশ্যে, তবু করি যেন ‘একা’ হতে না হয় আমায়; যে ক’টাদিন বাঁচবো, যেন ভালোবাসার মুখগুলো আশপাশে থাকে, ঘিরে…  (অদ্বিত আহমেদ)