প্রথম প্রেমের মতো আমার শহর

irase

ইরাজ আহমেদ

দিন যায় এই শহরে। মানুষ মরে যায়, শহর মরে না। অনেকটা সময় আমরা কাছাকাছি আছি-আমি আর আমার শহর। আমি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছি, আয়ু কমে আসছে। শহরের আয়ু বাড়ছে। মাঝে মাঝে ঈর্ষা করতে ইচ্ছে হয় শহরটাকে। আমি থাকবো না, শহর থেকে যাবে। এই শহরের আকাশে এখন ধূলোর পতাকা ওড়ে। ভোরের জাগরণ থেকে নিশিথের নির্জনতা তছনছ হয়ে যায় শব্দের ভয়ঙ্কর উল্লাসে। সামান্য তণ্ডুলকণা সংগ্রহের জন্য মানুষের অবিশ্রাম ছুটে চলা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হই। কনুইয়ের সফল ব্যবহারে ছিটকে পড়ি আপন কক্ষপথ থেকে। তখন নিজেই নিজের কানের কাছে মুখ এনে বলতে ইচ্ছে হয়-পালাও। কিন্তু পালানো হয় না। পালাতে পারলাম না। সেই কতগুলো বছরর ধরে আটকে আছি এই শহরের মায়াজালে।
এই শহরের মায়াজালটা কেমন? কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারবো না। কিন্তু যখন অনেক দিনের জন্য এই শহর ছেড়ে বাইরে যাই তখন রাস্তার মাথায় সিগারেটের দোকানীর জন্য মন হু হু করে ওঠে। ওষুধের দোকানের সামনে বসে থাকা আনমোনা, উদাস কুকুরটার জন্য কষ্ট হয়। রাতেরবেলা এবড়ো-খেবড়ো ফুটপাতে হাঁটতে ইচ্ছে হয়। অনেক দূরের শহরের আলোজ্বলা, ঝকমকে হাতছানি পেছনে ফেলে ছুটে আসতে ইচ্ছে করে চেনা সব্জীওয়ালার কাছে, মাছের দোকানীর কাছে। ম্লান, ভীষণ আগোছালো, ময়লা মাখা আমার শহরের কাছে। হয়তো একেই মায়াজাল বলে। সেই মায়াজালেই বন্দী হয়ে আছি।

আমি জন্মেছি এই শহরে। তখনও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বড় হয়ে উঠেছি নিরিবিলি, শান্ত পুকুরের মতো এক শহরে। ঢাকা তখন রাত দশটার পর আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো। রিকশায় স্কুলে যেতে ভাড়া লাগতো বারো আনা;মানে পচাত্তর পয়সা। তখন শীতের ভোরে রেসকোর্স মাঠের(এখন সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) পাশে রেসের ঘোড়া দেখতাম। কুয়াশা ভেদ করে জকিরা ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কোন ঘোড়া অস্থির পা ঠুকছে। এখন সে সব কথা ভাবলে গল্প মনে হয়। গল্প মনে হয় শাহবাগ হোটেলের মোড়ে কৃত্রিম ফোয়ারাকে। ছুটির দিনে পানির ধারা ছড়িয়ে যেতে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতাম। বাবার সঙ্গে নিউমার্কেটে গিয়ে নরোম গন্ধওয়ালা কেক খেতাম লাইট বেকারিতে। বইয়ের দোকানে উপুড় হয়ে বসে বই দেখতাম।

তারপর আমার চোখের সামনে কত বদলে গেল এই রাজধানী। আমরা নতুন দেশ পেলাম। নতুন আলো জ্বলে উঠলো শহরে। মানুষ বদলে গেলো, মানুষের মুখের ভাষা বদলালো। পোশাকের ঢং পাল্টালো, দেখার চোখ বদলালো। আমি বেড়ে উঠলাম। এই শহরে ভালোবাসলাম, কষ্ট পেলাম, একা থাকলাম, সংসারের তাবু ফেললাম।মনের গভীরে একটি শহরের বদলে যাওয়ার গল্প ক্রমশ জমা করলো তিক্ত স্বাদ। ভীড়, যানজট, অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার গলা জড়িয়ে ধরে এখন বেঁচে থাকি এই শহরে। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করি সুযোগ পেলে এই শহরকে। কিন্তু তারপর দিন শেষে? সন্ধ্যাবেলা আবার ফেরা শহরের কাছে। খুঁজে ফেরা আরেক শহর। সে শহর আমার শহর। সেখানে মায়ার জাল ছড়িয়ে আছে। সে জাল কাটা গেলো না এতো বছরেও। প্রথম প্রেমের মতো এই শহর আমার।