আমাদের মিনু মাসি

sila

শিলা চৌধুরী

মেদিনীপুর জেলার ছোট এক গ্রাম  এগরা, সেখানেই জন্ম আমাদের মিনু মাসির। সেই গ্রাম পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের গ্রামের খুব কাছেই। দু বোনের মধ্যে বড় মিনু মাসি। খুব ছোটবেলায় বাবা মাকে হারানোর পর জেঠুর সংসারে ঠাঁই জোটে দু বোনের। বড়ই অদ্ভূূত আর অসাধারণ জীবনী শক্তি মিনু মাসির। আর জীবন, সেও শ্ররৎচন্দ্রের উপন্যাসের নায়িকারই  মতো।

জেঠুর সংসারেও অভাব থাকায় দু তিন দিনেও খাবার জুটত না। ধান কাঁটার পর ক্ষেতে  ফেলে যাওয়া ধানের ছড়া কুড়িয়ে ধান জমাত। সেই দিয়ে কিছু দিন খাবারের ব্যবস্থা হতো।
জেঠুর পোষা ছাগল চরাতে নিয়ে গিয়ে ছাগলের গলায় দড়ি ধরেই ঘুমিয়ে পরতো। কারো গাছের কাঁঠাল পাকলে গাছে চড়ে কাঁঠাল খেয়ে আবার খোসা দিয়ে ঢেকে  গাছেই রেখে আসতো আর খোঁজ পড়লেই সেটা কে খেয়েছে কে খেয়েছে…… আর কেউ নয়…..এটা মিনুরই কাজ….. আর রক্ষে কোথায়……ধরে এনে বেদম মার। গাঁয়ে যাত্রাপালা বসলে দুপুরবেলা গিয়ে যাত্রমঞ্চের নিচে শুয়ে ঘুম….রাত হলেই মঞ্চের সামনে বসে আবার ঘুম। এখন জানতে চাইলে,…ওহ মাসি কি যাত্রা পালা দেখছিলে ? মাসি…হেসে লূটোপুটি খেয়ে বলে যায় ….আর বলনা সীতার বনবাস, আর দেখেছি আলীবাবা, কাঠুরিয়ার, রাজকন্যের সাথে প্রেম… আর বাকিগুলো কি মনে আছে সে কোন কালের কথা।
কাজ করতে এসেই আগে আমার পোষ্য সারমেয় কন্যা অনির সাথে খেলা করবে। দুজনের মধ্যে  খুবই  সখ্য।  আর একা একা বকবক করতে করতে কাজ করে যাবে ঝড়ের গতিতে। কেউ জানতে চাইলে, মাসি কলকাতা কবে এসেছো…সহাস্যে উত্তর ইন্দিরা গান্ধীকে মেরেছে যে বছর, সেই বছর। আর বাকি কিছু জিঙ্গস করতে হয় না….। শ্রোতা কেউ পাশে থাকুক আর নাই থাকুক তার জীবনী বলা শুরু হয়ে যায়। বাবা মা ছিল না তো তাই জেঠু এগার বছর বয়সে ধরে বিয়ে দিয়ে দেয় এক ঘাটের মরা দাদুর কাছে। ওই যে বছর আকাল হলো, কত মানুষ মরলো না খেয়ে সে বছর গো। আর বুড়া দাদুর ১৭খানা গরু, ১১খানা বিড়াল আর জুটেছে ১১বাচ্চা জন্মানোর পর একজনও বেঁচে না থাকা এক সতীন। মিনু মাসির দু মেয়ে জন্মের পর ঘাটের মরা দাদু ও পগার পাড়, তখন ছোট মেয়ে সবে ৬ মাসের।
তারপর শুরু হয় দু মেয়েকে নিয়ে লড়াইয়ের জীবন। সেই ৮৪ সালে একজনের সাথে চলে আসে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায়। কাজ জোটে কুমোরটুলিতে ২৫ টাকা মাইনেতে। প্রতীমা শিল্পীদের ফাই ফরমাশ করে দেয়ায় তাতে দু বেলা খাবার জুটত কিন্তু নিজের আর মেয়েদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হতো না। কুমোরটুলিতে কাজ পাইয়ে দেয়া মানুষটার সাথে আস্তে আস্তে বন্ধুত্বের সর্ম্পক গড়ে ওঠে,এক সময় তা প্রেমে পরিণত হয়। সেই প্রেমিকের সাথে মাঝে মধ্যেই শিয়ালদহের প্রাচীতে নয়তো হাতি বাগানের দর্পনা, মিত্র ও মিনার হলে এসে সিনেমা দেখতো। লোকটি ছিল বিবাহিত আর যথারীতি মেদিনীপুরের বাড়ীতে ফেলে রেখে আসা ওনার স্ত্রীর কানে পৌঁছায় কলকাতার পরকিয়ার কথা। আর যায় কোথায় কীটনাশক খেয়ে পুকুরে ডুবে আত্নঘাতী হবার চেষ্টা  প্রেমিক পত্নীর। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় আর তা দেখতে প্রেমিকের সাথে মেদিনীপুরে  ছুটে যায় মিনু মাসিও। গ্রামে পঞ্চায়েত বসে আর সেখানে কপাল জোরে নির্দোষ প্রমাণিত হয় মিনু মাসি। কদিন গ্রামে থেকে প্রেমিকের স্ত্রীর সেবা যত্নও করে। আর তা থেকে দু জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়।সেই বন্ধুত্ব আজও বজায় রেখেছেন মিনু মাসি। এখন দুজনই বেয়াই- বেয়াইন। প্রেমিকের ছেলের সাথে ছোট মেয়ে বসুমতীর বিয়ে দেন। প্রতিবছর দু বার করে গ্রামে যান আর প্রেমিকের বাড়ীতে ওঠেন গিয়ে। গেলোবার পূজোর সময় মিনু মাসি প্রেমিকের জন্য ধুতি পাঞ্জাবী আর বেয়াইনের জন্য শাড়ী কিনে নিয়ে যান নিজের ছয়  বাড়ীতে ঘর মোছা আর বাসন মাজার রোজগার থেকে। সেই প্রেমিক এখন চোখে দেখতে পান না, পারকিন্সন এ ভূগছেন। প্রতিবার দেখা করে ফেরার সময় ভদ্রলোকের হাতে লুকিয়ে গুঁজে দিয়ে আসেন কিছু টাকা বিড়ি খাবার জন্য145901228397008
তারপর  কুমোরটুলির কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন দমদম পার্কের নাগের বাজার। দু মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় মেয়ে বাসন্তির অভাবের সংসার। একশ দিনের কাজের প্রকল্পে  মাটি  কাটার কাজ করে  বড়  মেয়ে। কদিন পর দু হাজার তিন হাজার করে টাকা পাঠান নিয়মিত বড় মেয়েকে। থাকেন ছোট মেয়ে বসুমতীর সংসারে। সেখানে মাস কাবারি গ্যাস, তেল, সাবান, বিকেলের টিফিনের চা-বিস্কিট মুড়ি সহ নিজের জন্য সবজি, মাছ কেনার টাকা এসব খরচ দেবার পরই শুধু রাত্রি বাসের জন্য জায়গা জুটেছে তার। ছয়  বাড়ি কাজের পাশাপাশি মেয়ের সংসারে ঘর মোছা,বাসন মাজা আর তিনবেলা কর্পোরেশনের দেয়া জল ও সংগ্রহ করার দায় উনার। এতকিছুর পরও মিনু মাসির বকবকের কোন কমতি নেই। রোজ নতুন কিছু তার গল্পে থাকবেই। বাড়ীর পাশেই ডায়মন্ড প্লাজা শপিং মল।বিকেলে আরো দুই  বান্ধবী মিলে সেই শপিং মলের সামনের রাস্তায় বসে আড্ডা দেয়া  এখন তাদের বিনোদন হয়ে দাড়িয়েছে। আর সেই গল্প পর দিন আমাদের হজম করতে হয়। KFC কে উনি BFC বলবে……আর বলবে কচিকচি ছেলেমেয়েগুলো উচ্ছন্নে যাচ্ছে…হাফ প্যান্ট পরে মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বসে আড্ডা দেয় আর কি যে করে বৌমা জান না লজ্জায় মরে যাবে তুমি দেখলে। কলি কাল গো কলিকাল।আর কি যে একটা বাক্স আবিষ্কার  হলো মোবাইল না ছাই…Facebook  গো Facebook মাথা খেলো ছেলে মেয়েদের। আমার নাতিটা কি করে জান, সারা রাত চাঁদর মুড়ি দিয়ে Facebook. চালাবে আর আমার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করে বান্ধবীকে চিলি চিকেন আর পিৎজা খাওয়াবে। দুচক্ষে দেখতে পারি না আমি Facebook। আবার একটু পর নিজেই হেসে লুটোপুটি খাবে আর বলবে জান উপরের মুন্নির বর শুভেন্দু আমার বলে ওহ মাসি কালকে মেকাপ করে আসবে। আমার ছবি নাকি Facebook. দেবো গো। শিবুও বলে ভাল হবে মাসিকে আবার বিয়ে দেবো আমরা…………। আবার উঁকি মেরে পাশের ঘরে দেখে নেবে  আপন (আমার কর্তা তাকে ছেলে আর আমাকে বৌ মা বলে) কি করছে, না শুনে ফেললো উনার কথা আর বলবে মরি মরি ছেলেটা শুনলো বুঝি। পাশের ঘর থেকে মাসির ছেলে আপন আবার ফোড়ন কাটবে, চল মাসি ডায়মন্ড প্লাজায় জিন্স আর গেঞ্জি কিনে আনি তোমার জন্যে তারপর  ওগুলো পরে ছবি তুলে Facebook  দেব দেখবে আম্বানীর মত বড়লোক বর জুটবে। দেখছো না, ডায়মন্ড প্লাজায় কাজ করে সব মেয়েরা প্যান্ট পড়ে…..।
মাসির হাসি আর দেখে কে। রোজ ভোর চারটায় ওঠেন..কোনদিনও সময়ের পাঁচ মিনিট পরও কারো বাড়ী কাজে যান না।
চোখে ছানি পড়ে একটা চোখ হারিয়েছেন। একটা চোখে দেখে কাজ করে যান, প্রতি সপ্তাহে একাই যান ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতেলে চিকিৎসার জন্য। কারো কাছে হাত পাতেন না কখনো। টালির একখানা ঘরে মেয়ে জামাই আর নাতির সাথে থাকেন। শেষ বয়সে যাতে মেয়ের জামাই কাছে
ঠাঁই জোটে  তাই ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন জামাইকে জমি কেনার সময় নিজের রোজগার থেকে।
সব কিছুর পরও মাঝে মাঝেই কাঁদেন উনার একমাত্র বোনের জন্য।কলকাতায় কাজ করতে এসেছিল বোন ৩৫ বছর আগে ৫ টাকা মাইনেতে ।আর কোন খোঁজ নেই সেই বোনের….। কোথায় আছে তাও জানেন না। বিক্রি হয়ে গিয়েছে কোন নিষিদ্ধ পল্লীতে নাকি মারা গিয়েছে তাও জানেন না…..।আজো পাননি বোনের  খোঁজ। এখানো পথে ঘাটে  খুঁজে বেড়ান হারিয়ে যাওয়া বোনকে….।

প্রাণবন্ত  কর্মঠ একজন নারী মিনু মাসি যে কিনা আজকের এই প্রযুক্তির যুগেও কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে একটা চোখ নিয়ে ও লড়াই করে চলেছেন দুবেলা দুমুঠো পেট ভরে খাবার জোটাতে হাসি মুখে ..।

যখন সব কিছু থেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলি তখন ভাবি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কোন উপন্যাসের কোন নায়িকার মতো মিনু মাসির জীবন সংগ্রামের কথা….. কাজ করবেন আর গুন গুনিয়ে গেয়ে যাবেন……
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় ………….।

(কলকাতা প্রতিনিধি)