চঞ্চল চড়ুই

FB_IMG_1458997228768

বাবলু ভট্টাচার্য

চড়ুই একটি চঞ্চল প্রকৃতির পাখি। এরা মানুষের আশপাশে বসবাস করতে ভালোবাসে। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে চড়ুই মানুষের সান্নিধ্যে আসে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এদের কিচিরমিচির গান চারপাশকে জাগিয়ে তোলে। ভাবতে অবাক লাগে- গায়ক চড়ুইরাই ৯০টি সুরে গান গাইতে পারে! আমাদের ঘরবাড়ি, আশপাশের ভাঙা দালান এবং বড় ও বুড়ো গাছের গর্তে এরা বাসা বাঁধে। চড়ুই বছরে একাধিকবার প্রজনন করে। প্রতিবারে ৪ থেকে ৬টি করে ডিম দেয়। এদের ছানা বেঁচে থাকে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ। শুধু মেরু অঞ্চল ও এন্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই চড়ুইয়ের দেখা মেলে।

গত কয়েক দশকে অর্থাৎ নব্বইয়ের দশক থেকে চড়ুইয়ের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮০ সাল নাগাদ পৃথিবীর বৃহদাংশ জুড়ে হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ। শুধু লন্ডন শহরেই ১৯৯৪ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে সংখ্যা হ্রাসের হার ৭০ ভাগ। যদিও ১৯২০ সাল থেকেই এ হ্রাসের আভাস পাওয়া যায় তবে ইদানীং মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে এদের হ্রাসের হার অত্যন্ত ঊর্ধ্বগতি।

চড়ুইয়ের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ হল- নিয়ন্ত্রণহীন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার। ক্ষতিকর পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষক যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহার করে। আর চড়ুই প্রধানত শস্যদানা, ঘাসের বিচির পাশাপাশি অসংখ্য পোকামাকড় খেয়ে থাকে। বিশেষ করে পোকার শুককীট, মুককীট বা লেদাপোকা যারা শস্য উৎপাদনের অন্তরায়। এরা যেসব প্রজাতির পোকামাকড় খায় তাদের মধ্যে beetles, dipterans, bugs, ants, flies উল্লেখযোগ্য। চড়ুই এসব পোকার ক্ষতিকর আক্রমণ থেকে ফসল, সবজির ক্ষেত, বনাঞ্চল বাঁচিয়ে পরিবেশ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু ফসলের ক্ষেতে কীটনাশক ছিটানোর কারণে এসব খাবার খেয়ে তারা বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে- গরুর ব্যথানাশক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক খেয়ে ৯৯ ভাগ শকুন আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

chorui
চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হল- এদের নিয়ে ব্যবসা করা। অনেক পশ্চিমা দেশে চড়ুই দিয়ে তৈরি হয় সৌখিন খাবার sparrow pie. এমনও pie তৈরি হয় যার একটিতে ১০০ চড়ুইয়ের ব্যবহার দেখা যায়। এমনও দেখা গেছে যে এই খাবার তৈরির জন্য অসংখ্য চড়ুইয়ের প্রয়োজনে একবার ১২,৬৩০০০ হিমায়িত চড়ুইয়ের চালান ধরা পড়ে। এছাড়াও ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে Rotterdam এ ইতালির জন্যে প্রেরিত ২ মিলিয়ন হিমায়িত চড়ুই ধরা পড়ে। এছাড়া ধূমায়িত চড়ুই খাবার হিসেবে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সুপার মার্কেটে বিক্রি হতে দেখা যায়। আবার পৃথিবীর অনেক দেশের চিড়িয়াখানায় শিকারি পাখিদের খাবার হিসেবে চড়ুই ধরার চল ছিল। অনেক সময় অজ্ঞ কৃষকরা জাল পেতে অসংখ্য চড়ুই ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিত। তাদের ধারণা ছিল চড়ুইরা জমির ফসল খেয়ে ফেলে এবং ফসলের ক্ষতি করে। বলাই বাহুল্য, এরা শস্যদানা খায় বটে কিন্তু ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ও খেয়ে কৃষকের ফসল বাঁচায়।

চড়ুই আমাদের কতখানি উপকার করে তা উপলব্ধি করতে একটি বিখ্যাত ঘটনার উল্লেখ করছি- ঘটনাটি চীনের। চড়ুই ফসলের ক্ষেতের সর্বনাশ ডেকে আনে ভেবে ১৯৫৮ সালে মাও-সে-তুং এর নির্দেশে অসংখ্য চড়ুই নিধন করা হয়। কেননা একটি চড়ুই বছরে ৪ থেকে ৫ কেজি শস্য খায়। সুতরাং, দশ লক্ষ চড়ুইয়ের খাবার বাঁচিয়ে প্রায় ৬০ হাজার ব্যক্তির খাদ্যের জোগান দেয়া যেতে পারে। অতএব শুরু হল প্রচারণা। রাতারাতি তৈরি হল ১ লাখ রঙিন পতাকা। চড়ুই মারার উৎসবেমেতেউঠলগোটাদেশ। sparrow army কাজে লেগে গেল। পুরস্কার ঘোষণা করা হল চড়ুই মারার জন্য। বিভিন্ন পদ্ধতিতে চড়ুই নিধন হতে লাগল। যেমন- খুব জোরে জোরে ড্রাম বাজাতেই চড়ুই উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। ডিম নষ্ট করা হল। তছনছ করা হল বাসা। জাল দিয়ে ধরা হল অসংখ্য চড়ুই। বন্দুক দিয়ে মারা হল বাকি চড়ুই। এভাবে ‘The great sparrow campaign’ নামে প্রচারণার মাধ্যমে চড়ুইশূন্য হল চীন। চীন থেকে চড়ুই হয়ে গেল বিলুপ্ত।

১৯৬১-৬২ সাল। চীনে দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। মারা গেল প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন মানুষ। ফসলের ক্ষেতে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ এমনভাবে বেড়ে গেল যে ক্ষেত থেকে ফসল আর ঘরেই তোলা গেল না। দুর্ভিক্ষ আর মৃত্যুর মিছিল। টনক নড়ল দেশটির সরকারের। নিরুপায় হয়ে প্রকৃতিতে চড়ুই ফিরিয়ে দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু হল চড়ুই আমদানি।

প্রকৃতিতে চড়ুইয়ের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আমাদের অসচেতনতার কারণে আমরা সেটা বুঝতে পারি না। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রকৃতি থেকে আর কোনো চড়ুইয়ের বিলুপ্তি নয়। আমাদের বাসাবাড়ির বারান্দায় যদি চড়ুইয়ের বাস উপযোগী করে দু’একটি ছোট বাক্স বেঁধে রাখি। এতে বিলুপ্তির হাত থেকে যেমন চড়ুই বাঁচবে, তেমনি বাড়ির শিশুরাও আনন্দ পাবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছোটবেলা থেকে এরা একদিন হয়ে উঠবে প্রকৃতিপ্রেমী।