অগম্য অতীত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাকলী আহমেদ

খুব বেশী করে মনে পড়ছিল আমার ফেলে আসা দিনগুলো। যাপনের দ্রুততায় যে সময়গুলো চলে যায়, তাকে বোধ হয় আর ফিরে পাওয়া যায় না। যদিও বা কদাচিৎ বসে আনমনে ফিরে যাওয়া যায় সে দিনগুলোয় মরে যাওয়া মনটা কিছুতেই বেঁধে রাখতে পারে না সেই সুখানুভূতিকে।
আমি ইদানিং খুব বেশী নস্টালজিয়ায় ভুগি। ছোটবেলার সেই খেলার সাথীগুলোকে যদি খুঁজে পেতাম। ভোরবেলা উঠে পাঁচ ছ’জন মিলে শিউলী তলায় সাদা সাদা ফুল তোলা। রাতের গাঢ় অন্ধকারকে কিভাবে পাশ কাটিয়ে দেয় ভোরের নরম তুলতুলে রোদ ও আলো। একটা রাতের পুরো দাপট কিভাবে হারিয়ে যায় একটুকরো দিনের কাছে।
ছোট ছোট কোঁচড়ে ভর্তি ফুল। কার কোঁচড় কতগুলো ফুলে ভর্তি তার পাল্লা। ভোরবেলা এ বাড়ির ও বাড়ির মেয়েরা মিলে প্রতিদিন একই কাজ করা। মাঝে মাঝে ভোরের অন্ধকারে ফুল ভেবে শূয়োপোকা কুড়িয়ে তোলা। পোকাটায় রোয়া রোয়া কাঁটার খোঁচালো ছোঁয়া বুঝতে পেরে ভয়ার্ত চিৎকার। সঙ্গে সঙ্গে সকলের কোরাস চিৎকার। তারপর বাড়ী ফেরা। পরদিন আবার ফুল কুড়ানো। শিউলীর সেই ঘন জমাট গন্ধের তীব্রতা আমাদের ছোট ছোট সুখানুভূতিকে যেভাবে ভালোলাগার গাঢ় সমুদ্রে ডুবিয়ে দিতো, তা যেন এই বয়সে তীব্র ব্যস্ততায় অনেক প্রাপ্তিতেও সেই ফেলে আসা তীব্র ভালো লাগাকে কিছুতেই ছুঁতে পারে না।
খুব ছোটবেলায় আমাদের তিনবোনের একটা ছোট কাঠের বাক্্র ছিলো। বাক্্রটার সূক্ষ্ম কারুকাজ, ওপরের সমস্ত আঁকিঝুঁকি যেন আজো মানসপটে প্রজ্জ্বল। পুতুলখেলার সমস্ত সরঞ্জামে ঠাসা সেই বাক্্রটা যা ছিলো এক সময়ের সর্বাঙ্গীন সঙ্গী। আজো কোন এক দুর্বল মুহুর্তে, একান্ত নিজের সময়গুলোতে মনে হয় ঐ বাক্্রটা যা সবার কাছে ছিল মূল্যহীন তা যদি ক্ষণিকের তরেও মিলতো। হয়তো পুরনো কোন ভালোলাগায় আবারো দুলে উঠতো আমার বা আমার মত নস্টালজিয়া প্রেমিক কোন মানুষের। ছোট্ট হাতের নিপুণতায় পেরেছিলাম সাজাতে যে ক্ষুদ্র বাক্্র। বোধ হয় শিক্ষার পূর্ণতায় প্রাপ্ত মেধা ও বুদ্ধির সম্মেলনে ব্যর্থ এখনকার সব স্থাপত্য। ছেলেবেলার সমস্ত সময়, ভাবনায় যে নিখাদ বিষয়টি থাকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস বয়সের পরিপক্কতায় তা আর নির্ভেজাল থাকে না।
বহুদিন পরে পুরনো স্মৃতির নাড়াচাড়ায় ফেলে আসা দিনগুলো আমাদের এখনোও কাঁদায়। হয়ত মনের অগোচরে কাউকে দুঃখ দেওয়া, ছেলেবেলার কোন সাথীর সঙ্গে আজন্ম আড়ি নেওয়া, প্রিয় কোন কাঁচের চুড়ি ভেঙ্গে খান খান হওয়া, বড়লোক আত্মীয়ের দেওয়া বিদেশী কোন ছোট জিনিষ হারিয়ে যাওয়া…… সব টুকরো খারাপ লাগাগুলো জীবনের পোড় খাওয়া সময়ে এসে আমাদের পাথুরে চোখ থেকে টপাটপ জল ফেলতে সাহায্য করে।
নস্টালজিয়া এমন এক রোগ যা কুড়ে খায় সমস্ত সত্ত্বাকে। মনে হয় শৈশবে দারিদ্রক্লীষ্ট সেই বাড়িটা আবার সেই আগের মতো থাকুক। দরকার নেই সেখানে সুরম্য অট্্রালিকা উঠবার। নানাবাড়ির সেই শ্যাওলা পরা উঠোনটা অমনই থাকুক। হেঁটে বেড়াক সেখানে নোংরা শামুক। ভাল লাগাগুলো কুরে খাক সমস্ত না পাওয়াগুলোকে।
আমাদের অর্জনগুলোও যেন খেলো হয়ে যায় নস্টালজিয়ার ঘূর্ণিপাকে। জীবনের সমস্ত অর্জন যেন হয়ে যায় ঘুনে খাওয়া বাঁশ। খোলসটা আছে শুধু ভেতরে ফাঁকা। আমাদের উত্তরাধিকার সন্তান তাও যেন কেবলই নিজের ছায়া অন্যের ভেতর রেখে যাওয়ার অপচেষ্টা। ওরা নতুন প্রজন্মই হবে। প্রগতিশীলতার ধারক ও বাহক হবে সন্দেহ নেই কিন্তু কিছুতেই ওদের মাঝে রেখে যাওয়া যাবে না আমাদের ফেলে আসা সোনালী সময়ের স্বপ্নের অলংকার। ওরা যা নেবার তা নিজেরাই নেবে আমরা শুধু আমাদের সুন্দর সময়গুলোর গল্প টানব ওদের মনে। দৃঢ়প্রত্যয়ী প্রজন্ম কিছুতে চিনবে না অসীম নীলাকাশ। দূরন্ত ঘুড়ি যার সূতো ছেঁড়া, হাতে কেবলই নাটাই। ঘুড়ি উড়ছে তো উড়ছে। গন্তব্য নেই। উড়ছে উড়ছে……. নীল আকাশে পাক খাচ্ছে। বোকা মানুষের হাতে কেবলই নাটাই।
সময় পাল্টে গেছে। পাল্টেছে তাই চিন্তা, চেতনা ও প্রজ্ঞা। অসীম নীলাকাশ এখন মনিটর হাতে ধরা মাউস। মানুষের প্রজ্ঞা ও মেধার সম্মিলনে তাই আবদ্ধ সারা বিশ্ব কম্পিউটারে। খোলা মাঠ, ফুটবল, শিউলী ফুল কুড়ানো সব আজ দিক খুঁজে নিয়েছে ছোট্ট বিস্ময়কর বাক্স যার যোগাযোগ সারা পৃথিবীর সংগে। এখন নস্টালজিয়া কেবলই নষ্ট লোকের কষ্ট।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]