অচেনা দ্বীপের পথযাত্রা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

রুজভেল্ট দ্বীপে আবাসন গড়ার পরে একদিনের মধ্যেই পুরো দ্বীপ চেনা হয়ে গেলো। সবাই মিলে হাঁটতে বেরুলাম এক হেমন্তের বিকেলে। দ্বীপের এ মাথা থেকে ও মাথা যেতে ৪৫ মিনিটের মতো লাগলো। রুজভেল্ট দ্বীপটি দৈর্ঘ্যে আড়াই মাইল আর প্রস্হে ৮০০ ফিট। একটিই মূল রাস্তা Main Street দ্বীপের ঠিক মাঝখান দিয়ে উত্তর মাথা থেকে দক্ষিন মাথা পর্যন্ত চলে গেছে। এছাড়া দ্বীপের দৈর্ঘ্যের দু’ধার ধরেই পূর্বী নদীর জলের পাশ দিয়ে হাঁটার রাস্তা চলে গেছে এ মাথা-ও মাথা।

ম্যানহ্যাটেনের দিকে নদীপাড়ের যে পথ সেটা ধরেই হাঁটতে থাকলাম দক্ষিণের প্রান্তে। সারা পথ ধরে চেরী ফুলের গাছ। এপ্রিল- মে মাসে সেই গাছে ফুল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। নীচের পায়ে চলা পথ ছেয়ে যেতো ফুলের পাপড়িতে। নদীর ধারের পথ যেখানে আবার ওপরের মূল পথের ওপরে উঠেছে, সেখানে এখন অনেক আবাসিক উচচ্তল ভবন গড়ে উঠেছে।

আমরা যখন ৩০ বছর আগে এ দ্বীপে আস্তানা গাড়ি, তখন এখানে একটা পাঁচতলা হলুদ রঙ্গের দালান ছিলো – যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নার্সিং স্কুল। এখন সেটা আর নেই। আরেকটু সামনে এগুলেই আমাদের পাতালরেল স্টেশন। পূর্বী নদীর তলা দিয়ে এ রেল চলে গেছে ম্যানহ্যাটন আর কুইন্সের দিকে। মনে আছে এ স্টেশনের বাইরেই শেষবারের মতো মিশুর (মিশুক মুনীরের) সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ও চলে যাওয়ার কয়েক মাস আগে।

পাতালরেল ছাড়িয়ে আরেকটু এগোলেই আমাদের ট্রাম (শূন্যে দুলুনী বাহনের) স্টেশন। এ বাহনটি বিখ্যাত হয়ে গেছে, বিশেষত: শিশুদের কাছে, ‘সুপারম্যান’ ছবির শ্বাসরুদ্ধকর একটি দৃশ্য চিত্রায়িত হওয়ার পরে। একটু জিরোলাম স্টেশনের সামনে রুজভেল্ট দ্বীপের পর্যটন কেন্দ্রের সামনের বেঞ্চিতে বসে। জল খেলাম, গল্প করলাম নিজেদের মধ্যে, বাচ্চারা ছুটোছুটি করলে একটু। স্টেশনের উল্টোদিকে দ্বীপের ফুটবল খেলার দু’টো মাঠের একটি। অনেক রাজহাঁস। বালিহাঁস ওখানে। ভিনদেশ থেকে উড়ে আসে প্রতিবছর। ট্রাম স্টেশনের গা ঘেঁসেই একদা ছিলো ‘প্রতিবেশী বাগান’ – দ্বীপের আবাসিকেরা সেখানে ছোট ছোট জমি নিয়ে বাগান করতে পারতেন। এখন অবশ্য সে বাগান সরে গেছে দ্বীপের উত্তরে।

ট্রাম স্টেশন ছাড়িয়ে আর একটু দূরে বিরাট জায়গা জুড়ে একসময়ে ছিল দীর্ঘকালীন অসুস্হদের জন্যে ‘Goldwater Hospital’। বছর কয়েক আগে সেটা ভেঙ্গে গড়ে উঠেছে বিশাল Cornell Management School একাধিক উচ্চতল ভবন নিয়ে। চেনাই যায় না জায়গাটিকে। তবে তার থেকে কিছু দূরে ভগ্নাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম গুটি বসন্তের হাসপাতাল। রোমান ভাস্কর্যের আদলে ঐতিহাসিক ভবন হিসেবে সংরক্ষিত এটি এতো সুন্দর যে বহু ছায়াছবিতে এটি চিত্রায়িত হয়েছে – যেমন, Michael J. Fox আর Gabriela Anwar অভিনীত ‘For Love, For Money’ ছবিতে।

আর একটু হেঁটেই পৌঁছে গেছি দ্বীপের দক্ষিণের চূড়ান্ত প্রান্তে। তখন ছিলো না, কিন্তু আজ সেখানে এবার প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলেনোর রুজভেল্টের স্মৃতিতে  গড়ে উঠেছে FDR Park, যার মধ্যমনি রুজভেল্টের একটি আবক্ষ মূর্তি। ছায়ার পথের দু’ধারে চারাগাছের সারি -ভারী ভালো লাগে দেখতে। এখান থেকে দৃষ্টি মেলে দিলেই দেখা যায় জাতিসংঘ ভবন – সারাবিশ্বের অনন্য এক বাতিঘর যেন।

এবার দক্ষিন থেকে উত্তরে ফেরার পালা। এবারের পথযাত্রা Main Street ধরে। সে পথের লেজে ট্রাম স্টেশনের পাশেই একটা Starbucks, একটা Walgreens ফার্মেসী।বলে নেয়া ভালো যে আমাদের দ্বীপে সবই একটা করে – একটা রেঁস্তোরা, একটা ফুলের দোকান, একটা চুলকাটার দেকান, একটা আইসক্রীমের দোকান, একটা সুরার দোকান, একটা শাক-সব্জী ফলমূলের দোকান, একটা বইখাতার দোকান, একটা পুরোনো জিনিস পত্রের দোকান। সব ঐ Main Street এর দু’পাশে।

তা’ছাড়া দ্বীপে আছে একটা ডাকঘর, একটা ডাক্তারখানা, একটা পাঠাগার, একটা ছবিশালা, একটা ছোট নাট্যগৃহ। একটা পুলিশ ফাঁড়িও আছে। কিন্তু পুলিশেরা বন্দুক বহন করে না – এও এক ব্যতিক্রম। এগুলোও ঐ একবোদ্বিতীয়ম: Main Street এর দু’ পাশেই। Main Street মাঝামাঝি জায়গায় আমাদের শহর কেন্দ্র —যেখানে আছে একটি চাতাল, একটি গীর্জা এবং একটি ভাঙ্গা ঘন্টিও বটে। এ গীর্জা দুশো বছরের পুরোনো। দ্বীপের উত্তর প্রান্তে অবশ্য আরেকটি ছোট কালো পাথরের গীর্জা আছে।

কুইন্সের দিক থেকে সাল সেতুটি পেরিয়ে রুজভেল্ট দ্বীপে ঢোকার ত্রিমাথা ছাড়িয়ে আরেকটু সামনে একটি পার্কের তিনদিক ঘিরে একটি চৌকোনো বেড়ীর মতো রাস্তা – নাম River Road, একেবারে নদী ঘেঁসে। সেখানে চারটে বিশতল বাড়ী। তার একটি আমাদের আবাস-ভবন। পার্কের উল্টোদিকে গাড়ী রাখার বিশাল বহুতল ভবন। আরেকটু এগুলেই ডানে অগ্নি নির্বাপক কেন্দ্র। পাশে বর্জ্য ব্যবস্হাপনার আধুনিক ব্যবস্হা। বাঁয়ে আরেকটি ফুটবল মাঠ।আমাদের বিশ তলার বারান্দা থেকে সব খেলা দেখা যেত। তারপর Main Road দ্বিখন্ডিত হয়ে নদীর দু’পাড় ধরে চলে গেছে উত্তরের চূড়ান্ত প্রান্তে যেখানে Lighthouse Park এ।

রাস্তা যেখানে দ্বিখন্ডিত হয়েছে তার বাঁ পাশেই চারটে টেনিস খেলার কোর্ট। তার পাশেই কালে পাথরের ছোট্ট কিন্তু ভারী সুন্দর এক গীর্জা। এক আফ্রিকান পাদ্রী সেটা শুরু করেছিলেন আমরা দ্বীপে আসার দশ বছর পরে। সেই জায়গাটাতে অজস্র লাইলাক গাছ ছিলো। গ্রীষ্মে সে ফুলের এক মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো চারদিকে। আজ আর সেগুলো নেই। গীর্জার উল্টোদিকেই ছিল The Octagon – মানসিক বিকারগ্স্হ মানুষদের জেল আর চিকিৎসা কেন্দ্র। তার ধ্বংসাবশেষ আমরা দেখেছি। তাঁর মাঝের মূল আট কৌণিক কাঠামো ঠিক রেখে উঠেছে বিরাট আবাসন হর্ম্যরাজি।

সামনে এগুলেই দীর্ঘকালীন অসুস্হদের এখনো টিঁকে থাকা হাসপাতাল – Coler Hospital. প্রত্যেকটি সপ্তাহান্তে আত্মীয়-স্বজনেরা আসে অসুস্হ মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে।কখনো-সখনো সঙ্গে থাকে শিশুরা, হাতে তাদের উপহার।আমাদের দ্বীপের উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিন প্রান্ত পর্যন্ত একটি লাল বাস অনবরত এক প্রান্ত (Coler Hospital) থেকে অন্য প্রান্ত (ট্রাম স্টেশন) পর্যন্ত যাওয়া আসা করে। পথের অনেকগুলো জায়গায় এ বাস থামে।এতে ভ্রমন করতে কোন পয়সা বা টিকেট লাগে না।

আরেকটু এগুলোই Lighthouse Park এর ফটক। তারপর ভারী সুন্দর একটি স্হান – চেরী, উইলো আর লাইলাকে ঘেরা । ছোট্ট একটি নালা আর এখানে ওখানে বসার জায়গা। সমতল নয়, একটু উঁচু-নীচু ভূমি এখানে-ওখানে। সখের বর্শেলরা নদীর পাড়ের দেয়ালে ঝুঁকে বড়শি ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করে। মাছ ওঠে না- কিন্ত মজাটা থেকে যায়। আস্তে আস্তে সামনে এগোই – সামনেই পূর্বী নদীর বাতিঘর।

লেখক: ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

.


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box