অতঃপর জীবন চলিয়াছে জীবনের গতিতে 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

রাশেদুল হাসান

যাহা বলিব সত্য বলিব। সত্য বই মিথ্যা বলিব না। এবং যাহা বলিব সাধু ভাষায় বলিব। কিন্তু কেন এই প্রকারে বলিতেছি এবং কিছুই বলিব না পূর্বে স্থির করিয়াও কেনই বা এই ক্ষণে বলিতে শুরু করিলাম নিজেও সঠিক বুঝিতে পারিতেছি না। দুপুরের আহার শেষে এই ছুটির দিনে বিছানায় কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম লইতে আসিয়াছি। লেপের তলায় ছাদ-পাখার ফিসফিসানি শব্দে আরামের দিবানিদ্রা দিবার এটাই সপ্তাহের একমাত্র মোক্ষম সময়। এই অসময়ে এই বয়সে জীবনের প্রথম ক্রাশ বিষয়ে কিছু লিখিবার কোনই অর্থ হয় না – বিশেষ করিয়া যখন প্রথম ক্রাশ কে ছিলো, তাহা মনেও করিতে পারিতেছি না। অধিকন্তু, লিখিলেও কেহ পড়িবে কিনা সন্দেহ। তথাপি, আমি নিজের প্রতি নিজে বিরক্ত বোধ করিলেও হঠাৎ লিখা শুরু করিবার কারনে এতটুকুও বিস্মিত হই নাই। সময়ে সঠিক কাজ না করিয়া অসময়ে অকারনে বেঠিক কাজ করাই আমার স্বভাব ও ইশ্বর নির্দিষ্ট নিয়তি, এমনটাই বহুকাল পূর্বেই মানিয়া নিয়াছি। বোধকরি অন্য কোন কাজ করাটা এই মুহূর্তে জরুরী, আর তাই আমার সাবকন্সাস্ মাইন্ড আমাকে এমনটা করিতে প্রলুব্ধ করিতেছে। যাই হোক, ভুমিকা দীর্ঘ না করিয়া এইবার আসল কথায়

সে সময়ের ছবি

আসি। সময় কম, এবং কখন লিখিবার ইচ্ছা তৈল শূন্য কুপিবাতির শিখার মতন খাবি খাইতে খাইতে হঠাৎ দপ্ করিয়া নিভিয়া যায়, বলা মুশকিল।

পূর্বেই বলিয়াছি যে প্রথম ক্রাশ কে ছিলো, তাহা মনেও করিতে পারিতেছি না। অতত্রব, একটি ক্রাশের কথাই বলি যাহা আমাকে এক কালে কিঞ্চিত বেসামাল করিয়াছিলো। তখন আমি বোধ করি ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কেয়ামাত-সে-কেয়ামাত-তাক্ দেখিয়া জুহী চাওলাকে হৃদয়ে পুরিয়া কল্পনায় বুঁদ বিনিদ্র রাত্রি তখনও বেশিদিনের বিগত ঘটনা হয় নাই – এই রকম সময়ে মেয়েটিকে একদিন সন্ধ্যায় দেখিলাম ছোট দুই ভাই-বোনকে সঙ্গে লইয়া আমাদের পেছনের বাসার ছাদে দোলনায় দুলিতেছে। দেখিবা মাত্রই আমার হৃদয় খানাও দুলিয়া উঠিলো – রিখটার স্কেলে আট কিংবা নয় হইতে পারিত হয়তো। সাদা সেলোয়ার আর সাদা কামিজে তাহাকে আমার পরীর মতন সুন্দর মনে হইল! বয়স পনেরো কিংবা ষোল। সেই থেকে জুহী চাওলাকে না পাইবার দুঃখও কর্পূরের মতনই উবিয়া গেলো। আমি নতুন করিয়া নতুন স্বপ্ন দেখিতে শুরু করিলাম। আমাদের দ্বিতল দালানের তখন তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় কিছুকাল যাবত পরিয়াছিলো। ছাদ ঢালাইয়ের কাজ, পলেস্তোরা দেয়া শেষ, কেবল দরজা-জানালা লাগানো আর

রঙের কাজ বাকী। এমতাবস্থায় আমি নিরিবিলিতে পড়ালেখা ভালো হইবে এই অজুহাতে তৃতীয়তলার এক অসমাপ্ত প্রকোষ্ঠে নিজেকে স্থানান্তরিত করিলাম। জানালা বিহীন জানালার পাশের পড়ার টেবিল হইতে তাহার ছাদ নজরে পড়িত। শুধু তাহাই নহে, মেয়েটির পড়ার টেবিলটিও ছিলো জানালার পাশেই। এখন বলিতে সংকোচ হইতেছে, কিন্তু পিপিং-টম হইয়া রাত্রিতে মেয়েটির পড়িতে বসিবার অপেক্ষায় আমি ঘন্টার পর ঘন্টা টেলিভিশন না দেখিয়া আমার পড়ার টেবিলে বসিয়া রাত কাটাইতাম (আহা! আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম)। বাবা হয়তো ভাবিতেন ছেলে আমার এতদিনে লেখাপড়ায় খুব মনোযোগী হইয়াছে। মা তখন বোনের কাছে আমেরিকায় গিয়াছিলেন।

আর লিখিতে এখন ইচছা করিতেছে না। এই স্মৃতি স্মরন করিয়া কিছু দিন পূর্বে একটা কবিতা লিখিয়াছিলাম। বরঞ্চ সেই কবিতাটি এইখানে আরেকবার তুলিয়া দেই:

তোমার পুরোনো বাসার ছাদে দোলনাটা এখনও আছে
তবে ভেঙ্গে গ্যাছে, দেহে আর মনে,
আর দোল খায় না সন্ধ্যায় কিংবা পূর্ণিমায়,
বিমর্ষ আর মুমূর্ষু দেখায়।
ছাদটাও বেদখল করে নিয়েছে অচেনা কিছু মুখ।
খুব প্রিয় কেউ যেন অপরিচিত হয়ে গেল দিনে দিনে!
এখনও কি সায়াহ্নে কিংবা পূর্ণিমায় ছাদে ওঠো?
সেই ছাদের ঠিকানাটা আমার জানা নেই!
জানতে আজও খুব ইচ্ছে করে!

খুঁজেছি তোমাকে অনেক অনেক দিন ধরে…
শহরের কোলাহলে রাস্তার খানাখন্দ মাড়িয়ে
কয়েক জোড়া স্যান্ডেলের তলা ক্ষয়ে গ্যাছে একে একে।
আকাশের নীল – দৃষ্টি কাড়েনি আর।
দু’চোখ শুধুই খুঁজেছে তোমার ঐ নীল গাড়িটাকে
সড়কে, গলিতে, অগুনিত গেটের ফাঁক গলে গাড়ি বারান্দায়।
হঠাৎ করেই এক বিকেলে যে গাড়িটা
বাসা ছেড়ে চলে গেল আর ফিরবেনা বলে –
আজও চোখ দুটো অজান্তেই কেবল তারে খোঁজে,
ভীষণ বেয়াড়া আর নির্লজ্জ হয়েছে তোমার প্রশ্রয়ে।

হ্যা, প্রশ্রয় তো বটেই।
তুমি কি জানতে না একটা পৃথিবী তোমাকেই কেন্দ্রে নিয়ে
সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ রত ছিল
তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের কয়েকটি বছর?
জানতে নিশ্চয়ই। শুনেছি মেয়েদের সে ক্ষমতা দিয়েছেন ঈশ্বর।
জানালার পাশে তোমার টেবিল-ল্যাম্পের আলো
তোমার গাল ছুঁয়ে রাতের আঁধার পেরিয়ে
আমার জানালাবিহীন পলেস্তরার অপেক্ষায় থাকা
ছাদের চিলেকোঠায় পৌছাতো কী তোমার অনুমতি ব্যতিরেকেই!
তোমার দু’চোখ তো খুঁজে পেয়েছিল আমার দু’চোখ!
একবার নয়, বারে বারেই।

তবু কোন ঠিকানা রেখে গেলে না!
পেছনে রেখে গেলে শুধুই একটা রেজিস্ট্রেশন নম্বরঃ
ঢাকা – ঘ ৩৩৬৯।
আমি কক্ষচ্যূত উল্কা হয়ে ছুটি নম্বরটাকে বুকে করে
মহাকালের অন্ধকারে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে
তোমাকে খুঁজে খুঁজে
প্রজ্বলিত তোমার স্মৃতির সংঘর্ষে – হয়ত ক্ষয়ে যাব এভাবেই একদিন
শুধু ভালবাসাটুকু ছাই হয়ে মিশে রবে বাতাসে
ভেসে বেড়াবে তোমার বুকে ঝরে পড়ার অপেক্ষায়-
কোন এক পূর্ণিমায়।

শুরুতে বলিয়াছি, যাহা বলিব সত্য বলিব। সত্য বই মিথ্যা বলিব না। কবিতায় “তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের কয়েকটি বছর” কথাটি মিথ্যা। চার কিংবা পাঁচ মাসের ঘটনা ছিলো এই রকম। এই সময়টায় কোন অগ্রগতি হয় নাই। আমি তখন নিতান্তই নাদান – মায়ের অতি অনুগত শান্তশিষ্ট লেজ বিশিষ্ট সন্তান ছিলাম। মা ছেলে-মেয়েদের প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারটা পছন্দ করিতেন না। তাই অকপটে স্বীকার করিতেছি যে সেই বয়সে এই বিষয়ে অগ্রসর হইবার সাহস আমার ছিলো না। তাছাড়া ভাবিয়াছিলাম সম্মুখে অফুরন্ত সময় তো আছেই। যদিও আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পরবর্তী কালাপানি পাড়ি দিবার একটা সম্ভাবনা তখন উঁকি দিতেছিলো।

তবে ওই নীল গাড়িটাকে কিন্তু ঠিকই খুজিয়া বাহির করিয়াছিলাম। বাসা বদলির সময় কিছু মালপত্র একটা ঠেলাগাড়িতে তুলিতে দেখিয়াছিলাম। সেই হেতু ধারনা ছিলো উত্তরা মডেল টাউনেই ঠিকানা বদলির সম্ভাবনা বেশি। চার মাস পরে সাত নম্বর সেক্টরের এক বাসার গাড়ি বারান্দায় গাড়িটার সন্ধান পাই।

অল্প কথায় উপসংহার টানি। মেয়েটির নাম পর্যন্ত আমার জানা ছিলো না। তবে জানিতাম যে তাহারা হিন্দি কিংবা উর্দূ ভাষায় কথা বলে – আমার ছাদের ঘর হইতে কালেভদ্রে উচচস্বরের কিছু কিছু কথা বার্তা আমার কানে আসিয়াছিলো। যাই হোক, ধারনা করিলাম সে ইংরেজী স্কুলে পড়ে। সেই মোতাবেক ইংরেজীতে জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম পত্র লিখিয়া একদিন রাত্রিবেলায় তাহাদের বাসায় উপস্থিত হইলাম। ঠিক বাসায় উপস্থিত হইয়াছিলাম এমনটা বলা বোধকরি সংগত হইতেছে না। মেয়েটির বাসার পাশে একটি নির্মাণাধীন দালানের কেয়ারটেকার দারোয়ান ভাইকে আমার ভালোবাসার বৃত্তান্ত খুলিয়া বলিলে তিনি আমার প্রতি করুনাবশত তাহাদের (মেয়েটির) বাসার খাবার ঘরের জানালার পাশে আমাকে অপেক্ষা করিবার অনুমতি দেন। ঘন্টা এক বা তারো সামান্য বেশি মশার যন্ত্রনা উপেক্ষা করিয়া আমি মেয়েটিকে আমার প্রেম পত্র দিবার জন্য অপেক্ষায় থাকি। অবশেষে ইশ্বর আমার প্রতি সদয় হন। মেয়েটি খাবার ঘরে একলা আসিলে পরে এই প্রথম এত কাছ হইতে তাহাকে দেখিলাম! সুবহানআল্লাহ! মনে হইলো এমন মায়াবতী সুন্দরী আমি আর কখনও দেখি নাই! গলা শুকাইয়া গেলো। বুক ধরফর করিতে লাগিলো। বহু কষ্টে গলা হইতে hello বা এইরকম কোন শব্দ হয়ত বাহির হইয়াছিলো, এখন সঠিক খেয়াল নাই। শুনিয়াছি বড় কোন দুর্ঘটনার সময়কার স্মৃতি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে মানুষের মনে না পড়াটাই স্বাভাবিক। তা বড় দুর্ঘটনাই তো বটে! মেয়েটি আমার শব্দে জানালার দিকে দৃষ্টি রাখিয়া কিছুক্ষন চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিলো। আহা! কি সুন্দর তাহার চোখ! আমি জানালার গ্রীলের ভেতর আমার চিঠি ধরা হাতখানা প্রসারিত করিয়া তাহাকে নিতে বলিলাম। অতঃপর তাহার সেই সুন্দর দুই চোখে স্পষ্ট ভয়ের ছায়া পড়িতে দেখিলাম…এবং আমি অধিক কিছু বলিবার পূর্বেই শুনিলাম “আম্মি” বলিয়া এক চিৎকার!

এর পরে কি হইয়াছিল আশা করি আর বলিবার প্রয়োজন পড়ে না। আমি হাতের চিঠিখানা মুচড়াইয়া তাহার দিকে নিক্ষেপ করিয়া সেই যে দিলাম দৌড়, রবীন্দ্র সরনী অতিক্রম না করিয়া আর থামি নাই।

এই ঘটনার এক মাস পরের ঘটনা। সেই সময়ে মুঠোফোনের প্রচলন ছিলো না। সবই ছিল ল্যান্ড লাইন। কি করিয়া তাহার টেলিফোন নম্বর পাই ভাবিতে ভাবিতে শেষে টেলিফোন বিভাগ অফিসে উপস্থিত হইলাম। সেইখানে এক টেকনিশিয়ানকে কিছু উপঢৌকন দিয়া সেই বাসার টেলিফোন নম্বর যোগার করিয়া দিতে অনুরোধ করিলাম। সেই লোক বলিলো যে অফিসের রেকর্ড বুক হইতে নম্বর বাহির করা সম্ভব হয় নাই। অতঃপর একদিন আমাকে সঙ্গে নিয়া সে মেয়েটির বাসায় উপস্থিত হইলো। আমি রাস্তার মাথায় এক চায়ের দোকানে বসিলাম, আর সে টেলিফোন বিভাগ হইতে ফোন চেক করিতে আসিয়াছে এই প্রকার অজুহাতে মেয়েটির বাসায় উপস্থিত হইয়া নম্বর যোগার করিতে পারে কিনা দেখিতে গেলো। অধীর আগ্রহে বসিয়া আছি। দুই-তিন কাপ চা শেষ করিতেই দেখি সে ফিরিতেছে। বলিল, “ভাই, মেয়ের মা খুব শেয়ানা। আমারে এত্ত এত্ত জেরা করছে। কে পাঠাইছে, ক্যান পাঠাইছে…আর কইছে সে জানে আপনে পাঠাইছেন…আপনে কি তিন নম্বর সেক্টরে থাকেন”?

ইহার পরে আর কোন কথা থাকে না! মাস খানেক ভয়ে ভয়ে ছিলাম তাঁহার মা বাসায় চলিয়া আসে কিনা এই দুশ্চিন্তায়! আসে নাই।

কিছুদিন কষ্টে পার করিয়াছি। অতঃপর জীবন চলিয়াছে জীবনের গতিতে। আজ তাহার চেহারাটাও সঠিক মনে পড়ে না আর। অতত্রব, কবিতার শেষের আক্ষেপটুকু কেবল কবিতার জন্যেই লিখা। শুধু বছরখানিক আগে একদিন ভোরে সেই মেয়েটিকে স্বপ্নে দেখিয়া ঘুম ভাঙিলে পরে বুকের ভেতরে মিষ্টি এক ব্যথা অনুভব করিয়াছিলাম। পাশ ফিরিতে দেখি আমার স্ত্রী প্রশান্তিতে নিদ্রিত। তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া চোখ মুদিয়া মনে মনে বলিলাম, “আলহামদুলিল্লাহ্”।

সেই বয়সের এই একটাই ছবির ডিজিটাল কপি পাওয়া গেল। বাকী সব দেশে।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]