অদ্ভুত সেই আটার জাউ ও আমি

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়িরমতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটাউজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়িবিভাগে।

কনকচাঁপা

আমার সৌভাগ্য যে আমি একটি কাণ্ডজ্ঞান ওয়ালা শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। একই সঙ্গে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত পরিবারের পাশাপাশি ও খুব কাছাকাছি অবস্থান এ দেখেছি এর করুন ও বেহাল দশা।

আমার দাদাভাই ছিলেন জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের নাম করা শিক্ষক। তিনি একাধারে শিক্ষক ছিলেন,সাহিত্যপ্রেমী, সংগীতপ্রেমীও ছিলেন, এবং সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া অঞ্চলের অনেক স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।কিন্তু প্রদীপ এর নীচে যেমন অন্ধকার থাকে তেমন তাঁর এই বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্ব অনেক চেষ্টা করেও নিজের একজন ভাই ছাড়া কাউকেই পড়াশোনা করাতে পারেন নাই

তার ফলাফল তারা হাতেনাতেই পেয়েছেন।আমি অনেক চিন্তা করে এর ব্যাখ্যা এভাবেই পেয়েছি।আমার দাদা এবং তার একভাই ছাড়া বাকী সবাই অসচ্ছল ছিলেন।নদীভাংগা এলাকায় দাদার অন্য ভাই,যারা পড়াশোনা না করে শুধু জমির ওপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করতেন তারা সেই পড়াশোনা না করার ফল হাতেনাতে পেয়েছেন।কিন্তু সেই দারিদ্র আমাকে শিশুবেলায় খুবই কষ্ট দিয়েছে।kataghuri_in_dec_4

গ্রীষ্মকাল ও বার্ষিক পরীক্ষার ছুটিতে নিয়মিত দাদাবাড়ি যেতাম তখন আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। আমার আপন কোন চাচা ফুপু ছিলনা।দাদী একটা অপূর্ব সাজানো ফুলফলে ভরা সাজানো বাড়িতে একলা থাকতেন।এবং একই চৌহদ্দি তে দাদার অন্য ভাইয়েদের বাড়ি ছিল।একই চৌহদ্দিতে একই সুত্রে গাঁথা ছিল সেই সিরাজগঞ্জ এর মাইজবাড়ির কাদাইবাড়ি।কাদাইবাড়ি নাম কোথা থেকে এলো আল্লাহ ই জানেন।

সেই (অন্য দাদাদের বৌ) দাদীরা ছিলেন আমার প্রাণপ্রিয়। চাচীরাও ভীষন আদর করতেন।তাদের মধ্যে একজন দাদীর এতো সন্তান ছিল যে তিনি সব সময় অসুস্থই থাকতেন।এবং বলাই বাহুল্য তাদের ঘরের ছেঁড়া কাঁথা,ভাংগা হাড়ি শতচ্ছিন্ন শাড়ি এবং খাবারের মেন্যু! পথের পাঁচালীর পর্দার চাইতেও দুঃখময়। একই ঘরে অনেকজন সন্তান ও পোষা ছাগল নিয়ে সেই দাদী থাকতেন।তবুও তার মধুর মত ব্যবহার আমাকে ভয়ানক আকৃষ্ট করতো। আমি ঘুরেফিরেই তার ঘরে যেতাম।সহাস্য তিনি সোনামানিক ডেকে কিভাবে কোথায় বসতে দিবেন বুঝতে পারতেন না।মাঝেমাঝেই আমি তার রান্না খাওয়ার বায়না ধরতাম,বিশেষ করে আমি ও আমার মেঝোবোন।কিন্তু সেই খাওয়াও মেন্যু? পৃথিবীর খুব কম মানুষই জানবে এভাবেও মানুষ বেঁচে থাকে।আমি উদাত্তকণ্ঠে বলতে চাই এই নিবিড় অভাব আমি নিবিড় করে বুঝেছি বলেই অল্প সচ্ছলতাই আমাকে স্বর্গে নিয়ে যায়। আমার সেই দাদীমা রান্না করতেন হয়তো দুইমুঠ চাল,তাতে কুচিকুচি কাটা লাউ,বা মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া দিয়ে এক ডেকচি ঢলঢলে লবণাক্ত কিছু।তা-ই আট দশটা থালায় ঢেলে অন্নসংস্থান করতেন।

একদিন দাদীমাকে বললাম ও বুজি কি রানছেন,আমরা খাইতে আসছি।দাদী মুখ ভার করে বললেন ও সোনা,ওগুলা তোমরা খাইতে পারবে না! আমি ও রতনা আপা জিদ করে ঠিকই খাবার আদায় করলাম এবং চাক্ষুষ করলাম অদ্ভুত সেই আটার জাউ! আটা অল্প লবন পানিতে ঝুরঝুরা করে তা আবার ফুটন্ত গরম পানিতে নুন দিয়ে ফুটিয়ে এ জাউ রাঁধতে হয়।যখন এক মুঠি চাল ও না থাকে তখন দশ বারোজন মানুষএর অন্নসংস্থান এর জন্য আর কি থাকতে পারে! এই পদ্ধতির নাম জীরো টলারেন্স!!!! আমি খুব কাছে থেকে এই শুন্য সহ্যশক্তি ও সহ্যসীমা দেখার জন্য আমার দাদীমাকে আবারো সালাম জানাই।সালাম দাদীমা,সালাম শ্রেষ্ঠতম মা,সালাম।

কাভার ছবি:টুটুল নেসার