অনুজ্জ্বল বিষের পাত্র

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিষের ইতিহাস অমোঘ, হিম শীতল এবং শক্তিশালী। সে ইতিহাসের পাতায় কী নেই! আছে খুন, আছে ষড়যন্ত্র। বিষের পাত্রে ছায়া ফেলে ভালোবাসা, ঝলসে ওঠে ঈর্ষা, ক্ষমতা বদল হয় পর্দার অন্তরালে। বিষকে আমরা সাধারণ ভাষায় বলি জীবনের উপর যতিচিহ্ন। বিষ প্রয়োগ করা হয়, বিষ পান করাও হয়। সক্রেটিসের মৃত্যু হয়েছিলো হেমলক পান করে, হিটলার বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে খুন করেছিলো লক্ষ লক্ষ মানুষ, ক্লিওপাট্রার ভালোবাসার প্রদীপ নিভেছিলো বিষেই।

মানুষের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার খুব কাছেই ভয়ংকর উপস্থিতি এই বিষের। ষড়যন্ত্র, খুনোখুনি, ভালোবাসা, সাহিত্য, গুপ্তচরদের অদৃশ্য পৃথিবীতে আর বিপ্লবে বিষের ছায়া দুলে ওঠে গভীর অনিষ্টের ইঙ্গিতে।বিষ নিয়ে বহু কাহিনি রচিত হয়েছে। সাপের বিষ, থেকে শুরু করে মানুষের তৈরি বিষ জন্ম দিয়েছে এ পৃথিবীতে বহু কাহিনির। জন্ম হয়েছে গল্প, কবিতা অথবা পৌরাণিক গল্পের।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘অনুজ্জ্বল বিষের পাত্র’।

সম্রাট অথবা সম্রাজ্ঞীর আঙুলের অঙ্গুরীয়তে লুকানো বিষ থেকে শুরু করে অকুতভয় বিপ্লবীর মুখে লুকিয়ে রাখা মারাত্নক পটাশিয়াম সায়নাইডের ক্যামসুল-কোথায় নেই বিষ? বিষ পান করিয়ে লেখক অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন   সাহিত্যের বহু চরিত্রের। সাপের বিষে মৃত চাঁদ সওদাগরকে বাঁচিয়েছিলো বেহুলা।সে পৌরাণিক গল্প সবারই জানা। বিষপানে মৃত্যু ঘটেছিলো রোমিও আর জুলিয়েটের। রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে পারাসেলসাস নামে এক উদ্ভিদবিজ্ঞানী বিষ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লিখেছিলেন,‘সব কিছুই বিষ। চারপাশে সবকিছুর মাঝেও বিষ বিদ্যমান।’এই প্রাচীন বিজ্ঞানীর গবেষণা পরবর্তী সময়ে বিষ নিয়ে গবেষণাকে অনেকদূর পথ এগিয়ে দেয়।

বিষ-কথার অনেকটা জুড়েই আছে হেমলক। ইতিহাসে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যু হেমলক বিষকে বিখ্যাত করেছে বললে ভুল হবে না। খুব শান্ত মুখে দার্শনিক ঠোঁটের কাছে তুলে নিয়েছিলেন বিষের পেয়ালা। গবেষকরা বলেন, এই বিশেষ গরল পানে মৃত্যু খুব শান্তির হয় না। কিন্তু মৃত্যুর সময় নাকি সক্রেটিস শান্ত ছিলেন।রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায় হেমলক বিষ পান করার পর সেই ব্যক্তির মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকলেও বিষ দখল নেয় তার পেশী এবং অন্যান্য অঙ্গের। সেগুলো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে। ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ায় অচল হয়ে যায় তার শ্বাসতন্ত্র।গ্রিক ও রোমান রাজন্যদের প্রতিশোধ আর ক্ষমতা দখলের খেলায় হেমলক আর অ্যাকোনিট নামের দুটি বিষের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসকে তার স্ত্রী এই অ্যাকোনিটে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলেছিলো। এক বাটি মাশরুমের সঙ্গে মিশিয়ে সম্রাটকে এই বিষ দেয়া হয়। অ্যাকোনিট বিষের প্রতিক্রিয়া হেমলকের উল্টো। এই বিষ পান করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বমি আর ডায়রিয়া। খুব দ্রুত মৃত্যু এসে দাঁড়ায় দুয়ারে।

গিউলিও তোফানা

বিষ নিয়ে অনেক কথার ভিড় ইতিহাসে। ক্লিওপাট্রা স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে বিষাক্ত সাপের ছোবলে মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন। অবশ্য এমনটাও শোনা যায় বিষ দিয়েই খুন করা হয়েছিলো সেই মিশরীয় সুন্দরী শ্রেষ্ঠাকে।গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের মৃত্যু নিয়েও এখন ক্লিওপাট্রার মতো জেগে উঠছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। ইতিহাস বলে, আলেকজান্ডার মারা গিয়েছিলেন অসুখে। কিন্তু এখন গবেষকরা বলছেন, তার মৃত্যরে লক্ষণ বিশ্লেষণ করে তাদের মনে হয়েছে আলেকজান্ডারকেও হত্যা করা হয়েছিলো মারাত্নক বিষের নামের তালিকায় অ্যাকুয়া তোফানা বিষ আলোচিত। এই বিষের উদ্ভাবকের নামেই এ বিষের নামকরণ হয়েছে। গিউলিও তোফানা ১৬২০ সালে ইতালীর দক্ষিণাঞ্চলের পালারমো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ভদ্রমহিলা এক কন্যা সন্তানের জননী বলে তথ্য পাওয়া গেলেও তার সেই কন্যা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। সেই সময়ে সেই সময়ে বিভিন্ন বিষ এবং বিষজাতীয় দ্রব্যের প্রয়োগ ছিলো খুব সাধারণ ঘটনা। বিষ তৈরি করাকে অনেকে তখন পেশা হিসেবেও বেছে নিয়েছিলো। তোফানা নিজের তৈরি বিষ প্রয়োগ করে সেই সময়ে হত্যা করেন প্রায় ৬০০ মানুষকে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, একটি নিদিষ্ট শ্রেণীর মানুষ কে হত্যা করতেন তিনি। এমন মানুষদের বেছে বেছে খুন করতেন এই নারী যাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই বলে তিনি মনে করতেন।তোফানা বিষ বিক্রি করতেন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মহিলাদের কাছে, যারা জীবনে অসুখী ছিলেন। কেউ বিবাহিত জীবনে অসুখী হলে কিংবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও বিবাহ বিচ্ছেদের কোনো ব্যবস্থা তখন ছিলো না। কিন্তু বহু নারী স্বামীর কবল থেকে মুক্তি চাইতেন। অনেক নারীই ছিলেন যারা স্বামীর হাত থেকে মুক্তি চাইতেন।এই ধরণের নারীরা তোফানার কাছে এসে তাদের জীবনের দারিদ্র্য থেকে শুরু করে স্বামীর অত্যাচারের বিবরণ দিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। তোফানা তাদের পথ বাতলে দিতেন স্বামীকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার। আর সেখানেই স্ত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পাউডার মেক-আপ নামের আড়ালে অ্যাকুয়া তোফানা। একুয়া তোফানা ছিলো আর্সেনিক, লেড এবং বেলাডোনার এক মিশ্রণ। আলাদাভাবে এই তিনটিই এক একটি ভয়ানক বিষ। তোফানা তিন ধরণের বিষ মিশিয়ে তৈরি করতেন তার অ্যাকুয়া তোফানা যার চার ফোঁটা কারো খাবারে মিশিয়ে দিলে অবধারিত মৃত্যু। একুয়া তোফানা ছিলো বর্ণহীন, স্বাদহীন এবং গন্ধহীন এক বিষ। একটি ছোট বোতলে করে একুয়া তোফানা বিক্রি হতো এবং বিষের শিশির গায়ে সেন্ট নিকোলাস-এর ছবি ছাপানো থাকতো। রিপরাধ: চেহারার শিশিটি অবলীলায় শোভা পেতো নারীদের ড্রেসিং টেবিলে অন্যান্য প্রসাধনী সামগ্রীর সঙ্গে। বিষের পাত্র বলে সেটাকে কেউ সন্দেহ করতে পারতো না।

দীর্ঘ সময় তোফানা তার প্রাণঘাতী বিষের বাণিজ্য চালিয়ে গেলেও একটা সময়ে ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। সময়টা ছিলো ১৬৩৩ থেকে ১৬৫১ সালের মধ্যে

মোগল রাজদরবারে বিষের গল্পটা আরেকটু অন্যরকম। সেখানেও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিঙ্কুশ করার জন্য বিষপ্রয়োগ ছিলো খুব সাধারণ বিষয়। সম্রাটরা বিষ চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করতেন নানান পদ্ধতি। সাপের বিষ নির্ণয়ের জন্য পোষা হতো টিয়া, সারিকা ও ভৃঙ্গরাজ পাখি। সাপের বিষের গন্ধ পেলেই এসব পাখি ছটফট শুরু করতো। খাবারে বিষ নির্ণয়ের জন্য আরও পোষা হতো ক্রৌঞ্চ, জীবঙ্গ-জীবক, মত্ত কোকিল ও চকোর পাখি। আশপাশে বিষ থাকলে নানারকম প্রতিক্রিয়া হতো এসব পাখির মধ্যে। ক্রৌঞ্চ মূর্ছা যেতো, জীবাঙ্গ-জীবক অবসন্ন হয়ে পড়তো, মত্ত কোকিল মারা যেতো, আর রক্তবর্ণ ধারণ করতো চকোরের চোখ। শোনা যায়, সম্রাট শাহজাহান একবার নজর খাঁ নামে এক উচ্চবংশীয় যুবককে সন্দেহ করেন তাঁর বড় মেয়ে জাহানারার গোপন প্রেমিক হিসেবে। দরবারে বাদশাহ কাউকে নিজের হাতে পান দিলে তা অতি উচ্চসম্মান বলে তখন গণ্য করা হতো। একদিন সম্রাট রাজসভায় সকলের সামনে সেই যুবককে ডেকে মহাসম্মানসূচক একটি পানের খিলি উপহার দিলেন। প্রথা অনুযায়ী তাকে তখনি তা মুখে দিয়ে চিবাতে হলো। … সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি পানে বিষ দেওয়া ছিলো। ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনায় মশগুল হয়ে যুবক দরবার থেকে তার পালকিতে গিয়ে উঠলো। কিন্তু তীব্র বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হলো বাড়ি পৌঁছানোর আগেই।

রাইসিনের বীজ

বিষের দুনিয়া নানা তারকায় খচিত। পরিমাণের ওপর নির্ভর করে এসব বিষ ডেকে আনে নির্মম মৃত্যু। রাইসিন নামে বিষ পাওয়া যায় ক্যাস্টর গাছ থেকে। ক্যাস্টর অয়েলের বীজে পাওয়া এই পদার্থটি এতই বিষাক্ত যে মাত্র কয়েক দানাই একজন মানুষের প্রাণ নেবার জন্য যথেষ্ট। মাস্টার্ড গ্যাসের মতো রাইসিনও সাইটোটক্সিক তথা কোষীয় বিষাক্ততা সৃষ্টিকারী (আণবিক স্তরে আক্রমণকারী)। শারীরিকভাবে প্রোটিনের উৎপাদন বন্ধের মাধ্যমে এই কাজটি করে থাকে। এতে একজন মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ সকল গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে যায়। বিষটি বেশ দ্রুত কাজ করলেও, বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত  ভুক্তভোগীর মৃত্যু হতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে।

অ্যাব্রিন রাইসিনের সমতুল্য বিষ হলেও অনেক কম কম পরিমাণে এটি ব্যবহার করলেই মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। শরীরে বিষ যাবার কয়েক ঘণ্টার ভেতর এই বিষক্রিয়ার লক্ষণগুলো দেখা যায়। লক্ষণসমূহ প্রায় রাইসিনেরই মতো এবং এর ফলে শ্বাসকষ্ট, বমিভাব, বুকে ব্যথা এবং নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে। শ্বসনতন্ত্র বিকল হয়ে যায় এবং মানুষের মৃত্যু ঘটে।

উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের রোমিও জুলিয়েট নাটকে মূখ্য দুই চরিত্রের মৃত্যু ঘটেছিলো বিষপান করে। হ্যামলেটের ঘুমন্ত পিতাকে তার মা খুন করেছিলো কানে বিষ ঢেলে দিয়ে। এ সবই বিশ্ব সাহিত্যের সাহিত্যের অংশ হয়ে আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৌদি কাদম্বরী দেবী একবার নয় দু’বারের চেষ্টায় বিষপানে আত্মহত্যা করেছিলেন। বিষপানে আত্মহত্যার এই ঘটনাটিকে ঠাকুরবাড়ির মানুষেরা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রিয় বৌঠানের মৃত্যু আজও রহস্যের মোড়কে বন্দী হয়েই থাকলো। হয়তো জীবনের বিষ কাদম্বরী দেবীকে ঠেলে দিয়েছিলো জীবনের ভিন্ন প্রান্তে। জীবনের এই ভিন্ন প্রান্ত তো এক ধরণের বিষময় হয়ে ওঠার গল্প বোনা থাকে। থাকে বিপন্ন বিষ্ময়ের গল্প। জীবনের বিষ মানুষকে অসহায় করে দেয় অন্য এক বিমুখ প্রান্তরে। মানুষ তখন বয়ে চলা জীবনের ভার বহনে অক্ষম হয়ে উপড়ে ফেলতে চায় নিজেকেই জীবনের কক্ষপথ থেকে। সেই বোধের বিষও কিন্তু অন্য বিষের চেয়ে কম কিছু নয়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]