অন্ধকার, অন্ধকার এবং অন্ধকার গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল কবি ও লেখক

দু্ই.

শাখাইতি বাজারে ব্যবসা করে কাজী বাড়ীর লোকজন প্রায় তিন পুরুষ ধরে। তাদের ছেলে ফরাশ কাজীকে পুলিশ নাকি কি বলেছে। এলাকার চোর বদমাশ ডাকাতদের নাম জানতে চেয়েছে পুলিশের এক লোক। ফরাশ কাজী পুলিশের কথায় ভয়ে ভয়ে বলেছে- আমাদের গ্রামে কোনো চোর-ডাকাত বদমাশ নেই। পুলিশ যাবার সময় ফরাশ কাজীকে বলে গেছে থানায় যেতে। এ কথা শুনে গ্রাম্য জীবনে আরো শীতলতা নেমে এসেছে। যেন ঘন কুয়াশার শীতের রাত্রির নির্জনতার মতো ভয়ার্ত নির্জনতা সবাইকে চেপে ধরেছে। ফরাশ কাজী থানায় গেছে কি’না কেউ জানে না। কেবল উত্তরপাড়ার জাভেদ আলীর ছেলে আকবর আলী দেখেছে ফরাশ কাজী ঢাকার গাড়ীতে করে কোথায় চলে গেছে। ঢাকার গাড়ীতে করে ফরাশ কাজী থানায় যাবে, না ঢাকায় যাবে আকবর আলী জানে না।

গ্রামের মানুষগুলো যেন আজ প্রাণ খুলে কথা বলতে ভুলে গেছে। ভয় তাদের হৃদপিন্ডটাকে একেবারে ভিতরমুখী করে ফেলেছে। মানুষগুলো যেন শামুকের মতো আচরণ করছে। তারা সংকুচিত হতে হতে প্রাণহীন জড়বস্তুর মতো হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের রহিম বেশি কথা বলে। কথা না বলে এক মুহুর্তও থাকতে পারে না। সেও যেন বোবা হয়ে গেছে। যারা রহিম মিয়াকে আগে থেকে চেনে না, তারা এখন তাকে দেখলে মনে করবে লোকটা বোধহয় কথা খুব কম বলে। পৌষের শীতের রাত্রি যেমন ভাবে সবকিছুকে স্থবির করে ফেলে ঠিক তেমনি করে গ্রামের মানুষকে পুলিশী আতঙ্ক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মাঝে নিমজ্জিত করে চিরকালের জন্যে স্থবির করে ফেলেছে। এর মধ্যে আবার গ্রামের ছেলে জজ কোর্টের নিয়াজ ঊকিল গ্রামের মানুষকে সাবধান করে দিয়েছে। বেশী কথা গ্রামের মানুষ যেন না বলে। এই সময়ে অচেনা মানুষের ঘোরাঘুরি পুরস্কার নদীর আশেপাশে বেড়ে যাবে। পুলিশের লোকজন এখন ছদ্মবেশে ঘুরাফেরা করবে। নিয়াজ উকিলের সাবধান বাণী শুনে গ্রামের মানুষ অচেনা কাউকে দেখলেই আরও বেশী করে ভীতু আতংকগ্রস্ত লোকদের মতো কথা বলছে। এক কথায় মানুষের জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের আনন্দ পুরস্কার নদীতে ভেসে আসা চার-চারটি লাশের অদেখা বিমূর্ত আগুন পুড়িয়ে ছাঁই করে দিয়েছে। সবার মনে আজ এক ভয় মন্ত্রী নয়, প্রধানমন্ত্রী নয়, রাষ্ট্রপতি নয়, এখন সকল ক্ষমতা পুলিশের কাছে। পুলিশ যাকে ইচ্ছে ধরতে পারবে। যাকে ইচ্ছে মামলায় লাগিয়ে দিতে পারবে। তারাই পুরস্কার নদীর দু’কূলের গ্রামগঞ্জের মানুষের দন্ডমুন্ডের কর্তা। পুলিশের দয়ায়ই এখন তাদেরকে বেঁচে থাকতে হবে। এছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই।

রাতের গভীরে ঘন অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার নদীর দু’কূলের মানুষের জীবনে ভয়াবহ নীরবতা নেমে আসলেও উত্তরপাড়ার মুচিপাড়ায় ঠিকই ভাত পঁচানো বাংলা মদের আসর বসে। সেখানে আশেপাশের এলাকার কিছু ভদ্রলোকেরাও আসা-যাওয়া করে থাকেন। রাতের আঁধারে মুখ ঢেকে ঊনারা যান। ভাবেন গ্রামের আর দশজন তা জানে না। অনেক সময় ভালো ভালো মানুষের ছেলেরাও শহরে ফেন্সিডিলে আকাল পড়লে এই মুচিপাড়ায় আসে ভাত পঁচানো বাংলা মদ গলায় ঢেলে অন্তরে নেশার তুফান তুলে নির্লজ্জ আনন্দকে জাগিয়ে তুলতে। পুরস্কার নদীতে যেদিন লাশ ভেসে এসেছিলো, তার কয়েকদিন পর পর্যন্ত মুচিপাড়ার কারিগররা তাদের কর্মকান্ড থেকে অবসর নিয়েছিলো। ওরা জানে কোনো কিছু ঘটলে পুলিশের প্রথম হামলার তুফান মুচি পাড়ায় বসানো মদের আড্ডার ওপর দিয়েই যায়।

আজ সন্ধ্যাটা খুব সুন্দর। সন্ধ্যা মিলাবার সঙ্গে সঙ্গে বড় থালার মতো হেমন্তের পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে উঠেছে। চারিদিকের নিরবতার মাঝে যেন অনেক দিন পর আবার আনন্দের  বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। নীরব নির্জনতায় ভরা প্রকৃতির মায়াময় ছন্দ সবকিছুকে আবার নতুন করে আবৃত করছে। মুচিপাড়ার এই কয়েকদিনের নির্জিব ভাবও কেটে যাচ্ছে। মদ বানানোর কারিগররা গা ঝাড়া দিয়ে আবার তাদের নিত্যদিনের কাজ শুরু করেছে।

মুচি পাড়ার মদের আড্ডায় আজ পাঁচজন মিলিত হয়েছে। তাদেরকে এলাকার সবাই চেনে। এই পাঁচজনের মধ্যে প্রথমজনকে এলাকার মানুষ সিঁদেল চোরের সর্দার বলেই বিবেচনা করে। দ্বিতীয় জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে রাতের বেলায় যেসব পাগলিনীরা ঘুরে বেড়ায় তাদের যৌন ত্রাণকর্তা। অভাগিনী পাগলিনীদের পেটে সে মানুষ জন্মবার বীজ সুনিপুন ভাবে বপন করে থাকে। এছাড়া এই দ্বিতীয় জন কয়েকটি ধর্ষণ মামলারও বিচারাধীন আসামী। তৃতীয়জনকে পুলিশ সময়ে সুযোগ মতো পেলে সন্দেহজনক ব্যক্তি হিসাবে গ্রেফতার করে থাকে। কেননা ঐ তৃতীয়জন দিনরাত ছব্বিশ ঘণ্টা বাড়ীঘর ছাড়া মানুষের মত রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। কখনও রেলস্টেশনে, কখনো বাস টার্মিনালে, কখনোবা দোকান ঘরের বারান্দায় ধূলো মাটি কাদায় ঘুমায় কিংবা বিশ্রামের আশায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। যদিও এলাকার মানুষ তাকে পাগল কিংবা মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক হিসাবে জেনে আসছে। চতুর্থজন মাঝে মধ্যে মারদাঙ্গা করে। সুযোগ পেলে মেয়েদের গলা থেকে সোনার চেইন ছিনতাই করে। যদিও সে এই কাজে পাকাপোক্ত নয়। প্রায়ই ছিনতাই করতে গিয়ে মেয়ে লোকের হাতে ধরা পড়ে এবং জনতার গণধোলাই তার কপালে জোটে। ছিনতাই করতে গিয়ে একবার সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলো। কয়েকদিন হাজতও খেটেছিলো। ওই যে পুলিশের হাতে একবার ধরা পড়েছিলো তার রেশ আজও তাকে ভোগ করতে হয়। তার কপাল এতোই মন্দ যে, ভাল হবার জন্যে পানের দোকান দিয়েও সে ভাল হবার সুযোগ পায়নি। এখনো কোথাও ছিনতাই বা ছোটখাটো চুরি-চামারী হলে পুলিশ মূল আসামীকে না পেলে তাকেই খুঁজতে আসে। ঠিকমত হাতের কাছে পেলে পাছায় লাথি দিয়ে ধরে নিয়ে যায়। পঞ্চম জনের বিরুদ্ধে একবার রোড ডাকাতির অভিযোগ এনেছিলো যথাযথ কর্তৃপক্ষ। তাকেও কোথাও ডাকাতি হলে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়।

ওরা সবাই রঙ্গিলা মুচির ঘরে ভাত পঁচানো ময়লার গন্ধ যুক্ত বাংলা মদের আসর বসিয়েছে। ময়লার গন্ধযুক্ত এই মদের নেশাই তাদেরকে সবকিছু থেকে দুঃখ কষ্ট অভিমান থেকে ক্ষণিকের জন্য দূরে সরিয়ে রাখে। এটাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র বিনোদন। প্রথম জন বাংলা মদের নেশায় মত্ত হলেও বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেনি। সে আজকের মদের আসরের বাকী চারজন সাথীকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো, তোরা নিশ্চয়ই শুনেছিস পুরস্কার নদীতে চারটি লাশ ভেসে এসেছে। তোরা সবাই সাবধান থাকিস।

প্রথম জনের কথা শুনে বাকী চারজন বলতে গেলে এক সঙ্গে বলে উঠলো, আমরা কেন সাবধান থাকবো। আমরা কি লাশ হয়ে ভেসে আসা চারজন মানুষকে মেরে নদীতে ভাসিয়েছি। আমাদের কি খেয়ে ধুয়ে কোনো কাজ নেই।

প্রথম জন বাকী চারজনের কথা শুনে বললো, কে মেরেছে তার বিচার করবে আদালত। আমি, তুই, পুলিশ কেউ বিচার করার মালিক নই। পুলিশের কাজ পুলিশ করবে। কোর্টের কাজ কোর্ট করবে। কাউকে যখন খুঁজে পাবে না, তখন দেখবি আইনের লোকেরা নিজেদের গা বাঁচাবার জন্যে তোকে, আমাকে এককথায় আমাদের মতো সাধারণ মাতালদের এই মামলায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।

তৃতীয় জন নেশায় উন্মুক্ত হয়ে চোখমুখ লাল করে বলে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। দেখিসনা কোথাও চুরি চামারী হলেই আমাকে ধরে নিয়ে যায়। কয়েকদিন হাজত খেটে আসি। কয়েকটা দিন মন্দ যায় না। কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে দিনগুলি ভালই কাটে। আমার আর ভয় করে না। পুলিশের এমন আচরণ আমার গায়ে লাগে না। সহ্য হয়ে গেছে।

মদের আড্ডার সঙ্গীদের কথা শুনে চতুর্থজন টিনের গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে প্রচন্ড রকম ক্ষেপে গিয়ে বলে উঠে, আজকের এই আনন্দের দিনে মন খারাপ করার কথা বাদ দাও। অনেকদিন পর আমরা আবার মিলিত হয়েছি। আমরাতো জানি আমাদেরকে এই সমাজ একবার পাছায় লাথি দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তুলে হাজতে ঢুকায়। আবার ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে অপরাধী হতে শেখায়।

পঞ্চমজন রঙ্গিলা মুচির কাছ থেকে আরেক গ্লাস মদ চেয়ে নিয়ে বলে, আমাদের মতো সাধারণ অপরাধীর জন্মইতো হয়েছে পৃথিবীর সকল পাপের ভার বইবার জন্য।

প্রথমজন আবার তার মদের আড্ডার সাথীদের উদ্দেশ্য করে বললো, তারপরও বলছি সাবধানে থাকিস। এখন সময় কারো জন্যই ভাল নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের এই পাঁচজন ছাড়া যে আমাদের এই নেশার আড্ডা জমে না।

প্রথম জনের কথা শুনে বাকী চারজনই একসঙ্গে বলে উঠলো, ঠিক আছে। ঠিক আছে। ঠিক আছে। ঠিক বলেছ। ঠিক বলেছ। ঠিক বলেছ।

তার একটু পরেই বন্ধ দরজায় ঠক ঠক ঠক করে তিনটি আওয়াজ হলো। বার বার একই রকম আওয়াজ করে কেউ যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে। এখানে পাঁচজনের বাইরে আরেকজন ছিলো। তা এই পাঁচজন খেয়াল করেনি। মনে হয় রঙ্গিলা মুচি জানতো। সেতো মাঝে মধ্যে পুলিশের সোর্স হিসাবেও কাজ করে থাকে। সেই পাঁচ জনের বাইরের ছয় নম্বর ব্যক্তিটি মদের আড্ডার পাঁচজনকে উদ্দেশ্য করে বললো, ওরাই, মানে পুলিশ হয়তো এসে গেছে। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। তোমরা পালাবার জন্য কিংবা ধরা পড়ার জন্য তৈরী হয়ে যাও। (শেষ)

ছবি; গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments